দুধে পানি : গোয়ালা এবং ভেজাল সমাচার

এমরান চৌধুরী

16

ভেজাল খেতে খেতে আমরা এখন এতই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, কোনটা আসল কোনটা নকল তা-ই ভুলতে বসেছি। দুধে পানি মেশানোর গল্প আমরা অনেক আগে থেকে শুনে আসছি। তেমনি একটি গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই আজকের লেখাটি। এক অবস্থাপন্ন বাড়িতে প্রতিদিন দুধ সরবরাহ করত এক গোয়ালা। তার নিজের কোনো গরু ছিল না। সে বিভিন্ন গাভীর মালিক থেকে দুধ সংগ্রহ করে একটি নিরিবিলি পরিবেশে এসে তাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি মেশাত। আর তা সরবরাহ করত বিভিন্ন বাড়িতে। একদিন হলো কী কোনো এক কারণে সে দুধে পানি মেশাতে পারেনি। সেদিন সে যথারীতি যে যে বাড়িতে দুধ দিত তাতে খাঁটি দুধই সরবরাহ করল। পরদিন দুধ দিতে গিয়ে সব বাড়ি থেকে অভিন্ন অভিযোগ উঠল। বাড়ির কর্তারা অভিযোগ করল সে দুধে পানি মিশিয়েছে আর সে পানি মেশানো দুধ খেয়ে তাদের পেটের ব্যামো হয়েছে। গোয়ালা বিনয়ের সাথে বলল, আমি এতদিন যে দুধ দিযেছি তা ছিল ভেজাল-পানি মেশানো। গতকালই সে প্রথমবারের মতো খাঁটি দুধ সরবরাহ করেছিল। গোয়ালার কথা শোনে তারা অবাক হলো, সেই থেকে একটি নতুন প্রবাদের জন্ম হলো বাঙালির পেটে খাঁটি জিনিস সহ্য হয় না, বদহজম হয়ে যায়। প্রবাদসম বাক্যটি বিদ্রæপার্থে ব্যবহৃত হয়ে আসলেও এখন এটি একটি চরম সত্যের মতো। এখন আমরা যা কিছু খাই সব কিছুই ভেজাল খাই, আর এই ভেজাল খেয়েই আমাদের ভবিষ্যতৎ প্রজন্ম বেড়ে উঠছে।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ভেজালের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে এখন তা চরম সীমায় এসে পৌঁছেছে। এখন নিত্যদিনের পণ্যের মধ্যে এমন কোনো জিনিস নেই যাতে ভেজাল মেশানো হয় না। প্রথমে আসা যাক সরিষার তেলের কথায়।সরিষার তেলের রঙ আর ঝাঁঝের জন্য নানা রকম রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হয়। কাঁচা তরিতরকারি রঙ করে বিক্রি করে ব্যাপারটা কারো অজানা নয়। রঙ করে বাসি জিনিসকে টাটকা বলে ক্রেতাদের শুধু বিভ্রান্তই করা হয় না, যে রঙ মেশানো হয় তা খুবই ক্ষতিকারক। রান্নায় ব্যবহৃত নানারকম গুঁড়ো মসলায়,যেমন লন্কা, জিরা ও ধনে গুঁড়োতে বিভিন্ন বাজে জিনিস মেশানো হয়। মরিচের গুঁড়োয় ইটের গুঁড়ো আর হলুদের গুঁড়োয় হলুদের বদলে ছাই এবং ফ্লেভার থাকার কথা শোনা যায়। দুধ, মাখন,ডালডায় প্রচুর পরিমাণে ভেজাল মেশানো হয়। পানি মেশানো দুধে গাঢ়তা আনার জন্য মেশানো হয় নানা জিনিস। ডালডা আর চর্বি দিয়ে তৈরি হয় এখন ঘি, বিভিন্ন রঙিন খাবার তৈরিতে সস্তা ও ক্ষতিকর রঙ মেশানো হয়। বিভিন্ন প্রকার মাছ এবং ফলের পচন রোধে এবং কলা পাকাতে ব্যবহ্নত হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ। এমনকি জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও হরদম ভেজাল দেওয়া হচ্ছে। এভাবে একজন মানুষ নিজে কিংবা অন্যকে বড়োলোক বানাবার আশায় করে যাচ্ছে অনৈতিক, অমানবিক কর্মকাÐ। তাদের এ সব অমানবিক কর্মকাÐ দেখে মনে হয় পৃথিবীটা শুধু তাদের থাকার জন্য তৈরি হয়েছে, অন্যের জন্য নয়।
