দালাল ও দুলাল

মছিউদ্দৌলা জাহাঙ্গীর

13

তথ্যের বেড়াজালে আমরা কেবলই আটকে থাকি, সেই সাথে তত্তে¡র বেড়াজালেও, কেউ তথ্য দেয় কেউ দেয় তত্ত্ব। গত সপ্তায় পেলাম একটি তথ্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দালাল! তার আগের সপ্তাহে পেয়েছিলাম আরেকটি তথ্য পাসপোর্ট অফিসে দালাল এবং তা নিয়ে নাতিদীর্ঘ একটি প্রবন্ধ আমার ইতোমধ্যে পূর্বদেশে ছাপানো হয়েছে। এ সপ্তায়ও যে আবার একই কান্ড করতে হবে অর্থাৎ দালাল নিয়ে লিখতে হবে কখনো ভাবিনি। কিন্তু কি করব? ঐ যে কবি বলেছেন; আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাই রে, লিখে যাবার মন্ত্র আমি পেপার হতে পাই রে। দ্বিতীয় কথাটি অবশ্য আমার। কথা হলো পূর্বদেশে সেদিন আবার দেখলাম চমেকহাতে দালাল, তার আগে পিপি অফিসে দালাল তা’ও দেখেছি পূর্বদেশেই। অবস্থা দেখে মনে হয়, দেশে দালালের ছড়াছড়ি। কোর্টে দালাল, পোর্টে দালাল, ভোটে দালাল, জোটেও দালাল! মাশাল্লাহ্ দালালে দালালে গুলাল, তারাই হবে তাহলে আলালের ঘরের দুলাল। এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দালালদের নিয়ে বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এক তত্ত্ব ও দিয়েছে, দালাল নিয়ন্ত্রণেই বছরে হাসপাতালের আয় বাড়বে ১৮ কোটি টাকা। অবশ্যই বিশাল ব্যাপার, মাসে দেড় কোটি টাকা আয় বৃদ্ধি মামুলি কথা নয়। মামুলি বলার কারণ দীর্ঘদিন হাসপাতালটি অবহেলিত ছিল অথচ কি বিশাল জায়গা জুড়ে তার অবস্থান। পাহাড় ঘেরা কত মনোরম পরিবেশে হাসপাতালটি দাঁড়িয়ে আছে, বিশাল ভবন একসময় বড় নোংরা অবস্থায় ছিল। যদ্দুর জানি দেশের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম বড় হাসপাতাল পাকিস্তান আমলে ১৯৫৭ সালে নির্মিত হয়েছিল। তার আগে এত বড় হাসপাতাল বাংলাদেশে ছিলনা, এত বিশাল ভবনও ছিল কিনা জানিনা আমরা প্রথম লিফট চিনে ছিলাম এখানে। বাংলাদেশে জানিনা তবে চট্টগ্রামে প্রথম লিফট সংযোজিত হয়েছিল সম্ভবত এই ভবনটিতে। স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলো ঢাকার প্রতি বিশেষ নজর দিতে গিয়ে চট্টগ্রামকে একদম গ্রাম বানিয়ে ফেলেছিল ফলে হাসপাতালটির বড় করুণ দশা হয়েছিল এবং তা এখনও চলছে।
’৮৫ তে যখন আমি প্রথম ঢাকা গিয়েছি, তখন ঢাকার তুলনায় চট্টগ্রাম ছিল একটি জীর্ণ পাড়া গাঁ। অবশ্য এখন অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে দুই শহরের মধ্যে দেখতে নাকি তেমন বড় রকমের পার্থক্য ছিলনা, ফার্স্ট সিটি সেকেন্ড সিটির সামঞ্জস্যতাটা ছিল বড় দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু বাংলাদেশ পিরিয়ডে এসে ব্যবধানটা হয়ে গেল দৃষ্টিকটু, উভয়ের মধ্যে পাঁচশ-ছয়শ নম্বরের ব্যবধান হয়ে গেল। বিষয়টি একটু পরিষ্কার করে বলি; আমাদের সিদ্দিক চাচা ক্লাশে ফার্স্ট বয় ছিলেন তাঁর বন্ধু করিম চাচা ছিলেন বরাবরই সেকেন্ড বয়। এখন সিদ্দিক চাচার ভাষায় তিনি করিম চাচা থেকে বরাবরই পাঁচশ-ছয়শ নাম্বার বেশি পেতেন। কথা হলো হাজার নম্বরের পরীক্ষায় ফার্স্ট ও সেকেন্ডের নম্বরের ব্যবধান এত বিশাল হলে উনাদের প্রাপ্ত নম্বরের অবস্থা কি ছিল তা গবেষণার বিষয়। অবশ্য সিদ্দিক চাচার এ গর্বভরা উক্তির বক্তা ছিলেন তিনি নিজেই আর তা যাচায়ের তেমন কোন নির্ভরযোগ্য কষ্টি পাথরও আমাদের ছিলনা, কারণ করিম চাচা তখন বেঁচে ছিলেন না।
ঢাকায় প্রথম নেমে আমি যা দেখলাম তাতেই সিদ্দিক চাচার কথাটি আমার বিশ্বাস হয়ে গেল। ফার্স্ট ও সেকেন্ড সিটির ব্যবধান এত বিশাল হতে পারলে ফার্স্ট ও সেকেন্ড বয়ের ব্যবধান ৫-৬ শ হতে পারবেনা কেন? পৃথিবীর আর কোথাও ফার্স্ট আর সেকেন্ড সিটির এত ব্যবধান আছে কিনা জানিনা তবে ফার্স্ট আর সেকেন্ড বয়ের ব্যবধান সচরাচর এক-দুই নম্বরের হয়ে থাকে। অবশ্য সিদ্দিক চাচা ৯৮০ আর করিম চাচা ৩৮০ পাওয়া সম্ভব, ঢাকা-চট্টগ্রাম বাস্তব হলে চাচাদেরটা অবাস্তব হয় কেমনে? চট্টগ্রামের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের কারণে চট্টগ্রাম মেডিকেল হসপিটালটিও সতীনের পুতে পরিণত হয়েছিল। চতুর্দিকে কি নোংরা আবর্জনা ছিল, দুর্গন্ধ ছড়াত, ফলে কিছুটা অবস্থাপন্ন হলেই ওই সকল পরিবারগুলো চমেক এর বদলে ক্লিনিক বেছে নিত এবং সে ধারা এখনও বর্তমান। সবচাইতে বড় ব্যাপার হচ্ছে এটি এখন একটি প্র্যাস্টিজ ইস্যু হয়ে গেছে যে মেডিকেলে ভর্তি হবে না ক্লিনিকে ভর্তি হবে? বিষয়টি এখন সামাজিক মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে! জনগণের কথা কি বলবো সরকারই তো বিষয়টিকে এমন জটিল বানিয়ে ফেলেছে দীর্ঘদিনের অবহেলা আর বিমাতাসুলভ আচরণের মাধ্যমে। ঔষধ পাওয়া যায় না, চিকিৎসা পাওয়া যায় না, সেবা পাওয়া যায় না এগুলো দীর্ঘদিনের অভিযোগ। প্রচার আছে যে মেডিকেলের ঔষধগুলো মেডিকেলে পাওয়া যায় না, ব্যক্তি মালিকানাধীন দোকানগুলোতে পাওয়া যায়। অনুরূপ আরো অনেক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ বাজারে চালু রয়েছে, যেমন বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম হতে শুরু করে বাসন, পেয়ালা, চামচ, ইত্যাদি বাইরে বিক্রি হয়ে যায়। অবশ্য এখন হয় কিনা জানিনা তবে আগে যে হতো তা ছিল ওপেন সিক্রেট।
আমার এক পরিচিত মেডিকেলে চাকরি করেন তার মাধ্যমে বছর দুই আগে সেখানে চিকিৎসা নিতে গেলাম। প্রথমে অপেক্ষার পালা দেখে আমার বিরক্তি এসে গেল তারপর চিকিৎসা যা পেলাম উপকার তো কিছু হলোই না ব্যবস্থাপত্র নিয়ে বের হতেই দেখি কতগুলো লোক আমাকে ঘিরে ধরেছে। ব্যবস্থাপত্রে আমাকে কিছু প্যাথলজিক্যাল টেস্টের পরামর্শ দিয়েছেন। আমাকে ঘিরে থাকা লোকগুলো বিভিন্ন প্যাথলজিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধি তথা দালাল। তাদের রসে ভরা কথায় আমি মুগ্ধ হয়ে ভাবলাম ঠিকই তো যে টেস্ট আমি তাদের কাছে করালে দুদিনে করতে পারবো মেডিকেলে করলে তা দুই সপ্তাহ লাগবে। মেডিকেলে নাম এন্ট্রি করতে হবে, সিরিয়াল নিতে হবে আবার ফি দিতে হবে তার চাইতে টাকা কিছু বেশি দিয়ে দালালদের লেজ ধরলে অনেক ফায়দা হয়। ফলে আর না ভেবে সুবোধ বালকের ন্যায় এখানেও আমি দালালের শরণাপন্ন হলাম যথারীতি পাসপোর্ট আর ভিসা অফিসের মতো, গত সপ্তায় যা আমি বিস্তারিত বলেছি আমার লিখায়। বলেছিলাম পেপার আমার খোরাক যোগায় তাই নিয়মিত পেপার ঘাঁটি, ক’দিন ধরে লক্ষ্য করছি প্রকাশিত কিছু সংবাদ আমার ঘটনার সাথে মিলে যাচ্ছে তাই ওসব নিয়ে লিখতে আমি সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠি।
এখন দালাল কোথায় নাই, সব জায়গায় আছে। আমরা শুধু দালালদের নিয়ে মাতামাতি করি দুলালদের নিয়ে কিছু বলি না। দুলাল কারা, দালালদের যারা পোষেন তারাই দুলাল। এই যেমন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি, সেক্রেটারি, মন্ত্রী-এম পি ইনারা হচ্ছেন দুলাল। মাশাল্লাহ একেক জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির জন্যে হাজার হাজার হতে লাখ টাকা পর্যন্ত উপঢৌকন নেওয়া হয়, চাকরি দেওয়ার নাম করে লক্ষ লক্ষ টাকা একেক জনের কাছ থেকে হাতানো হয়। এসব করেন দুলালরা, কিন্তু উনারা তো তা সরাসরি করতে পারেন না, প্র্যাস্টিজ হ্যাম্পার হয় ফলে মাধ্যম হিসেবে উনারা দালালদের ব্যবহার করেন। দালালরা বড় সুকৌশলে কার্য সম্পাদন করে আর তাতে করে দুলালদের সম্মানও বাঁচে সম্পদও আসে। সুতরাং আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে আমরা দালালদের ব্যবহার করি আবার দালালদের দৌরাত্ম্য বলে তাদের গালিও দেই। এখন তাহলে বিচার করুন দোষ কার দালালদের না দুলালদের? আসলে টাকা বড়ই লোভনীয় বস্তু, সবার টাকা চাই, ছেলে-বুড়ো, ধনী-গরিব সবার। ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা একলা জেগে রই কবি বলেছেন আর আমরা বলি টাকার গন্ধে ঘুম আসেনা সদা জেগে রই। বিটিভিতে এক সময় একটি নাটক প্রচারিত হতো ঈদ উপলক্ষে, নাম জব্বার আলী। বেশ জনপ্রিয় ছিল নাটকটি সবাই আমরা বড় আগ্রহ ভরে দেখতাম। প্রখ্যাত সিনেমা ও টিভি ব্যক্তিত্ব আমজাদ হোসেন সাহেবের নাটক, জব্বার আলী কোন কারণে বেহুঁশ হয়ে গেলে সাথে সাথে তাকে টাকার বান্ডিল শোঁকানো হতো আর তাতেই তার হুঁশ এসে যেত।
প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী প্রয়াত আব্দুল জব্বার সাহেবের একটি গান; সালাম পৃথিবী তোমাকে সালাম, দুনিয়াকে করেছ টাকার গোলাম। অর্থ অনর্থের মূল- এমন অনেক নীতি বাক্য শুনে শুনে বড় হয়েছি পরিবর্তন কিছুই হয়নি। জব্বার সাহেব টাকাকে ঘৃণা করেছেন, কিন্তু জব্বার আলী টাকাকে মহব্বত করেছে। ঠিক তেমনি অনেক মনীষী দেখেছি অর্থকে ঘৃণা করেছেন আবার অর্থের কাছে বিক্রিও হয়েছেন, ক্ষমতার সামনে মাথা নত করেছেন। আসলে ক্ষমতা এবং অর্থ প্রচন্ড শক্তিশালী বস্তু, এগুলোর সামনে সবাই অসহায় হয়ে যায়, অবৈধ বৈধ হয়ে যায়। ফলে দুলাল আপনি কোথায় পাবেন? এই বস্তু দুটি যতদিন থাকবে দুলাল দালাল হতে বেশিদিন লাগবেনা। বস্তু দুটিও কোনদিন শেষ হবেনা। কে বলে নীতি-নৈতিকতা-আদর্শ? এসবের তো অনেক আগে কবর হয়ে গেছে, দুলালে-দালালে দেশ এখন সয়লাব। তবে লোভ এবং ক্ষমতার মোহ যদি সম্ভ্রম করা যায় দালালরাই হয়ে উঠবে সত্যিকারের দুলাল।

লেখক : কলামিস্ট