দেশের কথায়, ভালোবাসায়, রূপ নিরঞ্জনে ‘আমার রচিত গান যত’

মহিউদ্দিন শাহ আলম নিপু

6

কবির আন্তরিকতা, শব্দায়ন, গানের ভাবকে গভীরতর করা, সুরের প্রাধান্য, ভাবকল্পনা, বাসনা-কামনা, আনন্দ- বেদনার প্রকাশ, পায় কবির ভাবস্পন্দন, অনুভূতির বিশিষ্ট মানসিকতায়, আন্তরিকতায়, তাতে সঙ্গীত হয়ে ওঠে মাধুর্য্যপূর্ণ ও স্বাচ্ছন্দ। এতসব অভিধা সম্বলিত বৈশিষ্ট্য নিয়ে স¤প্রতি কালধারা প্রকাশনী প্রকাশ করেছে ইকবাল হায়দারের ‘আমার রচিত গান যত’ সঙ্গীত গ্রন্থটি। লেখকের প্রতিকৃতি সম্বলিত আকর্ষণীয় প্রচ্ছদটি করেছেন শিল্পী তনয়া হায়দারী আন্দালুসিয়া। লেখক বাবা-মায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে বইটি উৎসর্গ করেছেন।
বেতার টেলিভিশন ও মঞ্চের একজন খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পরিচিতি থাকলেও সাবেক ব্যাংকার ইকবাল হায়দার মূলত: একজন কবি, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও লোকসঙ্গীত গবেষক। প্রাইম ব্যাংক থেকে অবসর নিয়ে বিভিন্ন সৃষ্টিশীল প্রতিষ্ঠান ও সেবা সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ।
সত্তরে দশক থেকে এ পর্যন্ত রচিত, সুরারোপিত এবং নিজ কণ্ঠে গীত প্রায় চার শতাধিক গান বইটিতে (দেশের গান- ৩৪, আধুনিক গান- ১০০ এবং লোকসঙ্গীত- ২৬৮টি গান) স্থান পেয়েছে।
দেশের গানের পর্ব:
কি রূপের বাহারে, কর্ণফুলীর পাড়ে
ঝলমল ঝলমল করে আমার চট্টগ্রাম শহর-দিয়েই দেশের গানের শুরু।
জলে শ্যামলে, ধান্যে শিশিরে সুখময় পরিবেশ ধরা পড়েছে কবির গানে। নকশি কাঁথার রূপের মাঠ সুজন বাদিয়ার ঘাট, মাঝির ভাটিয়ালির গান, রাখালিয়ার বাঁশরির টান, জলের কল কল শব্দ প্রতিটি গানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। একাত্তরের যুদ্ধের কথা, জাগরণের গান আহŸান গানে স্থান পেয়েছে। চট্টগ্রামের আদি ইতিহাস দেশের জনগণ সংগ্রামের কথা যুদ্ধ, বাণ্যিজ্য শাসন-শোষণ সিদ্ধ মানুষের বুদ্ধি মেধা খ্যাতির বর্ণনা, সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী, বার আউলিয়ার কথা, সূর্য সেনের ফাঁসি, জ্ঞানী-গুণী রতেœর কথা সর্বোপরি বিল-ঝিল, ফুলপাখি, শিল্পী, কবি, কাব্য, ছড়া, ষড়ঋতুর সহজ বর্ণনায় সমৃদ্ধ হয়েছে দেশের গানগুলো। যেমন:-
আদরের ভাইরে আমার যুদ্ধে গেলো, আইলো না ফিরে, আর আইলো না ফিরে
অথবা কি স্বপ্ন দেখেছিলেরে বাঙালি
ভাষার জন্য পরাণ সপিলি, বুকের তাজা রক্ত ঢালিলি \
বা, ওগো বাউল তোমার একতারাতে আবার তোল সুর
সুরে সুরে শূন্য হৃদয় হোক না ভরপুর।
আবার, আমার একতারাটার সুরতো শোনা যায় না
ভিন দেশির সব বাজনা এলো
সুর তাল লয় কই হারালে
এখন তো আর পরাণ ঢেলে কেউ সুরে গান গায় না \
ইত্যাদি অপূর্ব বর্ণনায় রচিত হয়েছে দেশের গান। কোথাও শহীদ জায়াকে সান্ত¡না দিয়ে গান রচিত হয়েছে যেমন-
মাগো আর কাইন্দো না
তুমি চোখের জল ফেলিয়া
তারা হইল ধন্য দেশের জন্য
পরাণ সপিয়া।
সাঁঝ-সকাল, সন্ধ্যা, নিশীথের রূপ, ছবির মত গ্রাম, আবার বাউল, জারিসারি, সাম্পান মাঝির গান হাসন-লালন, মুর্শেদী-বিচ্ছেদী, সুরযন্ত্রের উল্লেখসহ ডুগডুগি, খঞ্জরি, খমক, একতারা, দোতারা, বাঁশির সুন্দর উপস্থাপনা, বার মাস, প্রকৃতির রূপ বদলের ধারা, সর্বোপরি চট্টগ্রামের সংক্ষিপ্ত পরিচয়ে শেষ হয়েছে দেশের গানের পর্ব।
