ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর আশুরা মর্সিয়া ক্রন্দন নয়, চাই হোসাইন আদর্শের চর্চা

4

হিজরি সনের প্রথম মাস মুর্হ্রম। আজ মুর্হ্রম মাসের ১০ তারিখ তথা ইয়াউমে আশুরা। আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশত বছর পূর্বে ৬১ হিজরি মহ্্ররমের ১০ তারিখে বর্তমান ইরাকের ফুরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর আদরের সৈয়দুনা দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.) সপিরবারে শাহাদাৎ বরণ করেন। মহানবী (স.) যুগ ও সময়ের পর একশত বছরের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত চাঞ্চল্যকর মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি এটি। শুধু মুসলমান নয়, বিশ্ব বিবেক এখনও এ ট্র্যাজেডির ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। এ দিন ইমাম হোসাইন ও তাঁর পরিবারের বিরল ত্যাগের বিনিময়ে ইসলামের শ্বাসত সৌন্দর্য ফিরে আসলেও এদিনটি বিশ্ব মুসলিমের কাছে বেদনাদায়ক একটি কালো দিবস হিসেবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব সাহিত্যে বহু কবিতা, গল্প, কাব্যগাঁথা, গবেষণা বই, প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও উপন্যাস রচিত হয়েছে। বাংলার পুঁথিসাহিত্যে কারবালার মর্মান্তিক কাহিনী বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশিষ্ট সাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেন এ কাহিনী থেকে উপকরণ নিয়ে ‘বিষাদ সিন্ধু’ রচনা করেছেন।
মহানবীর (দ.) ওফাতের পর ইসলামি খিলাফতের যে ধারাবাহিকতা চলে আসছিল তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে হজরত আমিরে মোয়াবিয়ার (রা.)-এর পুত্র সত্যবিচ্যুত পাপাচার ইয়াজিদের অন্যায়ভাবে ক্ষমতারোহনের কারণেই কারবালার মর্মান্তিক কাহিনীর সূত্রপাত। মহানবী (দ.) বিদায় হজের ভাষণে তাঁর পরবর্তী উম্মতদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, কোরআন-সুন্নাহ তথা তাঁর পরিবারবর্গকে অনুসরণ করতে। ইয়াজিদ মহানবীর (দ.) নির্দেশনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মসনদের লোভে ইসলামের খেলাফতের ধারায় প্রথম পরিবারতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন। যা বর্তমানে বিশ্বের বহু রাষ্ট্রে জগদ্দল পাথরের মতো ঝেঁকে বসেছে। মদিনার গভর্ণরের আহবানে ইয়াজিদের মতো স্বৈরাচারী ও ইসলাম বিকৃতকারীর আনুগত্য গ্রহণ না করে মহানবী(দ.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন কুফাবাসীর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে কুফায় চলে যান। কিন্তু কুফাবাসী বিশ্বাসঘাতকতা ও এ অঞ্চলের গভর্ণর ইয়াজিদের প্রতিনিধি ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের পার্থিব লোভ-লালসা, উচ্ছাকাক্সক্ষা এবং সিমার বিন জাওশানের প্রতিহিংসা ও প্ররোচনার শিকার হয়ে নির্মমভাবে শহিদ হতে হয় নবী বংশের উজ্জলতম পুতপবিত্র এ তারকাকে। ইতিহাস পাঠে জানা যায়, কুফায় পৌঁছামাত্র নানা কুফাবাসী ও ওবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের নানা চালছাতুরী, কপটতা ও প্রতারণার শিকার হয়ে ইমাম হোসাইন (রা.) মদিনায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুরাত নদীর অববাহিকা কারবালার প্রান্তর বেয়ে রওনা হলে ইমাম হোসাইনে সাথে থাকা পরিবারের নারী ও শিশুসহ ৭২ জনের একটি ছোট্ট শান্তিকামী দলের বিরুদ্ধে ইয়াজিদের বিশাল স্বশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এসময় সংঘাত ও রক্তপাতে না গিয়ে ইমাম হোসাইন ইয়াজিদের প্রতিনিধির কাছে তিনটি শান্তি প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু ইয়াজিদের প্রতিনিধিত্বকারী বাহিনী সেই প্রস্তাব উপেক্ষা করে বিনা শর্তে ইয়াজিদের কাছে আত্মসমর্পন ও বায়াতের আহবান জানান। কিন্তু ইমাম হোসাইন স্বৈরচারি, একনায়কতান্ত্রিক শাসক ও ইসলাম বিকৃতকারী শোষকের কাছে মাথা নত না করে বরং ইয়াজিদের ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্ট যুদ্ধ মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নেন। সর্বশেষ অসম এ যুদ্ধে বাধ্য হয়ে ইমাম হোসাইন ও তাঁর পরিবারের শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ করতে হয়েছিল, সর্বশেষ অসুস্থ পুত্র জয়নুল আবেদীন বিন হোসাইন ও বোন জয়নাব ছাড়া বাকী ইমামসহ সকলেই নির্মমভাবে শহিদ হন। এ অসম যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাস তথা বিশ্ব ইতিহাসের একটি নির্মম হত্যাকাÐ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছে। ইমাম হোসাইন শাহাদত বরণ করেছেন তবু পাপাচার জালেম ইয়াজিদের বশ্যতা স্বীকার করেন নি। এ ঘটনা শুধু মুসলমানদের জন্য শিক্ষণীয় নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব মানবের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত। অসত্য ও অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করাই আশুরার দিনের মূল শিক্ষা। ইমাম হোসাইন ইয়াজিদের অন্যায় প্রস্তাবে রাজি হলে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতো না। বরং তিনি হয়ত পৃথিবীতে আয়েশি জীবন-যাপন করতে পারতেন। ইমাম হোসাইন (রা.) জাগতিক আরাম-আয়েশ এবং নিরাপদ জীবনযাপনের চেয়ে সত্য ও ন্যায়কে উচ্চকিত করার জন্য আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর মহান আত্মত্যাগ বিশ্বমানবের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান মহানবীর প্রতিষ্ঠিত ইসলামের মূল ¯্রােতধারাকে পুনরুজ্জীবনের জন্য ইমাম হোসাইন (রা.) এর আত্মত্যাগকে প্রতি বছর বেদনার্ত চিত্তে স্মরণ করছে। মহানবী(দ.) পরবর্তী ইসলামি সমাজ ও রাজনীতির ধারা সমুন্নত করতে ভাঁজনীতিকে উপেক্ষা করে তিনি যুগে যুগে রাজনৈতিক ভÐামির বিরুদ্ধে শানপাথরে পরিণত হয়ে রয়েছেন। ভাঁজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের পথ পরিহার করে সত্য, ন্যায়, মানবতা ও সুষ্ঠু রাজনৈতিক ধারাকে সমুন্নত রাখার প্রেরণা রয়েছে ইমাম হোসাইন (রা.) এর কারবালার আত্মত্যাগের মধ্যে। বিশ্বের মুসলমানেরা আশুরার এই দিনে মহানবী (স.) এর পরিবার তথা আহলে বাইতের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা প্রদর্শনের সাথে সাথে জীবনের তাবৎ কর্মকাÐে ইমাম হোসাইনের আদর্শকে লালন করতে পারলে সকল অন্যায় ও অবিচার দূরিভূত হয়ে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর আশুরা
মর্সিয়া ক্রন্দন নয়, চাই হোসাইন আদর্শের চর্চা

হিজরি সনের প্রথম মাস মুর্হ্রম। আজ মুর্হ্রম মাসের ১০ তারিখ তথা ইয়াউমে আশুরা। আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশত বছর পূর্বে ৬১ হিজরি মহ্্ররমের ১০ তারিখে বর্তমান ইরাকের ফুরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর আদরের সৈয়দুনা দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.) সপিরবারে শাহাদাৎ বরণ করেন। মহানবী (স.) যুগ ও সময়ের পর একশত বছরের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত চাঞ্চল্যকর মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি এটি। শুধু মুসলমান নয়, বিশ্ব বিবেক এখনও এ ট্র্যাজেডির ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। এ দিন ইমাম হোসাইন ও তাঁর পরিবারের বিরল ত্যাগের বিনিময়ে ইসলামের শ্বাসত সৌন্দর্য ফিরে আসলেও এদিনটি বিশ্ব মুসলিমের কাছে বেদনাদায়ক একটি কালো দিবস হিসেবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব সাহিত্যে বহু কবিতা, গল্প, কাব্যগাঁথা, গবেষণা বই, প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও উপন্যাস রচিত হয়েছে। বাংলার পুঁথিসাহিত্যে কারবালার মর্মান্তিক কাহিনী বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশিষ্ট সাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেন এ কাহিনী থেকে উপকরণ নিয়ে ‘বিষাদ সিন্ধু’ রচনা করেছেন।
