ত্রিভূজ অভিমান

আলাউদ্দিন কবির

55

বাবার অকারণ সন্দেহ পছন্দ হলো না সাফির। বন্ধুর প্রতি বাবার এমন অন্ধবিশ্বাস দেখে তার অবাক লাগে। তাই সে কিছুটা রাগ আর কিছুটা বিরক্তি ভরে বলে, ‘বাবা, আর কয়বার বললে তুমি বিশ্বাস করবে যে, তোমার সরকারি কর্মকর্তা বন্ধু তোমার বন্ধুত্বের এতোটুকু দাম দেয়নি?’
দাম দেয়নি মানলাম, পরিচয় পাওয়ার পর সে তোকে কী বললো, তা তো একবার বলবি।’
বাবা, ওসব বললে তুমি কষ্ট পাবে। তার চেয়ে না বলাই ভালো।
না তোকে বলতে ইহবে।
ঠিকাছে এতোই যখন শুনতে চাও, তাহলে শোনো। পরিচয় পাওয়ার পর ভদ্রলোক বললেন, ও, তুমি তাহলে সাইফুলের ছেলে। হ্যাঁ, তোমার বাবা ও আমি একই ক্লাসে পড়তাম। মেট্রিকের পর তো সে আর পড়লো না। পৈতৃক কাপড়ের ব্যবসাতেই মন দিলো। তাকে কতো করে বললাম, বড়ো হতে হলে পড়ালেখার বিকল্প নাই। কোনো মতে ডিগ্রিটা পাশ দিতে পারলেই তো সরকারি একটা চাকরি মোটামুটি নিশ্চিত। আমাদের সময়ে তো আর অতোবেশি পড়ালেখা-জানা লোক ছিলো না! যাক, ওসব পুরনো কথা। এখন মূল কথায় আসা যাক। আমার সহপাঠীর ছেলে হিসেবে তোমাকে আমি বাড়ি যাওয়ার গাড়ি ভাড়া দিতে পারি। দুপুরের লাঞ্চটা এক সঙ্গে করতে পারি। তার মানে তো এই নয় যে, প্রায় বিশ লাখ টাকা আয়ের চাকরিটা তোমাকে বিনে পয়সায় দিয়ে দেবো!
তারপর?
তারপর কী আর, আমি তোমার সরকারী কর্মকর্তা বন্ধুর অফিস থেকে বেরিয়ে আসি।
ছেলের চাকরির ব্যাপারে বেশ আশাবাদী ছিলেন সাইফুল কবির। বন্ধুর প্রতিতার এক ধরনের আস্থা ও আশা ছিলো। ছেলের মুখে বড়ো কর্মকর্তা বন্ধুর বিশ্রি কান্ডের কথা শুনে তার সে আস্থায় ফাটল ধরলো। আশার গুড়ে বালি পড়লো! ছেলেকে সান্ত¡না দেয়ার ছলে বলেন। ‘যাক, তুই তাহলে আরেকটা চাকরির খোঁজ নে। ও হ্যাঁ, পুরনো আলমারিটার নিচের ডয়ারে কিছু চিঠি রাখা আছে, সময় করে ওসব পড়ে দেখিস। শাহাদাতের প্রতি আমার অন্ধবিশ্বাসের কারণ কিছুটা হলেও বুঝতে পারবি।’ বাবার কথায় হ্যাঁ-না কিচ্ছুনা বলে নিজের রুমে চলে যায় সাফি।
কয়েকদিন পর সাফি পুরনো আলমারিটার কাছে যায়। নিচের ডয়ার খুলতেই দেখে, দশটা মতন পুরনো চিঠি। কয়েকটা চিঠি পড়ে দেখে সে। প্রেরকের নাম, শাহাদাত হোসাইন। নামটা পড়তেই মনে পড়ে গেলো তার বাবার বন্ধুর কথা। প্রাপকের জায়গায় তার বাবা সাইফুল কবির এর নাম লেখা।
প্রথম চিঠিটায় প্রেরক লিখছে, ‘বন্ধু, টাকার অভাবে আমি কলেজে ভর্তি হতে পারছিনা। বাড়ির যে অবস্থা টাকা চাইতেও লজ্জা লাগছে। ভর্তির জন্যে জরুরি ভিত্তিতে ৫০০ টাকা দরকার। তুই ছাড়া আর কাউকে বিষয়টা জানাতে ভরসা পাইনি, তাই জানালাম…’
আরেকটায় লেখা, ‘বন্ধু, অবশেষে কলেজে ভর্তি হলাম। কিন্তু এই ঢাকাশহরে কিচ্ছু ভালো লাগছে না। হোস্টেলের খাবারও খাওয়ার মতো না। একটা লজিং যতো দিন না ব্যবস্থা হচ্ছে, সহপাঠীদের সঙ্গে মেসে উঠতে পারলে সুবিধে হতো। মেসে জনপ্রতি খরচ মাসে ৬০০ টাকা। সাধ আছে সাধ্য নাই অবস্থা আমার! তুই চাইলে আমি মেসে যোগ দিতে পারি। আশাকরি, বিষয়টা বিবেচনায় রাখবি…’
সাফি ইচ্ছে করেই আর কোনো চিঠি পড়লো না। দুটি পড়েই সে বুঝতে পারে, তার বাবার বন্ধু শাহাদাত সাহেব একদিন কেমন অসহায় ছিলেন। বুঝতে পারলো, বন্ধুর প্রতি তার বাবা কেমন যতœবান, উদার ও হাত খোলা ছিলেন। চিঠিগুলো আবার সে আগের জায়গায় রেখে দেয়।
দুপুরে দোকানে ব্যস্ত থাকার কারণে বাড়িতে আসা হয়না সাফির বাবার। তবে রাতের খাবার ঘরের সবাইকে একসাথে খেতে হবে, এটাই তাদের অঘোষিত পারিবারিক নিয়ম।
