দূরের পথিক রমজান আলী মামুন ভাই শূন্যতায় চট্টগ্রামের সাহিত্যাঙ্গন

12

নাসিমা হক মুক্তা

একদিন সন্ধ্যার পর চট্টগ্রাম শিল্পকলা মাঠে উপস্থিত হয়েছি। নিয়ন আলোর ঝলমলে আলোক সজ্জা চারিদিকে জ্বলছে। সাহিত্যপ্রেমীদের আনাগোনায় মেতে পুরো পরিবেশ। জনমানব থৈথৈ করছে। তার ওপর আকাশে তারার মেলাও খেলছে। জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মুখের ওপর। দেখলাম, বিশাল মাঠে ছুটাছুটি করছে অসংখ্য মানুষ। তখন চট্টগ্রাম একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত ছোটোদের বই উৎসব চলছে। এমন সময় আমি উপস্থিত ছিলাম এবং সাথে বুকের ধনও। কোথাও গেলে আমার মেয়েটি সাথে থাকলে কার সাথে একান্তভাবে কাছাকাছি গিয়ে কথা বা গল্প করা সহজে হয়ে ওঠে না। ওকে টানতে টানতে আমার বেহাল দশা হয়ে পড়ি। যাক আসল কথায় আসি – তাও আবার মেয়ের প্রসঙ্গ টানতে হবে। হঠাৎ মেয়ে বললো, মাম্মি ক্ষিধা পেয়েছে। তখন মেয়েসহ শিল্পকলার বাইরে নাস্তা খেতে গেলাম। নাস্তা সেরে শিল্পকলায় প্রবেশ করবো, এই মুহূর্তে ডাক দিল, এই মুক্তা, কে? পেছনে তাকিয়ে দেখি- আমাদের সবার প্রিয় রমজান আলী মামুন ভাই ও তাঁর সাথে আছেন চট্টগ্রামের আরো দু’জন শিশুসাহিত্যিক আবুল কালাম বেলাল ও এয়াকুব সৈয়দ। তারপর সালাম দিলাম, কথা বললো আমার সাথে আপনমনে। এবং এর আগের সপ্তাহে দৈনিক সমকালে আমার কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল, সে ব্যাপারে তিনি খুব প্রশংসা করলেন। সেইসাথে আমার মেয়েকে গালে হাত লাগিয়ে আদর করে বললো-এ তো আমাদের ছোট শিল্পী। ওকে খুব যতœ করো। আর তুমি অনেকদ‚র এগিয়ে গেছ। তোমার কবিতা বেশ ভাল হচ্ছে। দেখবে একদিন অনেক বড় কবি হয়ে উঠবে। প্রয়াত রমজান আলী মামুন ভাইয়ের এই উক্তিটি আমার লেখালিখির জীবনের সবচেয়ে প্রথম প্রশংসার উক্তি। উনার মতো আর কেউ প্রাণ খোলা প্রশংসা করেনি। সেটা অনেক বড় প্রাপ্তি ছিল আমার জন্য। সেদিন বইমেলা থেকে যখন বাসায় ফিরি তখন রাত দুটো পর্যন্ত গড়ায়। শুধুই বিভিন্ন কবিতার বই পড়েছিলাম এবং এক রাতে ৭ টি কবিতা লিখেছিলাম। কেউ যখন মন ভরে প্রশংসা করে, তখন লেখার আগ্রহ আমার আরও বেড়ে যায়। তাঁর উৎসাহ ও প্রেরণামূলক কথাবার্তাগুলো আমার জীবনের একটি অংশ হয়ে গেছে।
বর্তমান লকডাউন চলাকালীন সময়ে চট্টগ্রামের যত শিশুসাহিত্যিক আছেন, তাদের সবার বই আমার সংগ্রহে আছে এবং আগে পড়া থাকলেও আবার পড়েছি আপনমনে। তাঁদের পড়তে গিয়ে রমজান আলী মামুন ভাইকে আবিষ্কার করলাম উচ্চমাত্রার এক শিশুতোষ মননশীল শিশুর মতো মানুষকে। কিন্তু উনাকে পড়তে গিয়ে আমার মনে বিশাল মেঘ জমে গেছে। কারণ তিনি আমাদের মাঝে আর নেই। গত হলেন গত বছর ২৪ সেপ্টেম্বর। মাত্র ৫১ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। সাহিত্যের অঙ্গণে রেখে যান অফুরন্ত স্মৃতি। সেই সুবাদে আমার চোখে পড়লো আগামী ৩ আগস্ট তো আমাদের প্রিয় শিশুসাহিত্যিক মামুন ভাইয়ের জন্মদিন। তাই তাঁকে নিয়ে দু কলম স্মরণলিপি লিখছি। তিনি আমাদের মাঝে নেই এ কথা ভাবলেই ভীষণ হাহাকারে ভরে ওঠে মন। বিষন্নতা বাসা বাঁধে বুকের কোঠায়। মোচড় দিয়ে ওঠে অনুভবের নোনাজল। এই নোনাজল শুধুই আমার একার নয়, তাঁর অসংখ্য গুণগ্রাহী ও পাঠক ভক্তের। আকাশের দিকে তাকিয়ে এক বুক নিঃশব্দের শ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছু নেই। তিনি আজ দূরের পথিক।
