দু’টি নতুন জীবন

মো: দিদারুল আলম

35

হাতেম তার বন্ধুকে বলল, আজ আমাকে একটি সেমিনারে বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকতে হবে। বন্ধু তুমি আগামীকাল আসতে পার। বিশ্বাস কর, আজকে আমার হাতে একদম সময় নেই। প্রয়োজনে কালকে আমি তোমাকে ফোন করে বাসায় আসতে বলব। এদিকে সিদ্দিক তাঁর মেয়ের অসুস্থতার বিষয় নিয়ে তার বন্ধুর সাথে কথা বলতে এসেছিল। কিন্তু কথাটা বলার আগেই তার বন্ধু হাতেম জরুরি কাজ আছে বলে চলে গেলেন, অথচ ইচ্ছা করলে তিনি সিদ্দিকের কথা শুনতে পারতেন। যা হোক বড় লোকেরা এভাবেই তাদের চেয়ে কম পয়সাওয়ালা বন্ধুদের সাথে এই ধরনের আচরণ করে থাকেন। তাদের কাছে সিদ্দিকের মত মানুষের সাথে কথা বলার বা তার কথা শুনার একদম সময় হয় না।
সিদ্দিকের এক ছেলে দুই মেয়ে। ছেলের বয়স হবে ৮ বছর। বড় মেয়ে ১১ বছরের ও ছোট মেয়ের বয়স ৪ বছর। তার বড় মেয়ের একটি মারাত্মক রোগ হয়েছে। কী রোগ সেটা কোনো ডাক্তারই এখন পর্যন্ত নির্ণয় করতে পারছে না। চট্টগ্রাম ও ঢাকার অনেক বড় বড় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে তার মেয়েকে দেখানো হয়েছে কিন্তু কোনো ফল হয়নি। সবাই বলে কই কোনো রোগই তো ধরা পড়ছে না। সিদ্দিকের মেয়ে দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। খাবার দাবার কিন্তু ঠিক মতো খাচ্ছে। এদিকে তাদের যা জমা – জাতি যা ছিল বলতে গেলে তা সবই শেষ।
সিদ্দিক একটা বেসরকারি ফার্মে ও তার বৌ প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করেন। তাদের সংসার ভালই চলছিল। হঠাৎ মেয়ের অসুখ হওয়াতে সব উলট – পালট হয়ে গেছে।
মেয়ের চিকিৎসা খরচ করতে করতে তাদের প্রায় সব টাকা-পয়সা শেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। তাই এখন তাদের বাধ্য হয়ে বন্ধু – বান্ধব ও আত্মীয় – স্বজনের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। মেয়েটার সমস্যা হচ্ছে সে স্বাভাবিক খাবার দাবার ঠিকমত খেতে পারছে কিন্তু শুকিয়ে যাচ্ছে। কোনো ডাক্তারের কাছে তাকে দেখাতে নেয়া হলে সবাই বলছে মেয়েটিকে তোমরা দেশের বাইরে কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র বা সিঙ্গাপুরে। ওখানে যাওয়া আসা আর ডাক্তার দেখানো অনেক টাকার দরকার। কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের এত টাকা নেই বা জোগাড়ও করবে কোত্থেকে, কে দেবে এত টাকা।
দিন দিন সিদ্দিকের মেয়ের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। চোখের সামনে মেয়েটার অবস্থা খারাপ হতে দেখেও কিছু করতে না পারার ব্যর্থতায় তাঁর বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করছে না। মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে বাবা বলল, কেমন লাগছে আমার মা’র —
আলো: বাবা আমি কি আর বাঁচব না, আমার কিছু ভালো লাগছে না?
বাবা: এমন কথা বলে না মা, কিছুই হবে না তোমার, তোমাকে বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব, সৃষ্টিকর্তার রহমতে তাঁরা তোমাকে ভালো করে তুলবেন। একদম চিন্তা কর না।
আলো: বাবা কখন নিয়ে যাবে ডাক্তারের কাছে?
বাবা: দু’য়েকদিন পর নিয়ে যাব, তুমি একেবারেই ভালো হয়ে যাবে।
আলো: আমি আবার স্কুলে যেতে পারব।
বাবা: হ্যাঁ, আবার স্কুলে যেতে পারবে, আমার সোনা। কোনো চিন্তা করো না, মা।
বাবা – মেয়ের কথোপকথন শুনে সিদ্দিকের বৌ চোখের কান্না আর সামলাতে পারছে না। সে মনে মনে বলতে লাগলো কেন যে আমরা আজ এত অসহায়, মেয়ের চিকিৎসার খরচ যোগাড় করতে পারছি না। এভাবে কী আমাদের মেয়ে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। না, এটা হতে পারে না। যেভাবেই হোক টাকা যোগাড় করতেই হবে। আমার মেয়ে আবার মাঠে খেলবে, আবার স্কুলে যাবে। আমাকে মা বলে জড়িয়ে ধরবে। আদর করবে।
সিদ্দিকের বউয়ের নাম মায়াবতী। দেখতে একেবারেই মায়াভরা মুখ। খুব সুন্দর, চেহেরায় মাধুর্য্য ও আভিজাত্যের চাপ স্পষ্ট। অনেক লম্বা চুল যা জন্মগতভাবে রেশমী চুলের মত। বাতাসের সাথে উড়ে।
সিদ্দিক কীভাবে যে তার বৌকে বোঝায় এ পর্যন্ত তিনবার ফোন করা হয়েছে তার ভাইকে। দু’বার রিসিভ করেছে। টাকার কথা বলাতে শেষেরবার ফোন রিসিভ করেনি। অথচ তার এখন অনেক টাকা। কিন্তু সে সোজা সাপটা বলে দিয়েছেন, সে কোনো টাকা পয়সা দিতে পারবে না। সিদ্দিক তার ভাইকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছে। আজ তার এই দুর্দশায় তার ভাই টাকা পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করা তো দূরের কথা একটু সহানুভূতি পর্যন্ত দেখাচ্ছে না। অথচ তার বিদেশ যাওয়ার সময় মায়াবতীর স্বর্ণ বিক্রি করে টাকা জোগাড় করা হয়েছিল। এখন স্বর্ণের অভাবে তাকে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সময় কানে ও গলায় ইমিটেশন পরিধান করে যেতে হয়। এগুলো কী তার কিছু মনে নেই। আজ সব ভুলে গেছে। সিদ্দিক তার এই দুঃখের কথাগুলো কাউকে বলতেও পারছে না, আবার সহ্যও করতে পারছে না। কারো কাছে টাকাও চাইতে পারছে না। সেদিন একজনের কাছে গিয়েছিল টাকার জন্য। সেতো বলে উঠলো তোমার ভাইয়ের যে টাকা পয়সা আর তুমি মানুষের কাছ থেকে টাকা চাইতে আসছ কেন?
এগুলো চিন্তা করতে করতে সিদ্দিক ও মায়াবতী দিন দিন অন্যমনস্ক ও শুকিয়ে যাচ্ছে। তারা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারছে না। অফিস কামাই করতে করতে সিদ্দিকের চাকরি যাই যাই অবস্থা। অফিস থেকেও বেশ কয়েকবার টাকা চাইছিল কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। তার পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে কিন্তু সে হাল ছাড়ছে না। যে ভাবেই হোক মেয়েকে বাঁচাতেই হবে।
সে উদ্যোগ নিল তার বাড়ি বিক্রি করে তার মেয়ের চিকিৎসা করাবে। এছাড়া তাদের বিকল্প কোনো পথ নেই। সে এ ব্যাপারে মায়াবতীর সাথে কথা বললো এবং মায়াবতী বললো তোমার ভাইকে বল এই কঠিন বিপদে আমাদের একটু সাহায্য করার জন্য। এ কথাগুলো আর বলিও না। সে বলেছে কোনো সাহায্য করতে পারবে না। এ বলে সিদ্দিক আর কোনো কথা বাড়াইনি। শুধু চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে তার —
মায়াবতী : তুমি কাঁদছ কেন?
সিদ্দিক : না, আর সহ্য করতে পারছি না।
মায়াবতী : কি সহ্য করতে পারছ না?
