দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান

11

সকল প্রকার দুর্নীতি ও নৈতিক স্থলনজনিত কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশন উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। দুর্নীতির কারণে সেটা নষ্ট হতে দেয়া যায় না। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘দেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে’।
এর আগে নিউইয়র্কে এক নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি বলেছেন, দুর্নীতিবাজ ও অসৎ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তার সরকারের চলমান কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে। দুর্নীতিবাজ ও অসৎ ব্যক্তি নিজ দলের হলেও ছাড় নেই। কার আয় কত, কীভাবে জীবনযাপন করে-সেসব খুঁজে বের করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এসব বক্তব্য দেশের দুর্নীতিবাজদের জন্য একটি হুশিয়ারি ও সতর্কবার্তা। দেশে দুর্নীতি যে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এমন কঠোর অবস্থান জনপ্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণও বটে। তাছাড়া এটি হতে পারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স ঘোষণা বাস্তবায়নের সূচনাও।
আমাদের মনে আছে, টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো সচিবালয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সুশাসন খুবই জরুরি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, কাজেই এখন দুর্নীতির প্রয়োজন নেই। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, দুর্নীতি করলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এরপরও দুর্নীতি কমেনি।
প্রধানমন্ত্রী স¤প্রতি তার নিজ দলের সহযোগি সংগঠন যুবলীগের কর্মকান্ডে বিরক্তি প্রকাশ করার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান ক্যাসিনো জুয়ার বিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। এ অভিযানের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছে, ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের বেশকিছু নেতা-কর্মী এই অবৈধ কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত। যদিও অধিকাংশ নেতা দলে অনুপ্রবেশকারী হিসাবে গ্রেফতারকৃত নেতাদের চিহ্নিত করছেন, কিন্তু এসব অনুপ্রবেশকারীদের অনুপ্রবেশের সুযোগ কারা করে দিয়েছেন, অনুপ্রবেশের পর তাদের অবৈধ ও অপরাধমূলক কর্মকান্ডকে কারা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন-তাদের চিহ্নিত করা জরুরি।
আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ করে আসছি ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে পুলিশসহ প্রশাসনের এর সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে জোরেশোরে। এমনকি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও তোলা হচ্ছে এ ধরনের অভিযোগ। দেশে দুর্নীতি কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এ থেকে তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়। বস্তুত দুর্নীতি এখন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সমস্যা।
রাজনীতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বত্রই বিস্তার ঘটেছে দুর্নীতির। বলা যায়, ঘুষ বা অবৈধ লেনদেন ছাড়া কোথাও কোনো কাজ হয় না। দুর্নীতির বৈশ্বিক ধারণাসূচকে বছর বছর এর প্রতিফলন ঘটছে, যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাকর।
দুর্নীতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। কারণ এর ফলে আয়-বৈষম্য বাড়ছে। ব্যাহত হচ্ছে উন্নয়ন। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, দুর্নীতি না হলে দেশের চেহারা পাল্টে যেত। বস্তুত এ মুহূর্তে বাংলাদেশ যেখানে অবস্থান করছে, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন করা গেলে অতি দ্রæত সেই অবস্থান আরও অনেক উপরে উঠে যাবে। সরকার আগামী পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলেছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বিকাশমান, আকারের দিক থেকে বিশ্বে এর অবস্থান ৪১তম। মাথাপিছু আয় বাড়ায় দেশ ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাংকের বিবেচনায় নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে।
অর্থনীতির বিকাশের এই যে ধারা, তা অব্যাহত রাখতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলতে হবে অবশ্যই। তাই প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছেন, তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। আমরা আশা করি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় আন্তরিকতার সাথে বাস্তবায়ন করবে।