একটা মানুষ মৃত্যুর পর এতো আপন হবে কখনো ভাবিনি। কখনো তাঁর সাথে এতো বেশি যোগাযোগ বা ঘনিষ্ঠতা ছিল না। তবুও কেন যেন আমাকে তাঁর কথা ভাবায়। স্মরণে ভেসে ওঠে, শিল্পকলা বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার গাওয়া গানের সাবলীল কন্ঠ। সত্যি তিনি অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন। লেখক হিসেবে তাঁর গুণগান করা আমার মত অজাতের কলম ও মননে বিশ্লেষণ করা দুরূহ ব্যাপার। তবে পাঠকদের সাথে আরেকটি কথা শেয়ার করি। যেদিন উনি পৃথিবী থেকে লুকায়িত হলেন তখন আমাদের আরেকজন প্রিয় ও শ্রদ্ধার মানুষ ছড়াকার উৎপলকান্তি বড়ুয়া – হঠাৎ আমাকে মোবাইলে ফোনে জানালেন। হ্যালো, কে বলছেন? আচ্ছা, দাদা, কেমন আছেন ? তাঁর অনেক কুশলাদি বিনিময় হলো, পরিশেষে আমাকে বললেন- মুক্তা আপনি শক্ত হোন, কেন দাদা? কি হয়েছে? তখন আমার মনে খটকা লাগলো। নিশ্চয় দাদা কোন দুঃসংবাদ দিবেন। তারপর দাদা, হোঁ হোঁ করে বাচ্চার মত কেঁদে কেঁদে বললেন – মুক্তা,আমাদের মামুন আর নেই। কি বললেন দাদা? দু’দিকের কথোপকথন নীরব হয়ে নেটওয়ার্কে তারে বিরহের কান্নায় ভেঙে পড়েছিল দু,পাশ। আমি মুখে পড়লাম – ইন্না-লিল্লাহে ওয়া ইন্নাহ ইলাইহে রাজেউন- আমিন।
তারপর উৎপল দাদাকে বললাম, আমি কি উনাকে দেখতে যেতে পারি? উনার বাসা কোথায়? কিভাবে যাব? তারপর উনি লোকেশন দিলো…. আমি ব্যক্তিগত ভাবে কবি রুমি চৌধুরী, নীলিমা ও ছড়াকার সেলিনা খানমকে ফোন দিলাম উনারা যাবে কিনা? অবশেষে আমি গেলাম তাঁর বাসায়। বিছানায় শুয়ে রাখা নিষ্পাপ দেহটি যেন পবিত্রতার মখমলে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। হাযরে জীবন, এতো ছোট্ট কেন? মনে মনে আল্লাহর উপর গোস্বা হয়েছি, বেজার হয়েছি। তবে এসব করে তো কোন মৃত্যু কে আটকানো যায় না। ওখানে আমাদের আরও সিনিয়র কবি ও লেখকদের দেখা হয়। সবার মুখে একটি কথা ছিল – মামুন ভাই খুব ভাল মানুষ ছিলেন।
কিছুদিন আগে আমাদের আরেক প্রিয় দাদা মিলন বনিকের সাথে কথা হলো – তিনি বললেন, জানেন মুক্তা, আমি টেরিবাজার হয়ে কোথাও যেতে পারি না। আমার খুব কষ্ট হয়। এই রকম তাঁর অনুরাগীরা রমজান আলী মামুন ভাইকে স্মরণ করেন। তাঁর অনুপস্থিতির জন্য আজও সবার মনকে পীড়া দেয়।তিনি শুধু আমাদের চট্টগ্রামের পরিচিতি মুখ তা নয়, তাকে সমগ্র বাংলাদেশ চেনে ও জানে। বাংলাদেশের অন্যতম এক প্রিয় শিশুসাহিত্যিক ছিলেন তিনি । তিনি বিভিন্নভাবে দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, রবীন্দ্রনাথ, কিশোর গল্প ও ছড়া-কবিতা লিখেছেন অসংখ্যক। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও সাবলীলভাবে লেখালিখিতে বিচরণ করেছেন আপনমনে ।
রমজান আলী মামুনের জন্ম ৩ আগস্ট ১৯৬৮ সালে। বদরপুকুর উত্তরপাড়, টেরীবাজার, চট্টগ্রাম। পিতা – মরহুম গজনফর আলী, মাতা – মরহুম হাজী গোলছন নাহার বেগম।
তিনি একজন বাবা- মার আদর্শ সন্তান ছিলেন। খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। সবার সাথে আন্তরিকপ‚র্ণ সুসম্পর্ক রক্ষা করতেন। তিনি চট্টগ্রামের অনেক লেখক ও কবিকে বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো হচ্ছে – গল্পঃ হারিয়ে যাওয়া দুপুরে,আকাশপরি ও পাপিয়া, এক যে ছিলো রাজকন্যে, দিবা ও রহস্যময় বুড়ো, কিশোর নেমেছে যুদ্ধে, রুশনি ও কটি পতাকার গল্প, খুকী ও রবীন্দ্রনাথ।
উপন্যাসঃ রেল ছোটে মন ছোটে, কিশোর কবিতাঃ নীল ডানা এক পাখি, সবুজাভ কোনো গ্রামে, আমার জন্মভ‚মি বাংলাদেশ, ছড়াগ্রন্থঃ ছড়ার গাড়ি থামবে বাড়ি ও কবিতাগ্রন্থঃ আমার অনেক কষ্ট আছে ও তোর জন্য কষ্ট আমার।
সাহিত্যে অবদানের জন্য বিভিন্ন সম্মাননাও তিনি পেয়েছেন। তাঁকে নতুন প্রজন্মের আরও চর্চা করা উচিত। তাঁর বইগুলো বর্তমান প্রজন্মের লেখক পাঠকদের জন্য সোনালী ফসল হিসেবে লেখার অনুপ্রেরণা যোগাবে। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুক- আমিন। অবশেষে তাঁকে নিয়ে লেখা আমার লেখা কবিতা দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি…