আধুনিক পর্ব:
ফুল পাখি চাঁদ নয়, মানুষের কথা কয়
আমার এ গান
এভাবে ফেলে আসা স্মৃতি, আকাশ, সাগরের নীলের সঙ্গে, মনো বেদনায় রঙের তুলনা, কখনও রাত জাগা হৃদয়ের কথা, ইত্যাদি অভিধায় শুরু হয়েছে আধুনিক গানের পর্ব। যেমন- আমি সাগর দেখেছি, দেখেছি তার রূপ
আমি আকাশ দেখেছি, সে কেমন নিশ্চুপ
অথবা সাগার সেতো নীল, আকাশ নীলে নীলে
বেদনার কি রং, যে আমায় দিয়েছিলে। অথবা
প্রিয়ার জন্য রাত জাগার অপূর্ব বর্ণনায় রচিত
রাত নিঝুম তুমিও কি আছো জেগে
আমার দু’চোখে নেই ঘুম,
আর এক গানে অন্যভাবে বলা হয়েছে,
রজনী তুমি আরো, থাক কিছুক্ষণ
সে আসবে, সে আসবে, কেন বলছে আমার মন।
সুরে সুরে সঙ্গীতের মাধ্যমে বেঁচে থাকার অনুভূতি তিনি আবার আকুতির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
স্মৃতি করে রেখো, এই কটি গান
বিষাদের সুরে বেঁধে, স্মৃতি করে রেখো মোর গান।
হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনা, সুখ-ভালবাসা, বিরহের-কান্না, মিলনের আগ্রহ, প্রেমের বেদনা, চাঁদ, জ্যোৎস্না রৌদ্রকর, প্রিয়ার মিলনে উৎগ্রীব, প্রেমের ঘর ভাঙ্গা বিরহ স্মৃতি, প্রিয়ার কাছে আসা, দুরে থাকা আবার অন্যভাবে গান, সুর, কথা, স্মৃতি, প্রেম, ভালবাসা নিয়ে লেখা-
কিছু কিছু গান আছে, মন ভরে দেয়
কিছু কিছু সুর আছে, প্রাণ কেড়ে নেয় কিছু কিছু কথা আছে, ভোলা যায় না
কিছু কিছু স্মৃতি আছে, মোছা যায় না।
অন্যভাবে প্রেমিকার ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্টে লেখা গান-
ভালোবেসে শুধু কষ্ট দিও, সুখ যদি না দিতে পারো
সেই উপহার সঙ্গী করে, শেষ কটি দিন বাঁচবো আরো।
আবার, উঠে এসেছে ফেলে আসা ভালোবাসায় নিখুঁত চিত্র-
সেই জোছনার কাশ বনে, ছায়া ঘেরা মেঠো পথে
গোধুলীর রং মেখে, কুয়াশার ঘরে ফিরে
কত যে গেছি দু’জনে।
আবার, বিরহে কাতর প্রিয়াকে নিয়ে লিখেছেনÑ তুমিতো সুখেতে, হয়েছো বিলীন
আমার যে যায়, দুঃখের দিন।
অথবা
নির্জনে একাকী হবে কি দেখা
হৃদয়ের আঙিনায় দিও পদরেখা অন্যভাবে-
আমার ঘুম কেড়েছে দুষ্টু বাঁশী
তাতো দোষের নয়
সেই প্রেম লেগে এ অংগে
আমার ধরেছে যে ক্ষয়।
কবির একান্ত ব্যক্তি অনুভূতি এখানে সহজ ও সাবলীল গতিতে সঙ্গীত মুখর হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে আধুনিক শব্দে, আবহে, সমাজ সচেতনায়, যুগের সাযুয্যে, পদনির্মাণে ছন্দে। সুন্দর অনুভূতি কাব্যময়, গতিময়, ছন্দময় আবেগঘন রূপে প্রকাশ পেয়েছে আধুনিক এ সকল গান। যা হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়, তাই সার্থক মনে হয় এ গানগুলো পড়ে।
লোকসঙ্গীতের পর্ব:
