দক্ষ হয়ে জীবন গড়ার প্রত্যয়ে পালিত হল সাক্ষরতা দিবস

লিটন দাশ গুপ্ত

17

গত ৮ সেপ্টেম্বর শনিবার পালিত হল এই বছরের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এবছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল- ‘সাক্ষরতা অর্জন করি, দক্ষ হয়ে জীবন গড়ি’। আমরা জানি এই দিবসের উদ্দেশ্য হচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তি, জাতি, গোষ্ঠী, সমাজ তথা পৃথিবীর প্রতিটি দেশের নাগরিকের মধ্যে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য তুলে ধরা। স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম এই দিবস পালিত হয় ১৯৭২ সালের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে। আর সর্বশেষ অর্থাৎ ২০১৮ সালের সাক্ষরতা দিবস পালিত হল তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে। সাধারণত অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন হওয়াকে সাক্ষরতা বলা হয় । কিন্তু বর্তমান সময়ে কেবল অক্ষর জ্ঞান থাকলেই সাক্ষর বলা যাবেনা। আরো বেশী কিছু জানা প্রয়োজন। কারণ একজন অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বুঝবে, সমাজে বেকার সমস্যা সমাধানে নিজে সচেষ্ট হবে, অন্যকেও বেকারত্ব থেকে মুক্তির দেবার চিন্তা করবে। অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, বন্ধে সক্রিয় হবে। কোন একটি বিষয় দেখে পড়তে পারবে, পড়ে অনুধাবন করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। একজন সাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি টিপসইয়ের পরিবর্তে নিজে স্বাক্ষর করে ক্রয়-বিক্রয়, ব্যাংক-ব্যালেন্স হিসাব নিকাশসহ যাবতীয় দৈনন্দীন কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারবে। চিঠি পত্র পত্রিকা ইত্যাদি পড়ে বুঝবে এবং লিখে অন্যের কাছে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারবে। গণনার দক্ষতা অর্জন করতে পারবে এবং দৈনন্দীন জীবনে নিজকে এবং নিজ পরিবারকে পরিচালনার দক্ষতা অর্জন করতে পারবে।
শুধু তাই নয়, মাতৃভাষায় যে কোন তথ্য বা দলিলপত্র, পড়তে পারবে এবং পড়ে বুঝতে পারবে, দৈনন্দীন জীবন পরিচালনার জন্যে ও হিসাব নিকাশের দক্ষতা অর্জন ও প্রয়োগ করতে পারবে। এই থেকে বলা যায়, দৈনন্দীন জীবন ধারনের জন্যে ও পরিবেশে অভিযোজিত হবার জন্যে ন্যূনতম মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিই হচ্ছে সাক্ষরসম্পন্ন ব্যক্তি। সাক্ষরতা প্রত্যেকটি দেশের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাক্ষরতার সাথে শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতি অর্থনীতি সমাজ দেশ জড়িত। আবার সাক্ষরতার অর্জনের জন্য যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা প্রথমে আসে তা হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। আর এই প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের প্রথম দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণি সাক্ষরতার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও আনুষ্ঠানিক অনানুষ্ঠানিক আর উপানুষ্ঠানিক এই তিন উপায়ে সাক্ষরতা অর্জিত হয়।
অর্থনৈতিক সমৃিদ্ধর অন্যতম শর্ত হচ্ছে সাক্ষরতা। যে সকল দেশ যত বেশী সাক্ষরতা অর্জন করতে পেরেছে, সেই সকল দেশ তত বেশী অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বর্তমান দেশে সাক্ষরতার হার ৭২.৯। এই হার আরো বাড়াতে বর্তমান সরকার বহুমুখী কর্মসূচী গ্রহন ও বাস্তবায়নের করে চলেছেন। যেমন-বিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের বৃত্তি, উপবৃত্তি, প্রতিবন্ধী ভাতা, বিনা মূল্যে বই বিতরণ ইত্যাদি। এই সবের কারনে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মধ্যহ্ন খাবার চালু করা হয়েছে, যার প্রেক্ষাপটে পুরো সময় ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
উপবৃত্তির বদৌলতে বিদ্যালয়ে ঝরে পড়া হার কমে গেছে। সরকার শিশুদের বহু কল্যাণমুখী পদক্ষেপের কারণে বিপুল সংখ্যক শিশুকে বিদ্যালয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সাক্ষরতা বৃদ্ধির ফলে বাল্য বিবাহ উল্লেখ্যযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য স্কুল বর্হিভূত প্রায় দশলক্ষ শিক্ষার্থীকে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা দেবার জন্যে বর্তমান সরকার প্রতিটি ইউনিয়নে, একই সাথে শহরের বেশ কিছু পিছিয়ে পড়া ওয়ার্ডে পাঁচ হাজার পঁচিশটি আইসিটিভিত্তিক স্থায়ী কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। সত্যি কথা হচ্ছে, সরকারের এই জাতীয় বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে সাক্ষরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের পাশাপশি প্রত্যেক শিক্ষিত মানুষ সাক্ষরতা অর্জনে সক্রিয় অংশগ্রহন করলে; প্রত্যেক ব্যক্তি, প্রত্যেক পরিবার, প্রত্যেক সমাজ, নিরক্ষর মুক্ত হতে হবে। আর এতে করে পুরো দেশের শতভাগ নাগরিক সাক্ষর হবে। ব্যক্তিগত ভাবে ভাবতে ভালো লাগে এবং ভাবি, গৌরব অনুভব করি; তাই বার বার বলতে ইচ্ছা করে এবং বলি, সত্যিই দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে চলছে। দেশে নিজস্ব অর্থায়নে বিশাল আকারের পদ্মা সেতু নির্মাণ, হাজার-হাজার মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহন, নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, আন্তঃজেলা রেল লাইন বর্ধিতকরণ, বিভিন্ন জেলা শহরে অনেক গুলো ফøাইওভার নিমার্ণ আরো কত কি! বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক, গড়আয়ু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ সব ধরণের সূচকে অনেক এগিয়ে গেছে। এই সকল উন্নয়নেও সাক্ষরতার সাক্ষ্য বহন করে।
সাক্ষরতার প্রভাবে দেশ ২০২১ সালের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সবদিক দিয়ে আরো এগিয়ে যাবে, এবং সরকার ঘোষিত রূপকল্প স্বপ্নের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে যা দৃশ্যমান। লেখা বাহুল্য হলেও লিখতে হয়, পাকিস্থানে টিভি টকশো, বুদ্ধিজীবি ও সুশীল সমাজ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বক্তৃতায় নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন পরিকল্পনা ও রূপরেখা অনুকরণ ও অনুসরণ করতে বারে বারে তাগিদ দেয়া হচ্ছে, যা আমাদের জন্যে গৌরবের।