আমাদের দেশে বিশেষ করে রমজান মাস এলে ভেজালের প্রবণতা বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায়। কারণ এ মাসটায় নতুন দ্রব্যের সরবরাহ যেমন বাড়ে সে সাথে অসাধু উপায়ে অর্থ উপার্জনের প্রবণতাও বাড়ে পাল্লা দিয়ে । আল্লাহ তায়ালা যেখানে এ মাসটায় কঠোর সংযমের উপর জোর দিয়েছেন সেখানে আমরা হয়ে উঠেছি চরম অসংযমী। যেখানে মানুষের প্রতি মানুষের স¤প্রীতির কথা বলেছেন সেখানে তার উল্টোটাই করতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছি। বছরের বারো মাসের মধ্যে এই এক মাসেই বাকি এগারো মাসের সমান অসংযমী হয়ে উঠেন প্রায় মানুষ। প্রশ্ন উঠতে পারে কীভাবে? রমজান মাসে অনেক নতুন খাবার সামগ্রী বাজারে আসে। লাচ্চা সেমাই, খেজুর-খোরমা, হালিম, ফিরনি-পায়েস, বেগুনি, আলুনি, জিলেপি এই সব প্রতিটি জিনিসেই মেশানো হয় কোনো না কোনো ক্ষতিকর পদার্থ। সবচেয়ে বেশি ভেজাল মেশানো হয় লাচ্চা সেমাই-এ। ভাবতে অবাক হতে হয় লাচ্চায় ঘি-এর নামে যা মেশানো হয় তা যদি প্রস্তুত প্রক্রিয়ার সময় কেউ পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে ছোটো শিশুটিও এই সেমাই খাওয়ার কথা নয়। এই এক মাসেই ব্যবসায়ীরা অস্বাভাবিকহারে মুনাফা করেন। যে কোনো জিনিসপত্রে যতবেশি পারেন ভেজাল মেশান। যতটা বেশি পারেন বাসি/মেয়াদবিহীন /মানহীন পণ্য অবাধে বাজারজাত/ সরবরাহ করেন। জিনিসপত্র দামাদামির সময়, বিশেষ করে ঈদের কেনাকাটার সময় বহুগুণ দাম বাড়িয়ে পণ্য বিক্রয় করেন। অর্থের কাছে, লোভের কাছে মানুষের বিবেকবোধ কর্পূরের মতো উবে যায়।
আশার কথা, এবার খাবার জাতীয় দ্রব্যের সাথে ভেজাল মিশিয়ে সাধারণ মানুষকে যারা দুরারোগ্য রোগের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন তাদের /তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মুখোশ উন্মোচিত হতে চলেছে। এস সব বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে সরল ভোক্তা সাধারণ মানুষকে ভুলিয়ে বিভিন্ন ভেজালপণ্য বাজারে সরবরাহ করে আসছিল। যে সাথে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে নিজেদের পকেট ভারি করেছিল আজ তাদের সময় এসেছে জবাব দেবার। স¤প্রতি মহামান্য হাইকোর্ট বিএসটিআই এর পরীক্ষায় অকৃতকার্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৫২টি ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য বাজার থেকে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। যে ৫২টি পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও সাধারণের কাছে পরিচিত কয়েকটি পণ্য হলোঃ সরিষার তেলের মধ্যে- তীর সরিষার তেল, পুষ্টি সরিষার তেল, রূপচাঁদা সরিষার তেল। চিপসের মধ্যে সান চিপস। হলুদের গুঁড়ার মধ্যে – প্রাণের হলুদের গুঁড়া, ড্যানিশের হলুদের গুঁড়া, ফ্রেশের হলুদের গুঁড়া, মন্জিলের হলুদের গুঁড়া, সান ফুডের হলুদের গুঁড়া ও ডলফিনের হলুদের গুঁড়া।