সেদিন রাতে ডিনারের সময় সাফি কাচুমাচু হয়ে বলে,
‘বাবা আমি বুঝতে পেরেছি।’
কী বুঝেছিস ?
বাবা, আমি স্যরি!
ঠিকাছে, তোকে স্যরি বলতে হবে না। স্যরি যার বলার কথা, সেই তিনি যখন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে আকাশে উড়ছেন, উড়তে দে!
বাপ-বেটার এসব কথা গিন্নি নার্গিস বেগমের ভালো লাগলো না। তিনি বললেন, ‘আরে, বাপ-বেটা মিলে কী শুরু করেছো! চাকরি হয়নি, চাকরি হবে। এখানে নয় ওখানে হবে। কখন কাকে কয় টাকার সাহায্য করেছেন, ওসব পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটার কী দরকার।’ গিন্নির কথার উত্তর দিতে সাইফুল সাহেবের মন্তব্য, ‘তুমি তো ওর পক্ষ নেবেই, সাবেক পছন্দ বলে কথা!’
তুমি ওসব কথা না তুললেই খুশি হবো, সাফির বাবা।
বলবো না মানে, একশবার বলবো। আর তোমার খুশি-অখুশি নিয়ে ভাবার সময় কই আমার। তোমাকে খুশি করতে গিয়েই তো শাহাদাত আমাকে ভুল বুঝলো। মনে করলো…’
বাবা-মায়ের আচমকা বাকযুদ্ধ থামাতে চেষ্টা করে সাফি, ‘আমার চাকরি হয়নি ভালো কথা। তোমরা কেনো ঝগড়া করছো ? মা, তুমি থামো তো।’
আগে তোর বাবাকে থামতে বল্।
আমি থামবো মানে, আমি কিচ্ছু বললাম কই যে থামতে যাবো ?
হাল ছেড়ে দিয়ে খাবার টেবিল থেকে উঠতে-উঠতে সাফি বলে, ‘ঠিকাছে বাবা, তোমরা সারারাত ঝগড়া করো, আমি ঘুমুতে যাই !’
সাফি চলে গেলে আবার শুরু হয় স্বামী-স্ত্রীর মাঝারি মাত্রার বাকযুদ্ধ। নার্গিস বেগম অভিমানী গলায় বলেন, ‘নিজের ছেলের সামনে তার মা সম্পর্কে তুমি ওসব কথা না বললেও পারতে!’
কী সব কথা বললাম যেনো আমি!
ওই যে বললে, শাহাদাত আমার পুরনো পছন্দ…
আমি কি মিথ্যে বলেছি ?
সত্য-মিথ্যার বিষয় না এটা। এটা সন্তানের সামনে মায়ের আত্মসম্মান রক্ষার বিষয়!
আমার বন্ধুর বেকারত্বের অজুহাতে তাকে বাদ দিয়ে তোমার ব্যবসায়ী বাবা মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিয়ে কী সত্য কাজটাই না করে গেছেন!
আমার মৃত বাবাকে নিয়ে আর একটা কথাও বলবে না সাফির বাবা।
তিনি মৃত হবেন কেনো, তিনি তো আমাদের ঝগড়ায় চিরঞ্জীব!
সব দোষ যে শ্বশুরের ওপর চাপাচ্ছো, বিয়ের সময় কবুল কি আমার বাবা বলেছিলো, না তুমি?
আরে, তুমি দেখছি সত্যি সত্যি রেগে যাচ্ছো ? খাওয়া শেষ করো। ঘুমুতে হবে তো।
না, আর খাবো না।
তাহলে উঠো, ঝগড়া তো অনেক হলো।
বেডরুমে এসে বেশ শান্তস্বরেই সাইফুল কবির গিন্নিকে বলেন, ‘আসলে জানো কি, আমি জানতামই না যে আমাদের বিয়েটা হলে শাহাদাত আমাকে এভাবে ভুল বুঝবে। এতো দূরে সরে যাবে। আচ্ছা, তুমি কি একটা বিষয় ভেবে দেখেছো কোনোদিন?’
কী বিষয় ?
শাহাদাত এখনো কেনো বিয়ে করলো না ?
তার উত্তরও কি এই মাঝ বয়সে এসে আমাকেই দিতে হবে ?
তা বলছি না। বেচারা সত্যি-সত্যিই মনে হয় তোমার জন্যে এখনো মজনু!
বাদ দাও তো ওসব বুড়ো বয়েসি বানরের কথা। সে আমার জন্যে মজনু হলে আমার ছেলের সঙ্গে এমন আচরণ করে কীভাবে ? তোমার কথা না হয় বাদ দিলাম, তুমি তার প্রেমিকাকে বিয়ে করে দোষ করেছো, তাই তোমাকে ভুলে গেছে। আমার প্রতি কেনো এতোটুকু সম্মান দেখানোর গরজ হলো না তার ?
দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে গিন্নির কথার উত্তর না দিয়ে সাইফুল সাহেব ব্যস্ত স্বরে বলেন, ‘আরে কথায়-কথায় দেখছি বারোটা পেরিয়ে গেলো। কথা এখন থাক… দয়া করে লাইটটা নেভাও, সকালে একটু তাড়াতাড়ি দোকানে যেতে হবে। মফস্বল থেকে কয়েকজন পাইকার কাস্টমার আসার কথা আছে!’