দানবীর হাজী মোহাম্মদ মোহসীন

মো. জোবায়ের আলী জুয়েল

14

পৃথিবী থেকে ঋণ নিয়ে যাচ্ছিনা, বরং পৃথিবীকে-মানুষকে যাচ্ছি ঋণী করে- বিদায় বেলায় ক’জন এ’কথা বলতে পারে? হাজী মোহাম্মদ মোহসীন ঐ সকল মুষ্টিমেয় মানুষের একজন, যাঁরা বলতে পারেন, জগৎ কে ঋণী করে গেলাম।
হাজী মোহাম্মদ মোহসীনের জন্ম হুগলীতে ১৭৩২ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান, চিরকুমার ও মহান জন হিতৈষী ব্যক্তি। তাঁর পিতা ছিলেন হাজী ফয়জুল্লাহ এবং মাতা জয়নাব খানম। জয়নাব খানমের প্রথম বিয়ে হয়েছিল হুগলির এক ধর্নাঢ্য ব্যবসায়ী আগা মোতাহারের সাথে। মন্নুজান খানম ছিলেন তাঁদের ঔরসজাত সন্তান।
মৃত্যুর আগে সুদীর্ঘ সাত বছরকাল আগা মোতাহারের স্বপ্ন সাধ মন্নুজানকে দিয়েই তৈরি হচ্ছিল। আগা মোতাহার মূলত: ছিলেন একজন ইরানী ব্যবসায়ী। তিনি হুগলিতেই বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং হুগলি, যশোর, মুর্শিদাবাদ এবং নদীয়ায় জীবিতকালেই বিস্তীর্ণ জায়গীর লাভ করেছিলেন। মন্নুই ছিল পিতার প্রাণের প্রাণ জীবনের জীবন। মন্নুকে পিতা একদিন একটা সোনার তাবিজ উপহার দেন। নির্দেশ দেয়া হলো, তাবিজটি খোলা হয় যেনো আগা মোতাহারের মৃত্যুর পরে। মন্নুজানের বয়স যখন মাত্র আট বছর তখন আগা মোতাহারের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরে তাবিজ যখন খোলা হলো, দেখা গেলো তাতে রয়েছে দানপত্র। আগা মোতাহার তাঁর সমস্ত অর্থ সম্পত্তি মন্নুজান খানমের নামে উইল করে যান।
দানপত্র দেখে মন্নুজানের মা’ জয়নাব খানম খুব খুশী হলেন না। তাঁর প্রাণপ্রিয় স্বামী তাঁর সমস্ত বিষয় সম্পত্তির মালিক করে গেছেন নাবালিকা কন্যাকে। স্ত্রীর জন্যে তিনি কিছুই রেখে যান নাই। স্বামীর ঔদাসিন্য ও উপেক্ষায় তিনি ব্যথিত হলেন। পরবর্তীতে আগা মোতাহারের আত্মীয় বিদ^ান, বিচক্ষণ ও সুদর্শন হাজী ফয়জুল্লাহর সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। জয়নাব খানমের এই নতুন সংসারে হাজী মোহাম্মদ মোহসীনের জন্ম। মোহসীনের পিতা ফয়জুল্লাহ তাঁর পুত্রকে সেই আমলের সম্ভাব্য শিক্ষায় যথেষ্ট শিক্ষিত করে তোলেন। মোহসীন আর মন্নুজান সৎ ভাই বোন। এক বৃন্তে দু’টি ফুল প্রায়। ১৭৩২ খ্রিস্টাব্দে মোহসীনের জন্ম আর মন্নুজানের জন্ম ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে। মন্নুজানের সঙ্গে মোহসীনের বয়সের ব্যবধান দশ বছরের। একজন গৃহ শিক্ষক মোহসীন ও তাঁর সৎ বোন মন্নুজানকে শিক্ষা প্রদান করতেন। আরবী-ফারসী ভাষা শিক্ষায় মোহসীন অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিলেন। কোরআন, হাদিস, সাহিত্য, গণিত, ইতিহাস, দর্শন সব কিছুতেই মোহসীন অসামান্য বুৎপত্তি অর্জন করেন। ভাষা শিক্ষার সাথে সাথে মোহসীন সঙ্গীত শিক্ষাও শুরু করেন। সেকালে সর্বত্রই সঙ্গীতের কদর ছিল অভাবনীয়। সে-যুগের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞ গুণী ভোলানাথ ওস্তাদের কাছে মোহসীন কণ্ঠ সঙ্গীত ও যন্ত্র সঙ্গীত দুই-ই শিক্ষা করেছিলেন। সেতারে মোহসীন এতই নৈপূণ্য লাভ করেছিলেন যে তৎকালীন দক্ষ সেতার বাদক হিসেবে চারদিকে তাঁর প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তিনি উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য বাংলা সুবাহর তৎকালীন রাজধানী মুর্শিদাবাদ গমন করেন। ভ্রমন মানুষের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করে এই বিশ্বাসে মোহসীন ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব ভ্রমনে বেড়িয়ে পড়েন। তিনি ইরান, ইরাক, আরব, তুরস্ক প্রভৃতি দেশ ভ্রমন করেন। সেই সঙ্গে মক্কা, মদীনা, কুফা, কারবালা প্রভৃতি পবিত্র স্থানে যান। মক্কা, মদীনায় তিনি পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেন। এরপর মোহসীন দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ইতোমধ্যে তাঁর পিতা-মাতা মৃত্যুবরণ করেছেন। ভগিনী মন্নুজান তখন যৌবন ও ঐশ্বর্য্যরে অধিকারীনি। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই বহু লোকের দৃষ্টি তাঁর দিকে আকৃষ্ট হলো। মোহসীন একদিন আবিস্কার করলেন সম্পত্তির লোভে বোনকে তাঁর বিষ দেয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করতে ভাই বোনকে বেশ বেগ পেতে হলো। এরপর আগা মোতাহারের ভ্রাতুস্পুত্র হুগলির নায়েব ফৌজদার মির্জা সালাহ উদ্দীনের সঙ্গে মন্নুজান বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিদ্বান, কবি, রাজনীতিক সালাহউদ্দিনের সঙ্গে বিদুষী, বুদ্ধিমতি, সঙ্গীত শিল্পী মন্নুজানের মিলন ঘটলো। চৌত্রিশ বছর বয়সে মোহসীন আবার হুগলি থেকে ভ্রমনের জন্য যাত্রা শুরু করেন। তারপর আরব, ইরান, তুরস্ক, মিসর, নজফ, বাগদাদ, কায়রো, ইস্পাহান প্রভৃতি দেশ ভ্রমন করে বিপুল জ্ঞান অর্জন করেন।
অল্পবয়সে বিধবা হয়ে যাওয়া নি:সন্তান মন্নুজান তাঁর বিশাল সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য মোহসীনকে ব্যকুলভাবে দেশে ফিরে আসার আহবান জানান। বোনের সনির্বন্ধ অনুরোধ সেই আহবানে সাড়া দিয়ে মোহসীন দীর্ঘ সাতাশ বছর পর নিজ গৃহে হুগলিতে প্রত্যাবর্তন করেন। মোহসীন যখন ফিরে এলেন হুগলীর তখন যথেষ্ট পরিবর্তন হয়েছে। মন্নুজানের স্বামী সালাহউদ্দিন তখন পরলোকে।
১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে বড় বোন মন্নুজান ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে নি:সন্তান মন্নুজান তাঁর সমুদয় সম্পত্তি ভাই মোহসীনকে দান করে যান। এ সময় মোহসীনের বয়স হয়েছিল সত্তর বছরেরও বেশি। চিরকুমার মোহসীন বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়ে চিন্তিত হলেন। কঠোর তপস্বী মোহসীন ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ এপ্রিল একটি ট্রাস্ট গঠন করে দু’জন মুতাওয়াল্লী নিযুক্ত করেন। তিনি তাঁর প্রদত্ত সম্পত্তিকে নয়টি শেয়ারে বিভক্ত করেন। ৩টি শেয়ার ধর্মীয় কর্মকান্ডে ব্যবহারের জন্য; পেনশন, বৃত্তি এবং দাতব্য কাজে ব্যয়ের নিমিত্তে ৪টি শেয়ার এবং ২টি শেয়ার রাখা হয় মুতাওয়াল্লীদের বেতন হিসেবে। মোহসীন খুব সাধারণ ও ধর্মীয় জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন।
তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় বিগত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মোহসীনের সম্পত্তি থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা বিভিন্ন সৎকার্য্যে ব্যয় করা হয়েছে। তৎকালীন মোহসীন শিক্ষা ফান্ড থেকে সাহায্য না পেয়েছেন এমন শিক্ষিত মুসলমান এদেশে বিরল। হাজী মোহাম্মদ মোহসীনের কত সম্পত্তি ছিল বা এখন আছে তার সঠিক হিসাব কেউ দিতে পারেন নি। মোহসীন এস্টেটের অধিকাংশ সম্পত্তি ছিল বাংলাদেশের যশোর ও খুলনায়। এর পরিমান এক হাজার ৮০০ একরের মতো। তখন যশোর ও খুলনার মোহসীন এস্টেট থেকেই ৬৫ হাজার টাকার কর আসতো। আর গোটা মোহসীন এস্টেট থেকে আয় হতো একলাখ ৮০ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়েই রক্ষণাবেক্ষণ হতো মোহসীন এস্টেট, বিশেষত ইমামবাড়া ও মোহসীনদের পারিবারি কবরস্থান। যশোর ও খুলনা বাদে হুগলীর চুঁচুরা, হাজিনগর, নদীয়ার কল্যাণী, মুর্শিদাবাদ, কলকাতার খিদিরপুর এবং পদ্মপুকুরেও রয়েছে মোহসীনের অন্তত একহাজার ৪০০ একর সম্পত্তি। কেবল হুগলীতেই রয়েছে ১২ হাজার বিঘা সম্পত্তি। তবে এ বিপুল সম্পত্তির অধিকাংশ এখন বেহাত।
ইমাম বাড়ার একটু দুরেই রয়েছে মোহসীনের পরিবারিক কবরস্থান। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন হাজী মোহাম্মদ মোহসীন, তাঁর বোন মন্নুজান খানম, মোহসীনের মা জয়নাব বেগম, ভগ্নিপতি আগা সালাহউদ্দিন, বাবা হাজী ফয়জুল্লাহ ও ইঞ্জিনিয়ার আগা মোতাহার।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, হুগলী ও যশোরের মাদ্রাসা মোহসীনের অর্থে পরিচালিত হয়েছে। মোহসীনের সম্পত্তির উদ্বৃত্ত অর্থ থেকে হুগলী কলেজেরও সূত্রপাত হয় ১৮৩৬ খ্রি.। সুদীর্ঘ সাইত্রিশ বছর যাবত এই কলেজের জন্যে মোহসীনের ফান্ড থেকে সেকালে বার্ষিক পঁচাত্তর হাজার টাকা করে ব্যয় হতো। দানবীর মোহসীনের এই আয় থেকে এখনো দুস্থ ও মুসলিম কৃতী ছাত্র-ছাত্রীদের দেয়া হয় বৃত্তি। এ বছরও ৩০ হাজার রুপি করে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে ১১৮ জন ছাত্রী-ছাত্রীকে।
বাংলার প্রথম গ্রাজুয়েট বঙ্কিম চন্দ্র, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বাংলার প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট খান বাহাদুর দেলওয়ার হোসেন (১৮৬১ খ্রি. মুসলমানদের মধ্যে প্রথম বি.এ পাশ করেন), বিপারপতি আমীর আলী, স্ত্রী শিক্ষার অগ্রনায়িকা মিসেস আর.এস হোসেনের স্বামী খান বাহাদুর শাখাওয়াত হোসেন প্রমূখ মনীষীরা মোহসীনের কলেজে মোহসীনের অর্থে শিক্ষালাভ করেছেন। বলতে কি, সেকালে বাঙলার অনেকখানি গড়ে উঠেছে মোহসীনের দানের ছায়ায়। স্থানীয় মানুষজন চাইছেন মোহসীনের ইমামবাড়াকে সংস্কার করে টিকিয়ে রাখা হোক মোহসীনের স্মৃতিকে। এখানে হুগলীতে গড়া হোক একটি পর্যটন কেন্দ্র। এজন্য এখানে এখন প্রাথমিক পর্যায়ের কাজও শুরু হয়েছে।
বাংলার এই মহান ব্যক্তি, মানবদরদী মোহসীন ১৮১২ খ্রিস্টাব্দের ২৯ নভেম্বর ৮২ বছর বয়সে হুগলিতে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর পর হুগলীর ইমামবাড়ার পাশ্ববর্তী বাগানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর ২০৪ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে জানাই হৃদয়ের অফুরন্ত ভালোবাসা। আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।