এ বিশ্বের সকল সৃষ্টি, সকল জীব-নির্জীব, প্রাণ, বস্তু, ত্রিভুবন, এ আকাশ-বাতাশ, সূর্য্য, নক্ষত্র, এ লক্ষ লক্ষ কৃষ্ণবিবর জন্ম-মৃত্যু, ক্ষয়-লয়, গতিময় জীবন-যৌবন, সুন্দর-অসুন্দর, মায়া-কায়া, প্রেম-প্রীতি, দুঃখ-বেদনা, শত বন্ধন, পিতা-মাতা সন্তান, স্নেহ, মমতা, আদি থেকে অন্ত, শত বিপর্যয়, পরিবর্তন-বিবর্তন, রূপান্তর, এ যে সুন্দর পৃথিবী বৃক্ষরাজী প্রকৃতি ক্ষুধা-তৃষ্ণা, কামনা-বাসনা, মোহ-মায়ার বিশাল জাল রহস্যের এবং তার কুল কিনারার সন্ধান এ পর্যন্ত কোন মহাকবি, কোন বিজ্ঞানী, কোন মহাত্মা, কোন মহাজ্ঞানী, কোন ধর্মগুরু, আউলিয়া দরবেশ, মহাপুরুষ কেউই করতে পারেনি। মানুষের মনের মধ্যে কে বিরাজে কেউ তা জানে না। এই যে হাসি, গাই, কথা বলি, শুনি, ক্ষুধা নিবারণ করি, জন্ম, বৃদ্ধি, মৃত্যু তার পিছনের কার হাত কেউ জানিনা। কেউ বলে ঈশ্বর, কেউ ভগবান, কেউ আল্লাহ্, কেউ কৃষ্ণ, কেউ বুদ্ধ নানা অভিধায় সেই নিরঞ্জন অধরা নিঠুর বন্ধু, দুরের বন্ধু, পরাণ বন্ধু, কালা, দয়াল, বন্ধু কখনও প্রিয়, কখনও প্রিয়া, কখনও দরদী বিবিধ জনের বিভিন্ন ভাবে বলা সেই যে সৃষ্টিকর্তা তারি সন্ধানে মহা-মনীষীরা রচনা করে চলেছেন আধ্যাত্মিক, মরমী, দেহতাত্তি¡ক, সুফীবাদী, বাউল, মুর্শেদী, পল্লী বিচ্ছেদ, ভাটিয়ালি, মাইজভাÐারি সুরের বিভিন্ন গান।
বাক্য গঠনের, শ্রেষ্ঠ শব্দ প্রয়োগের, অন্তমিলে, স্থায়ী কোথাও কোথাও সঞ্চারীতে বিষয় বর্ণনায় ইকবাল হায়দারের লোকসঙ্গীত গানগুলো উপরোক্ত বিষয়ে সমৃদ্ধ হয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যেমন-
যারে ভাবলাম আপন আপন, কে কোথায় লুকাইয়াছে
ভালোবাসা মিছে আশা, আমায় দিয়াছে হায়রে।
অথবা
আহারে পরাণের বন্ধু তুমি
এমন নিঠুর হইওনা
অথবা
কাটেনা সময় আর, বন্ধু বিহনে
কি যে করি ভেবে মরি, এ মনে মনে
অথবা
সোনার পিঞ্জরে কেন না থাক, ও সোনার পাখীরে
সোনার পিঞ্জরে কেন না থাক।
অথবা
বন্ধু সরল মনটা কাইড়া, কোন ভুবনে রইলি
কেন চোখের আড়ালে হইলি।
অথবা
আমার বাড়ী যাইও বন্ধুরে, বন্ধু থাকবো পন্থ চাইয়া
বা ওরে বাঁশুরিয়ার, আর বাঁশি বাজাইওনা
কেমনে সই বিচ্ছেদ জ্বালা, আর জ্বালা বাড়াইওনা।
অথবা
কার পন্থ চাইয়া আছো গো কন্যা, নদীর ঘাটে বইসা
অথবা নিঃরূপে আর রূপের মাঝে বসত কইরোনা
আমি রূপ সাগরের ডুব দিয়ে গো খুজব নিঃরূপ বরণা
অথবা
সে আমার মনটা কেড়েছে, তাতে প্রেম রোগে ধরেছে
ও সে কাছে এসে দেয়না ধরা, পাগল করেছে।
লেখকের এই বইয়ের উ্েল্লখিত দেহতাত্তি¡ক গানের কিছু নমুনা নিæে দেয়া গেলো-
যেমন এমনও তরী কে বানাইয়াছে, তরীর মাঝি লুকাইয়াছে অথবা আমার বন্ধু নিরঞ্জন গো মাটিরে বানাইছে দেহ সোনা।
অথবা পবন মাটি অনল পানি, এই চার কাঠামে জানি মানব দেহ সৃজন, পরমেশ্বর আত্ম নিয়ে তার মধ্যে প্রবেশিয়ে, জন্ম দিলেন অমূল্য জীবন।
অথবা
তিন তারে বানায় সারিন্দার, তিন তারে বানায়
ভিতরে খোল বাইরে ছানি, কে তারে বাজায় না জানি \
অথবা
বানাইছে ঘর কোন কামলায়, এমন চমৎকার
হাড়ের টুনী চামড়ান ছানি, সুন্দর জুৎ গাঁথুনী তার।
শ্রেষ্ঠ শব্দ নির্বাচন, শব্দ প্রয়োগ, শব্দের ব্যবহার, বাক্যের গঠন, গানের কাঠামোতে তাত্তি¡ক বা সংজ্ঞাগত কোন ব্যত্যয় চোখে পড়েনি। ধর্তব্যের বাইরে দু-একটা মুদ্রণ ত্রæটি ছাড়া চমৎকার একটি বিরল প্রকাশনা।
উল্লেখিত গানগুলো ইতোমধ্যে সঙ্গীত পিপাসুদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছে। আমরা আশা করি ইকবাল হায়দারের রচিত গানগুলো বহুল গীত হবে এবং আমাদের সঙ্গীত জগৎকে সমৃদ্ধ করবে।