মহানবীর (দ.) ওফাতের পর ইসলামি খিলাফতের যে ধারাবাহিকতা চলে আসছিল তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে হজরত আমিরে মোয়াবিয়ার (রা.)-এর পুত্র সত্যবিচ্যুত পাপাচার ইয়াজিদের অন্যায়ভাবে ক্ষমতারোহনের কারণেই কারবালার মর্মান্তিক কাহিনীর সূত্রপাত। মহানবী (দ.) বিদায় হজের ভাষণে তাঁর পরবর্তী উম্মতদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, কোরআন-সুন্নাহ তথা তাঁর পরিবারবর্গকে অনুসরণ করতে। ইয়াজিদ মহানবীর (দ.) নির্দেশনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মসনদের লোভে ইসলামের খেলাফতের ধারায় প্রথম পরিবারতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন। যা বর্তমানে বিশ্বের বহু রাষ্ট্রে জগদ্দল পাথরের মতো ঝেঁকে বসেছে। মদিনার গভর্ণরের আহবানে ইয়াজিদের মতো স্বৈরাচারী ও ইসলাম বিকৃতকারীর আনুগত্য গ্রহণ না করে মহানবী(দ.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন কুফাবাসীর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে কুফায় চলে যান। কিন্তু কুফাবাসী বিশ্বাসঘাতকতা ও এ অঞ্চলের গভর্ণর ইয়াজিদের প্রতিনিধি ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের পার্থিব লোভ-লালসা, উচ্ছাকাক্সক্ষা এবং সিমার বিন জাওশানের প্রতিহিংসা ও প্ররোচনার শিকার হয়ে নির্মমভাবে শহিদ হতে হয় নবী বংশের উজ্জলতম পুতপবিত্র এ তারকাকে। ইতিহাস পাঠে জানা যায়, কুফায় পৌঁছামাত্র নানা কুফাবাসী ও ওবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের নানা চালছাতুরী, কপটতা ও প্রতারণার শিকার হয়ে ইমাম হোসাইন (রা.) মদিনায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুরাত নদীর অববাহিকা কারবালার প্রান্তর বেয়ে রওনা হলে ইমাম হোসাইনে সাথে থাকা পরিবারের নারী ও শিশুসহ ৭২ জনের একটি ছোট্ট শান্তিকামী দলের বিরুদ্ধে ইয়াজিদের বিশাল স্বশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এসময় সংঘাত ও রক্তপাতে না গিয়ে ইমাম হোসাইন ইয়াজিদের প্রতিনিধির কাছে তিনটি শান্তি প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু ইয়াজিদের প্রতিনিধিত্বকারী বাহিনী সেই প্রস্তাব উপেক্ষা করে বিনা শর্তে ইয়াজিদের কাছে আত্মসমর্পন ও বায়াতের আহবান জানান। কিন্তু ইমাম হোসাইন স্বৈরচারি, একনায়কতান্ত্রিক শাসক ও ইসলাম বিকৃতকারী শোষকের কাছে মাথা নত না করে বরং ইয়াজিদের ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্ট যুদ্ধ মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নেন। সর্বশেষ অসম এ যুদ্ধে বাধ্য হয়ে ইমাম হোসাইন ও তাঁর পরিবারের শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ করতে হয়েছিল, সর্বশেষ অসুস্থ পুত্র জয়নুল আবেদীন বিন হোসাইন ও বোন জয়নাব ছাড়া বাকী ইমামসহ সকলেই নির্মমভাবে শহিদ হন। এ অসম যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাস তথা বিশ্ব ইতিহাসের একটি নির্মম হত্যাকাÐ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছে। ইমাম হোসাইন শাহাদত বরণ করেছেন তবু পাপাচার জালেম ইয়াজিদের বশ্যতা স্বীকার করেন নি। এ ঘটনা শুধু মুসলমানদের জন্য শিক্ষণীয় নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব মানবের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত। অসত্য ও অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করাই আশুরার দিনের মূল শিক্ষা। ইমাম হোসাইন ইয়াজিদের অন্যায় প্রস্তাবে রাজি হলে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতো না। বরং তিনি হয়ত পৃথিবীতে আয়েশি জীবন-যাপন করতে পারতেন। ইমাম হোসাইন (রা.) জাগতিক আরাম-আয়েশ এবং নিরাপদ জীবনযাপনের চেয়ে সত্য ও ন্যায়কে উচ্চকিত করার জন্য আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর মহান আত্মত্যাগ বিশ্বমানবের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান মহানবীর প্রতিষ্ঠিত ইসলামের মূল ¯্রােতধারাকে পুনরুজ্জীবনের জন্য ইমাম হোসাইন (রা.) এর আত্মত্যাগকে প্রতি বছর বেদনার্ত চিত্তে স্মরণ করছে। মহানবী(দ.) পরবর্তী ইসলামি সমাজ ও রাজনীতির ধারা সমুন্নত করতে ভাঁজনীতিকে উপেক্ষা করে তিনি যুগে যুগে রাজনৈতিক ভÐামির বিরুদ্ধে শানপাথরে পরিণত হয়ে রয়েছেন। ভাঁজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের পথ পরিহার করে সত্য, ন্যায়, মানবতা ও সুষ্ঠু রাজনৈতিক ধারাকে সমুন্নত রাখার প্রেরণা রয়েছে ইমাম হোসাইন (রা.) এর কারবালার আত্মত্যাগের মধ্যে। বিশ্বের মুসলমানেরা আশুরার এই দিনে মহানবী (স.) এর পরিবার তথা আহলে বাইতের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা প্রদর্শনের সাথে সাথে জীবনের তাবৎ কর্মকাÐে ইমাম হোসাইনের আদর্শকে লালন করতে পারলে সকল অন্যায় ও অবিচার দূরিভূত হয়ে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।