প্রিয় মানুষটি
ধবধবে সাদা একটি পবিত্র মুখ
আকাশের তারার মত উজ্জ্বল চোখ
নিমিষেই ঝড়ের চিৎকার শেষে
থেমে গেল -তার শ্বাস
কে সে? কার নিঃশ্বাস?
সেই আমাদের সাহিত্যের আলোর পাতা
হঠাৎ সেই পাতা ছিটকে পড়া – লাশ

পাতারা মরে, গাছেরা মরে, আগুনে পোড়ে
জানি মানুষও মরে – তবে
এতো আপন মানুষ কেন চলে যায় বলতে পারো!
যার হাঁটার শব্দে ছিল, চুপিচুপি ছায়া
যার কপালে ছিল মানুষের ভালবাসার মায়া
আজ কোন শ‚ন্যে উড়ে গেল সে ?

মাঠ ঘাট নগর, চেরাগি থেকে টেরীবাজার মোড়
কোথাও নেই, কোথাও নেই
রাক্ষসী খেয়ে ফেললো –
প্রিয় মানুষটিকে
ঘুমান আপনি চিরতরে, জলের শীতলে
ঝর্ণার আদরে
আমাদের দোয়া ও ভালবাসা নিন সাদরে
পরজনমে পরম শান্তিতে থাকুন
পরম শান্তিতে থাকুন….

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক