দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়রোধে ‘শুদ্ধাচার’ চর্চা অপরিহার্য

21

বর্তমান দেশের সর্বত্রে উদ্বেগজনকভাবে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রও এ অবক্ষয় থেকে মুক্ত থাকতে পারছেনা। নৈতিকতার অবক্ষয় আর দুর্নীতি যেন সমান্তরালে পথ চলছে। সরকার ও দেশের সচেতন মানুষ এ অবস্থার অবসান চায়। আমরা মনে করি, এর জন্য শুধু আইন করে ভালো ফল পাওয়া যাবেনা, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও শুদ্ধাচার চর্চার বিষয়টি আরো অবারিত করা। বর্তমান সরকার যে কাজটি দেশের নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগসহ সাংাবিধানিক ও আইনত সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতি দলসমূহে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু এ উদ্যোগ এখনও পর্যন্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরসমূহে সীমাবদ্ধ। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে শুদ্ধাচার চর্চাটি সর্বত্র অবারিত করতে হবে। পরিবার ও সমাজকেও শুদ্ধাচার কৌশলের আওতায় আনতে হবে।
শুদ্ধ ও আচার শব্দের সমন্বয়ে সৃষ্টি ‘শুদ্ধাচার’ শব্দের। যার অর্থ চরিত্রনিষ্ঠা। বাংলায় সাধারণত ‘নৈতিকতা ও সততা’ দ্বারা প্রভাবিত আচরণ ও উৎকর্ষ সাধনকে শুদ্ধাচার বলা হয়ে থাকে। শুদ্ধ বলতে সহজ ভাষায় বুঝি পবিত্র, সাধু, খাঁটি, পরিষ্কার, শোধিত, নিষ্কলুষ, নিষ্ককণ্টক, নির্ভুল, নির্দোষ ইত্যাদি। একজন মানুষের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য যখন সমাজ এই অভিধাগুলোর ব্যবহার ও প্রয়োগ করে, তখনই সেই মানুষ ‘শুদ্ধ মানুষ’ হিসেবে গণ্য হন। এ জন্য সত্য, সুন্দর ও কল্যাণকর, নৈতিক আদর্শকে চরিত্রে ধারণ ও বাস্তবে রূপায়ন করতে হয়। ব্যক্তি ও পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ জীবনধারণের জন্য ভালো আচরণ, ভালো রীতিনীতি, ভালো অভ্যাস রপ্ত ও পরিপালন করা অত্যাবশ্যক। শুদ্ধাচার দ্বারা একটি সমাজের কালোত্তীর্ণ মানদÐ, নীতি ও প্রথার প্রতি আনুগত্য বোঝানো হয়। ব্যক্তি পর্যায়ে শুদ্ধাচারের অর্থ হলো কর্তব্য নিষ্ঠা ও সততা, তথা চরিত্রনিষ্ঠা। কিন্তু বর্তমানে সমাজে নিষ্ঠাবান চরিত্রের মানুষের উপস্থিতি সীমিত হয়ে আসছে। নীতি নৈতিকতার বালাই না থাকা মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেবায়, কর্তব্য-কর্মে সবসময় সতর্ক থাকেন এমন ‘স্বভাব’ খুব কমই মেলে। আর সততার লেশমাত্র নেই এমন অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। যেখানে সৎ মানুষের ঠাঁই পাওয়া বড়ই দুষ্কর। অসততার দিগন্ত থেকে দিগন্তজুড়ে কেবলই সততাকে গলাচেপে হত্যা করা হচ্ছে। জনগণের সেবাদানই যাদের কর্তব্যকর্ম, সৎ মানুষ হিসেবে দায়িত্বশীলতার নিদর্শন রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। বর্তমান সরকার প্রথম দফায় সরকার পরিচালনায় দায়িত্ব নেয়ার প্রথম তিন বছরের মাথায় অর্থাৎ ২০১২ সালে সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রয়োগের পদক্ষেপ নিয়েছে। সেলক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেবাখাতে শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্নমুখী আলোচনা হচ্ছে। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল মৌলিক মানবাধিকার, সামাজিক সাম্য, সুবিচারও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশল হিসেবে সরকারের নিকট বিবেচ্য। সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের বিদ্যমান ধারণা বদলাতে এবং সকল কর্মকর্তা কর্মচারীকে সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় আনার লক্ষ্যে সরকার একটি অবলম্বন হিসেবে প্রণয়ন করেছে ‘জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’। ২০১২ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই কৌশল প্রয়োগের উদ্যোগ নেয়। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের জানান দিতে দেশব্যাপী চলছে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ সরকারি কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক। দেশের সবশ্রেণির মানুষ যেনো সরকারি সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে ভাল ব্যবহার ও সময়মতো কাজ বুঝে পায় এবং কোনোভাবেই যেনো দুর্নীতির মধ্যে জড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাই এই কর্মস‚চির অন্যতম উদ্দেশ্য। মোদ্দা কথা, জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক করার জন্যই এই পদক্ষেপ। একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশের প্রশাসনে যদি জবাবদিহিতা না থাকে, তবে অগ্রগতির সকল আশাই বৃথা হতে বাধ্য। শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন মৌলিক সমানাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্যসহ সুবিচার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তাই সরকারের শুদ্ধাচারের পরিকল্পনার প্রধান বিষয়ই হচ্ছে উল্লিখিত লক্ষ্য পূরণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। আর তা প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি দমন, শুদ্ধাচার প্রতিপালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, আইন প্রয়োগ ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়। সেজন্য প্রয়োজন বাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক আন্দোলন সঞ্চারিত করা। নাগরিক এবং সরকারি কর্মচারী উভয়ে যার যার আবস্থান থেকে সৎ থাকলেই দুর্নীতিসহ নৈতিক অধগতির বাহুল্য মুক্ত হওয়া যায়। তা হলেই সেবাদান প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা পাবে। সমাজ ও রাষ্ট্রেরও বিশাল গুণগত পরিবর্তন ঘটতে বাধ্য। দুর্নীতির বিষয়টা উপড়ে ফেলা আর সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যেমন সর্বত্রই প্রয়োজন শুদ্ধাচার। তেমনই ব্যক্তি জীবনের জন্যও তা অপরিহার্য।