দীর্ঘ হচ্ছে ছুটি কিন্তু বাড়ছে কোভিড সংক্রমণ চিকিৎসাসেবায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি

20

করোনা সংক্রমণ এড়াতে সরকার চারদফায় ছুটি বাড়িয়ে ১৬ মে পর্যন্ত করেছে। প্রধানমন্ত্রী ঘরে বসে ঈদ করতে বলেছেন, সঙ্গতকারণে অনুমান করা যায়, এ বন্ধ আরো একদফা বাড়তে পারে। সরকারের দীর্ঘ এ ছুটির লক্ষ্য কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের ভয়াবহতা প্রতিরোধে দেশের মানুষকে পরস্পরথেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর-এর নির্দেশনায় মূলত এ ভাইরাস মোকাবেলায় মানুষে মানুষে সাময়িক বিচ্ছিন্নতাকে প্রধান প্রতিষেধক বলা হয়েছে। এরপর সাবান পানি দিয়ে হাত ধৌত করা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, বাইরে মাস্ক পরা ইত্যাদি। এর বাইরে করোনা উপসর্গ আছে এমন লোকদের চিহ্নিত করে তাদের নমুনা সংগ্রহ করে টেস্ট করা এবং ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেলে কোরেন্টিন বা আইসোলেসনই এরোগে প্রতিরোধের একমাত্র ব্যবস্থা। কিন্তু উপর্যুক্ত সব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা, অমিল এবং অব্যবস্থাপনা আজ দিনের আলোর মত স্পষ্ট হতে চলছে। আমরা পথে-ঘাটে, বাজার ও দোকানে যেমন মানুষের ভিড় লক্ষ করছি, একইভাবে নমুনা পরীক্ষার নামে ভোগান্তির খবরও প্রতিদিন খবরের কাগজে আমরা দেখছি। নির্দিষ্ট হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব, পিপিই ও এন নাইনটি ফাইভ মাস্কের অভাব এসব তো আছেই। এখানেই ভোগান্তির শেষ নয়; নমুনা পরীক্ষায় ভুল রিপোর্টও আসছে। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, চট্টগ্রামে ভুল রিপোর্টের কারণে ফৌজদারহাটের নমুনা পরীক্ষার জন্য একমাত্র নির্ধারিত চিকিৎসা কেন্দ্রটিতে হযবরল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর সাথে জানা যায়, ঢাকার আইইডিসিআরে প্রায় তিন হাজার নমুনা আটকে রয়েছে। এমন অসংখ্য অভিযোগ কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় সরকার নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে। উদ্বেগজনক হলো, এ অবস্থা ঢাকার পাশাপশি চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য হাসপাতালেও একই ধরনের অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করা হাসপাতালের এমন চিত্র অনভিপ্রেত ও অনাকাক্সিক্ষত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রাজধানীর ১০টিসহ দেশে মোট ২৯ হাসপাতালকে নির্ধারণ করেছে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য। এসব হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকরা বলছেন, এ হাসপাতালগুলো নির্ধারণ করা হলেও রাজধানীর দুটিসহ সারা দেশে ১০ থেকে ১১টি হাসপাতালে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা হচ্ছে। বাকিগুলো বহির্বিভাগে করোনা উপসর্গ সর্দি, জ্বর, কাশি নিয়ে আসা রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছে। তাদের এখনো রোগী ভর্তি করানোর মতো প্রস্তুতি নেই। শুধু তাই নয়, যে দুটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া করা হচ্ছে সেগুলোতেও নেই পর্যাপ্ত জনবল, নার্স ও ইকুইপমেন্ট। নেই রোগীদের অক্সিজেনের ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবস্থা জটিল হলে কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন দিতে হয়। দ্রæত বিকল্প ব্যবস্থায় অক্সিজেন সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইইডিসিআরের বাইরে হাতেগোনা আরো কয়েকটি প্রতিতষ্ঠানে নমুনা পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও সেগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে রোগীদের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রতিদিন তিনশ করে মানুষের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর বিপরীতে নমুনা পরীক্ষার জন্য জড়ো হন কয়েক হাজার মানুষ। গাদাগাদি করে লাইনে দাঁড়িয়ে নমুনা দেয়ার কারণেও আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ফলে আক্রান্ত নন, এমন ব্যক্তিও সংক্রমিত হতে পারেন। নমুনা পরীক্ষা করতে গিয়ে এভাবেই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ডাক্তার-নার্স ও চিকিৎসকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। ইতোমধ্যে দুইজন চিকিৎসক মৃত্যু বরণ করেছেন। সতরাং তাদের সুরক্ষা সরঞ্জাম সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, নইলে এ রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। চীনের অভিজ্ঞতা ও পদক্ষেপ থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশকে আরো সতর্ক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। হাসপাতালগুলোতে যে অব্যবস্থাপনা আমরা দেখতে পারছি তা দ্রুত নিরসন করতে হবে। আইসোলেশন ইউনিট মহামারি ঠেকানোর জন্য অনিবার্য একটি বিষয়। কয়টি হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট রয়েছে। এখনো সময় আছে, যেসব প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে তা দ্রুত দূর করতে সরকারকে আরো উদ্যোগী হতে হবে।