,মরিচের গুঁড়ার মধ্যে রয়েছে পিওর হাটহাজারী মরিচের গুঁড়া, ডলফিনের মরিচের গুঁড়া ও সূর্যের মরিচের গুঁড়া। লাচ্চা সেমাই এর মধ্যে আছে প্রাণ, মিষ্টিমেলা,কিরণ, মধুবন, মিঠাই সুইটস, ওয়েল ফুড, জেদ্দা ও অমৃতের এর লাচ্চা সেমাই। আয়োডিনযুক্ত লবণের মধ্যে আছে মধুমতি, দাদা সুপার, তিন তীর, মদিনা, তাজ, নূর, এসিআই ও মোল্লা সল্ট। ঘি এর মধ্যে আছে বনলতার ঘি ও বাঘাবাড়ির স্পেশাল ঘি। এ ছাড়া আছে এসিআই-এর ধনিয়ার গুঁড়া, প্রাণের কারি পাউডার, ড্যানিশের কারি পাউডার, কিং ময়দা, রূপসার দই, মক্কার চনাচুর, মেহেদীর বিস্কুট, নিশিতা ফুডসের সুজি, গ্রিণ লেনের মধু (সূত্র-দৈনিক পূর্বদেশ, তাং১৩/০৫/২০১৯)
ভেজালের মূল কথা হলো সীমাহীন লোভ- রাতারাতি বিত্তবান হওয়ার অশুভ প্রবণতা। এ সীমাহীন লোভ-লালসা চরিতার্থ করতে গিয়ে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে, পরিবারকে, সমাজকে সর্বোপরি দেশকে কত সহজে বিপন্ন করে তুলছেন তা তারা একটুখানি যদি ভাবতেন তাহলে এমন জঘন্য, মানবতাবিরোধী কাজ কখনো করতে পারতেন না। ভেজাল খাবার খেয়ে কিংবা ভেজাল দ্রব্য দ্বারা তৈরি খাবার ক্রমাগত খাওয়ার ফলে মানর শরীরে জন্ম নিচ্ছে নানা দুরারোগ্য ব্যাধি। নীরব ঘাতক ডায়াবেটিসের মতো ভেজালও মানুষের জীবনীশক্তিকে তিলে তিলে ক্ষয় করে দিচ্ছে। আমাদের দেশে পেটের কিংবা পাকস্থলির যে কোনো মারাত্মক অসুখের মূলে রয়েছে ভেজাল। ফলে ভেজাল দুধ, ভেজাল মাছ-মাংস, ভেজাল শাক-সবজি, ভেজাল ফলমূল খেয়ে যে প্রজন্ম বেড়ে উঠবে তারা পরিবার, দেশ ও সমাজকে একটি সুস্থ, সুন্দর, নিরোগ পৃথিবীর বদলে উপহার দেবে একটি বিকলাঙ্গ পৃথিবী, যা কারো জন্য কাম্য হতে পারে না।
আমরা জানি, ভেজাল যারা মেশায়, ভেজাল পণ্য যারা বাজারজাত করে তারা কোনো নিরীহ টাইপের লোক নয়। তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী, এদের সাথে যে নানাভাবে ক্ষমতাসীন দলের অসাধু লোকজন কিংবা অন্য রাজনৈতিক দলের লোকজন জড়িত নেই তা জোর দিয়ে বলা যাবে না। আর যদি নাই থাকে ভেজালের মতো সেøা পয়জনিং এর কাজ করার সাহস কোথা থেকে পায়, তাও ভেবে দেখার বিষয়! আজ যে ৫২টি পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, এগুলোর সঙ্গে কত শত পণ্যে যে নিয়মিত ভেজাল মেশানো হচ্ছে তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।
আসুন মহামান্য হাইকোর্ট ভেজাল বা নিম্নমানের খাদ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে সরকার ও সরকার প্রধানের প্রতি যে আহবান জানিয়েছেন।
আমরা তার প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করি। সাধারণের সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখে কোনো অন্যায় বেশিদিন চলতে পারে না। আমরা যদি ঐ সব প্রতিষ্ঠানের পণ্য ব্যবহার না করি, বর্জনের ডাক দিই এবং আমাদের আত্মীয়স্বজন,প্রতিবেশিদের ভেজাল প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম মুখ থেকে মুখে, কান থেকে কানে ছড়িয়ে দিই তাহলে ঐ সব প্রতিষ্ঠান যেমন পরিশোধিত হবে, পাশাপাশি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও ভেজাল পণ্য তৈরি, সরবরাহ কিংবা বাজারজাত করতে মোটেই দুঃসাহস দেখাবে না। তাই আইনের যথাযথ প্রয়োগ, ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের নৈতিক মূল্যবোধ, সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে আমরা ভেজাল বন্ধে রাখতে পারি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক