দর্শনার্থীশূন্য হয়ে পড়েছে রাঙামাটি চিড়িয়াখানা

রাঙামাটি প্রতিনিধি

9

প্রশাসনের অবহেলায় একেবারে জনশূন্য হয়ে পড়েছে রাঙামাটির অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র মিনি চিড়িয়াখানাটি। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে চিড়িয়াখানার বেহাল দশার সৃষ্টি হয়েছে। কর্মচারীদের অজ্ঞতায় মারা গেছে চিড়িয়াখানায় জন্ম নেওয়া একটি হরিণ শাবকও।
সূত্র জানায়, ২০০২ সালে রাঙামাটি শহরের উপকন্ঠে ভেদভেদীর সুখী নীলগঞ্জ নামক স্থানে মিনি চিড়িয়াখানাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুরুতে রাঙামাটি শহরের বাসিন্দাদের জন্য অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র হয়ে উঠে চিড়িয়াখানাটি। অবসর পেলেই বিনোদনপ্রেমীরা ছুটে আসতেন এখানে। পর্যটক, চাকরিজীবী, শিশু-কিশোরদের ভিড় লেগেই থাকতো। কিন্তু বর্তমানে চিড়িয়াখানাটি জনশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিবছর লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রশাসন। দর্শনার্থীর অভাবে বিনোদন কেন্দ্রটিকে ‘গলার কাঁটা’ ভেবে প্রাণিগুলোকে অন্য চিড়িয়াখানায় বিক্রি করে দেওয়ার কয়েক দফা চেষ্টা চালায় জেলা পরিষদ।
সূত্র আরো জানায়, প্রশাসনের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে এ চিড়িয়াখানার বেহাল দশার সৃষ্টি হয়েছে। প্রাণির সংখ্যা দিন দিন কমতে শুরু করেছে। নিয়োজিত কর্মচারীদের কেউই প্রাণিদের রক্ষণাবেক্ষণে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। আর এই অনভিজ্ঞতার কারণে কয়েকদিন আগে খাঁচায় জন্ম নেওয়া একটি হরিণ শাবক মারা গেছে বলে জানা যায়। কারণে অকারণে শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বের হাত বদল করা হচ্ছে। তারপরও কোন লাভ হচ্ছেনা। বরং নানাভাবে ভুয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে প্রাণিদের খাবার ও চিড়িয়াখানার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সাধন মনি চাকমার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, দুুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, বছরে ৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হচ্ছে তিনটি হরিণ, একটি ভালুক, চারটি বানর, তিনটি অজগর, দুইটি করে সজারু, কচ্ছপ ও টার্কি, পাঁচটি বনমোরগ ও তিনটি খরগোশের খাবারের পেছনে। অথচ তিন বছর আগেও মাসে ১২ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছিল এই চিড়িয়াখানার। সে সময় প্রাণিগুলো আরো বেশি সুস্থ ও সবল ছিল বলে জানা গেছে।
তবে কোন অনিয়ম হচ্ছেনা বলে দাবি মিনি চিড়িয়াখানাটির তত্ত¡াবধানে থাকা রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য সাধন মনি চাকমা। তিনি বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে চিড়িয়াখানার উন্নতি হয়েছে। নিজের সন্তানের মতোই দেখভাল করছি বলেই খাঁচার প্রাণিরা এখনও বেঁচে আছে। কোন প্রকার অনিয়ম দুর্নীতি দেখিয়ে দিতে পারলে আমি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য পদ ছেড়ে দেব বলেও জানান তিনি।
রাঙামাটি মিনি চিড়িয়াখানার জীবজন্তু ও প্রাণিদের দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন চারজন। এদের একজন রতœজীবন চাকমা, সপ্তাহে দুয়েকবার চিড়িয়াখানায় আসেন। তাই যাবতীয় কাজ সামাল দেন দারোয়ান শ্রবণ প্রতিবন্ধী নিরঞ্জয় চাকমা। আর পক্ষাঘাতগ্রস্ত নৈশ প্রহরী গুলমনি চাকমা। খুব দরকার পড়লে তিনিও অতি কষ্টে খুঁড়িয়ে গিয়ে কাজ সারেন। অন্যজনের নামই ভুলে গেছেন এই সহকর্মীরা!
সরেজমিনে দেখা গেছে, খাঁচাগুলোতে প্রাণিদের বিষ্ঠার স্তূপ পড়ে আছে। সেখান থেকে বিকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সামনে যাওয়াই মুশকিল। প্রাণিদের পচা-বাসী ফলমূল ও সব্জি খেতে দেওয়া হয়েছে। হরিণের খাঁচার মেঝেতে পড়ে আছে কয়েকদিনের পঁচা কলারছড়ি ও মিষ্টি কুমড়ার টুকরো। প্রতিটি খাঁচাতেই খাবার পানির সংকট দেখা গেছে। দুর্বল ও শীর্ণকায় হয়ে খাঁচার একপাশে পড়ে রয়েছে প্রাণিগুলো। এসবের তদারকির জন্য কোন পশু চিকিৎসক নেই। ফলে ঠিকমতো টিকা ও ওষুধ পাচ্ছেনা প্রাণিগুলো। দারোয়ান নিরঞ্জয় চাকমা বাজার থেকে ওষুধ এনে চিকিৎসা দিচ্ছেন। আর প্রবেশ পথের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের দেয়ালটি বহুদিন ধরে ভেঙ্গে পড়ে রয়েছে। ভেতরের চারিদিকে আগাছায় জঙ্গলাকীর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। চিড়িয়াখানার অফিস ঘরটিও অপরিচ্ছন্ন এবং নোংরা। টেবিলের ওপরে এলোমেলোভাবে রান্নার সরঞ্জাম, পাতিল ও বালতি পড়ে রয়েছে।
চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা নিকেল চাকমা ও জ্যাকসন চাকমা বলেন, আরো নতুন প্রাণির সংযোজন প্রয়োজন। এসব প্রাণিদের পর্যাপ্ত খাবার এবং চিকিৎসা দেওয়া উচিত। চারপাশের নোংরা পরিবেশ চিড়িয়াখানাটিকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে। তদারকি ও জনবল না বাড়ালে এ দশার পরিবর্তন হবেনা। কর্তৃপক্ষ চাইলেই প্রাণ ফিরে পাবে এই চিড়িয়াখানাটি।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য সাধন মনি চাকমার ব্যক্তিগত পছন্দের মানুষ অজিত চাকমার মাধ্যমে চিড়িয়াখানার প্রাণিদের জন্য ফলমূল, সব্জিসহ অন্যান্য খাবার সরবরাহ করেন বলে জানা গেছে। এতে খাবারের জন্য বরাদ্দের অর্থের সিংহভাগই বেহাত হচ্ছে। অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘চিড়িয়াখানার ২৫টি প্রাণি ও পাশের দুইটি পুকুরের মাছের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাই। বাজারে মৌসুমি সবজির দাম চড়া, সবসময় পাওয়াও যায়না। এজন্য খাবারের কিছুটা সমস্যা হয়’। চিকিৎসার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রাণিদের প্রয়োজন হলেই কেবল চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়।
তবে চিড়িয়াখানার ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, লোকসানের কারণে প্রাণিদের বিক্রি করে সেখানে অন্য প্রকল্প নেওয়ার বিভিন্ন প্রস্তাব উঠলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি। যাতায়াতের সুবিধা না থাকায় দর্শনার্থীর সংখ্যাও কম। ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ভয়ে নতুন করে কোন প্রাণি কেনা হচ্ছেনা।
রতœজীবন চাকমা বলেন, ‘নিরঞ্জয়ের সাথে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিয়েছি। সাবেক চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমার সময়ে আমি খাবার কিনতাম। তখন প্রতিমাসে দেওয়া ১২ হাজার টাকায় সব হতো, এখন ৫০ হাজারেও হচ্ছে না। সাধন মনি চাকমার বিশেষ মানুষ অজিত চাকমা আমাদের কাজে কর্মে অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন। তাই চিড়িয়াখানার বেহাল অবস্থা।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মনতোষ চাকমা বলেন, ২০০২ সালে ড. মানিক লাল দেওয়ান চেয়ারম্যান থাকাকালে মিনি চিড়িয়াখানাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। চিড়িয়াখানার জীবজন্তু ও চিড়িয়াখানা সংলগ্ন মাছের পুকুরের জন্য প্রতিমাসে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তিনি জানান, প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মচারী রতœজীবন চাকমাকে প্রেষণে চিড়িয়াখানায় ন্যস্ত করা হয়েছে। নৈশ প্রহরী গুল মনি চাকমা ও দারোয়ান নিরঞ্জয় চাকমা আছেন মাস্টাররোলে। অন্যজন মৎস্য খামারের দায়িত্বে আছেন।