সিদ্দিক : তিন বার ফোন করেছি ভাইকে কিন্তু তার একটাই উত্তর তার কোনো টাকা পয়সা নেই। সে কোনো টাকা দিতে পারবে না।
মায়াবতী : তুমি তাকে সবকিছু খুলে বলনি।
সিদ্দিক : সবকিছু বলেছি। কিন্তু —
মায়াবতী রাত্রে স্বপ্নে দেখল আসমান থেকে কিছু পরীর মত লোক এসে তাদের মেয়েকে নিয়ে গেল এবং তিন ঘণ্টা পর তার মেয়েকে পুরো সুস্থ করে দিয়ে গেলেন। মায়াবতী তাদের জিজ্ঞেস করল তোমরা কোথা থেকে এসেছে, কেনইবা এসেছ। কে তোমাদের পাঠিয়েছ? আমার মেয়েকে তো তোমরা ভালো করে দিয়েছ। কী বলে তোমাদের ধন্যবাদ জানাব বুঝতে পারছি না। আমার মেয়ে কি আবার স্কুলে যেতে পারবে? মাঠে খেলাধুলা করতে পারবে? আমাকে মা বলে জড়িয়ে ধরবে?
পরীরা বলে উঠলো, সব পারবে, অপেক্ষা করুন, সৃষ্টিকর্তা এমন একজনকে পাঠাবেন যার সহযোগিতার মাধ্যমে আপনার মেয়ে সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যাবে। হঠাৎ মায়াবতীর ঘুম ভেঙ্গে গেছে। সাথে সাথে বিছানা থেকে উঠে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলেন হে পালনকর্তা! আমাকে কি স্বপ্ন দেখিয়েছ জানি না, বিগত তিন মাসের মধ্যে এত ভালো আর কোনো কিছুতে লাগেনি। আমার মেয়েকে ভালো করে দাও, হে খোদা! আর কিছুই চাই না। তার এই অবস্থা দেখে সিদ্দিক তার চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারেনি। সেও ঘুম থেকে উঠে মায়াবতীর সাথে প্রার্থনা করতে লাগলো। ঘুম থেকে উঠে তারা খেয়াল করল তাদের মেয়েকে একটু আলাদা মনে হচ্ছে। চেহেরাতে নতুনত্ব দেখা যাচ্ছে।
সব প্রস্তুতি নিয়ে তারা সিংগাপুরে গেলেন এবং মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তাদের মেয়েকে ভর্তি করা হলো। ডাক্তাররা সব পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে যা বললেন, আপনারা ঠিক সময়ে এসেছেন। অন্যথায় বড় বিপদ হতে পারতো। দেখেন আপনার মেয়ে মোটামুটি সব খেতে পারছে। কিন্তু শুকিয়ে যাচ্ছে। এটা একটি জটিল রোগ। ঠিকমতো ওষুধ না পড়লে রোগী ৬ মাসের বেশিদিন বাঁচে না। যাক, এখানে কিছু কাগজপত্র আছে সবগুলো একটু পূরণ করে দিন।
টাকার অংক দেখে তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেল। প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার মতো লাগবে। সাথে সাথে তারা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলো এত টাকা!। হ্যাঁ এত টাকা লাগবে। কারণ আপনাদের মেয়েকে জটিল একটা অপারেশন করাতে হবে। কারণ তার যে রোগ হয়েছে তাতে আরেকজনের শরীরের কিছু অংশ তার শরীরে স্থানান্তর করতে হবে। এছাড়া বিকল্প নেই।
তারা ফোন করে সব কিছু হাতেমের সাথে শেয়ার করলো এবং সে বলল কোনো সমস্যা নেই। যা টাকা লাগবে আমি দেব। তোমরা চিকিৎসার ব্যবস্থা কর। আমি টাকা পাঠাচ্ছি যত দ্রুত সম্ভব।
সব ঠিকঠাক মতো চিকিৎসা করা হয়েছে। আল্লাহর বিশেষ রহমতে তাদের মেয়ে সুস্থ হয়ে উঠলো। তারা দেশে ফিরে আসার সাথে সাথে হাতেম তাদের বাসায় গেল এবং জিজ্ঞেস করলো এখন কী অবস্থা তোমাদের মেয়ের। আল্লাহর বিশেষ রহমতে এখন সে খুব ভাল আছে। মায়াবতী ও সিদ্দিক এখনো কোনো কিছু বুঝতে পারলো না কেন হাতেম এত টাকা খরচ করলে তাদের মেয়ের জন্য। তাকে জিজ্ঞেস করতে ভয়ও হচ্ছে। তারপরও সিদ্দিক সাহস করে প্রশ্ন করলো হাতেম কেন এত টাকা খরচ করেছ আমাদের মেয়ের জন্য। তোমার ঋণ আমরা কোনো দিন শোধ করতে পারব না। এত বড় উপকার কেউ কারো জন্য করে না।
হাতেম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, তোমরা হয়তো জান না, গত মাসের ১৩ তারিখ আমি ঢাকায় বড় ধরনের রোড অ্যাক্সিডেন্টে পড়েছিলাম, প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে, কেউ বলেনি, আমি আবার বেঁচে ফিরতে পারবো। যা হোক সৃষ্টিকর্তার বিশেষ দয়ায় আবার ফিরে এসেছি।
ঘটনা বলি তোমাদের। দুর্ঘটনার পর আমাকে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। প্রচুর রক্তক্ষরণের দরুণ আমি কোমায় চলে গিয়েছি। তখন ডাক্তাররা আমার বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। সবাই সময় গুণছে কখন মৃত্যুর খবর আসে। পরিবারের সবাই কান্নাকাটি করছে। তবে আমার হুশ ছিল। আমি পরিবারের লোক ও ডাক্তারদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছি কিন্তু কিছু বলতে পারছি না। হঠাৎ অশরীরি একজন এসে আমার কানে কানে বললেন, তুমি তো অনেকটা মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গেছ। একটু পর ডাক্তাররা তোমাকে মৃত ঘোষণা করবে। কিন্তু তুমি যে সৃষ্টিকর্তার কাছে চলে যাবে এমন কি করেছ উপরওয়ালা তোমাকে পুরস্কৃত করবে? তিনি তো তোমাকে অনেক ধন-সম্পদ দিয়েছে এগুলো তো কোনো ভালো কাজে তেমন ব্যবহার করনি। তোমাকে যদি সৃষ্টিকর্তা আবার প্রাণ ফিরিয়ে দেয়, তুমি কি আগের মত জীবন-যাপন করবে নাকি ভালো কাজে তোমাকে নিয়োজিত করবে। নতুন জীবন ফিরে পেলে তুমি কি তোমার ধন-সম্পদের একটা অংশ অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেবে? জবাবে আমি হ্যাঁ বললাম। তখন তারা বলল, সৃষ্টিকর্তার বিশেষ রহমতে তুমি আবার নতুন জীবন ফিরে পাচ্ছ। এ কথা বলার পর অশরীরি চলে গেলেন।
তখন আমার হাত পা নড়াচড়া করতে দেখে ডাক্তাররা দৌঁড়ে এসে চিৎকার করতে লাগলেন। দেখ, তোমরা দেখ হাতেম কোমা থেকে ফিরে এসেছে। ডাক্তাররা তখন সমস্বরে বলে উঠলেন, এটা মিরাকল। সাধারণত এ ধরনের ঘটনা পৃথিবীতে আগে কখনো ঘটেনি।
তারপর আমি আস্তে আস্তে চোখ খুললাম এবং ডাক্তারদের সাথে কথা বললাম। সে সময় আমি খুবই ক্লান্ত ছিলাম। আরো দু’য়েকদিন হাসপাতালে থাকার পর বাসায় ফিরলাম।
রাতের বেলায় আমি আমার বৌকে সব ঘটনা খুলে বলি। আমার সব ঘটনা শুনে বৌ বলল, এখন থেকে তুমি নামাজ কালাম – রোজা কখনো বাদ দিবে না। তোমার তো অনেক ধন-সম্পদ আছে। ওখান থেকে একটা অংশ অসহায়দের জন্য খরচ করবে। মনে রাখবে, সৃষ্টিকর্তার বিশেষ রহমতে তুমি নব – জীবন ফিরে পেয়েছ। আর সময় নষ্ট না করে এখনই আল্লাহর কাজে লেগে যাও।
হাতেমের কথাগুলো শুনে মায়াবতী ও সিদ্দিক তাকে বলল সৃষ্টিকর্তা তোমাকে পাঠিয়েছে আমাদের মেয়েকে ভালো করে দেওয়ার জন্য। তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।