থমথমে পাঠানটুলী

85

চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর থেকে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে পাঠানটুলী এলাকায়। পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করায় উত্তেজনা প্রশমিত হলেও চাপা ক্ষোভ আছে এখনও। আতঙ্ক না কাটায় এলাকার অধিকাংশ দোকানপাটও বন্ধ রয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। প্রহরা বসানো হয়েছে পুরো এলাকায়।
এদিকে নিহত বাবুলের মেয়ে মিথিলা আক্ষেপ করে বলেছেন, মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি আমার বাবার।
গত মঙ্গলবার রাতে পাঠানটুলি এলাকার মগপুকুর পাড় এলাকায় চসিক নির্বাচনে সরকার দলীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী ও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুর এবং সাবেক কাউন্সিল ও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী মো. আবদুল কাদেরের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন দুইজন। গুলিবিদ্ধদের মধ্যে নজরুল ইসলাম বাহাদুরের সমর্থক আজগর আলী বাবুল (৫৫) হাসপাতালে মারা যান। বাবুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনার ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ মাঠে নামলে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এলাকার প্রায় দোকানপাট বন্ধ এবং বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা মামুনুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার রাতে সংঘর্ষের ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অজানা আতঙ্কের মধ্যে আছি আমরা। এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হলেও শঙ্কা কাটেনি এখনও। কখন কি হয়, সে ভয়ে ঘর থেকে তেমন বের হচ্ছি না।
এদিকে মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ২৬ জনকে আটক করে। গতকাল বুধবার ভোরে ‘বিদ্রোহী’ কাউন্সিলর প্রার্থী মো. আবদুল কাদেরকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের হয় ডবলমুরিং থানায়। নিহত আজগর আলী বাবুলের ছেলে সেজান মাহমুদ সেতু বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় মোট ১৩ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করে আরও ৩০-৪০ জনকে অজ্ঞাত দেখানো হয়েছে।
আসামিরা হলেন, মো. আবদুল কাদের (৫০), হেলাল উদ্দিন প্রকাশ হেলাল (৪০), ওবাইদুল করিম মিন্টু (৪৫), আবদুল ওয়াদুদ রিপন (৪২), আবদুর রহিম রাজু (৪৫), আসাদ রায়হান (৩৫), আলাউদ্দিন আলো (৩৫), ইমরান হোসেন ডলার (২৪), দিদার উল্লাহ (৪৮), সালাউদ্দিন সরকার (৪৫), দেলোয়ার রশিদ (৪২), মো. আলমগীর (৪৫) ও আবদুন নবী (৪৭)।
ডবলমুরিং থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাসুদ রানা জানান, নিহত আজগর আলী বাবুলের ছেলে সেজান মাহমুদ সেতু বাদি হয়ে ১৩ জনকে এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাত ৩০-৪০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করবে। ঘটনার পর থেকে আজগর আলী বাবুলের পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
এদিকে নিহত আজগর আলী বাবুলের মেয়ে তাবাচ্ছুম নাহার মিথিলা বলেন, এলাকার সম্মানি এবং মান্যগণ্য ব্যক্তির মধ্যে আমার বাবা ছিলেন প্রথমে। সবাই উনার কর্মকান্ডকে সম্মান করে মহল্লার সর্দার করেন। গত কয়েকদিন আগে উনি আমাকে বলেছিলেন, কিছুদিনের মধ্যে আমি মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য হতে যাচ্ছি। তোমরা আমার জন্য দোয়া করিও। কিন্তু উনার স্বপ্নটা পূরণ হল না। রাজনীতির প্রতিহিংসা আমার বাবাকে আমাদের মাঝ থেকে কেড়ে নিয়েছে। সৃষ্টিকর্তা ওইসব ঘাতকদের বিচার করুক।
গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় মোগলটুলি এলাকার আজগর আলী বাবুলের মেয়ে এবং বোন জামাই মো. আব্দুল আজাদের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিথিলা আরও বলেন, আমার বাবাকে এর আগেও বেশ কয়েকবার ফেসবুকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়েছিল ওরা। কিন্তু হুমকি যে হত্যায় রূপ নিবে, তা কখনো ভাবতে পারিনি। আমাদের এ সুন্দর সংসারের প্রদীপ তারা নিভিয়ে দিয়েছে। আমি হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
নিহত বাবুলের বোন জামাই আব্দুল আজাদ বলেন, বাবুল নগরীর বাইশ মহল্লা সর্দার কমিটির সদস্য এবং আওয়ামী লীগের ত্যাগী একজন কর্মী। যেটা ইতিমধ্যে প্রমাণ হয়েছে। বাবুলের ফিশারি ঘাটে দুইটি মাছের আড়ত থাকা সত্বেও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীকে জয়ী করার জন্য ব্যবসা স্থগিত রেখে মাঠে নেমে পড়েছেন, যেটি নজিরবিহীন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক মো. আজগর আলী বাবুল। বড় ছেলে সেজান মাহমুদ সেতু (২২), মেঝো ছেলে ফরহাদ মাহমুদ শুভ (২০) এবং ছোট মেয়ে তাবাচ্ছুম নাহার মিথিলা (১৯)। বাবুলের স্ত্রী কামরুন্নাহার একজন গৃহিণী।
এদিকে নিহত বাবুলের বাড়ির সামনে ও পুরো মোগলটুলি এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। পরিস্থিতি সামাল এবং পুনরায় সংঘাত এড়াতে টহলে রয়েছেন বলে জানালেন এক পুলিশ কর্মকর্তা।
স্থানীয় দোকানদার মো. এরশাদ জানান, উনার মৃত্যুর পর পুরো এলাকাতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এখন আমরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি, যদিও পুলিশের টহলদারি রয়েছে।