তিস্তার পানি বণ্টনের চুক্তি নির্বাচনের আগে হচ্ছে কি

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী

35

গত মে মাসে (২০১৮) ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ দিল্লীতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন বাংলাদেশের সাথে তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের ব্যাপারে পশ্চিম বঙ্গ সরকারর সম্মতি ছাড়া কোন চুক্তি ভারত সরকারের পক্ষে সই করা সম্ভব নয়। যেহেতু পশ্চিম বঙ্গও তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য দাবিদার সে কারণে পশ্চিম বঙ্গকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ এবং ভারত সরকারের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের দ্বারা এই সমস্যার সামাধান সম্ভব নয়। শ্রীমতি সুষমা স্বরাজ বলেছেন সে লক্ষ্যে তাঁরা পশ্চিমবঙ্গ সরকার, বিশেষ করে সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সাথে এই ব্যাপারে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের আগেই তিস্তা পানি সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সামাধানের প্রতিশ্রæতির পর প্রায় দু’বৎসরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, এই দীর্ঘ সময়ে ভারত সরকার কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন নাই। অথচ তিস্তা নদীর পানির একটি ন্যায্য অংশ পাওয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি অধিকার। আলোচনার নামে কত বৎসর একটি দেশকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা যায় তারও একটি গ্রহণযোগ্য সীমা থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব অঞ্চলের জন্য তিস্তা নদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সিকিম রাজ্যে এর উৎপত্তি। এই পর্যন্ত সিকিম তিস্তা নদীর উজান অঞ্চলে পাঁচটি বাধ নির্মাণ করেছে এবং আরও ৩১টি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তিস্তা নদী সরাসরি সিকিম থেকেই পশ্চিম বঙ্গ দিয়েই প্রবাহিত হয়। ভারত ইতিমধ্যেই গাজাল ডোবায় একটি বাঁধ নির্মাণ করেছে এবং তিস্তা থেকে ৮৫ ভাগ পানি সংযোগ খালের মাধ্যমে মহামন্দা নদীতে নিয়ে যাচ্ছে। ভারত তিস্তার পানি দিয়ে প্রায় ৯ লক্ষ হেক্টর জমিন চাষ করার পরিকল্পনা নিয়েছে এবং এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ক্রমাগত তিস্তার পানি মহানন্দা নদীতে নিয়ে যাচ্ছে। তিস্তা নিয়ে ভারতের এই পরিকল্পনা বাংলাদেশের ২ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ যাঁরা তিস্তা নদীর অববাহিকায় বাস করে তারা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের ৮০ লক্ষ লোক তিস্তার অববাহিকায় বাস করে, আর সিকিমের মাত্র ৫ লক্ষ অধিবাসী।
পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পানি বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রৌদ্রের নেতৃত্বে একটি কমিটি করেছিলেন। সে বিষেশজ্ঞ কমিটি যে রিপোর্ট দিয়েছেন তা বাংলাদেশের পক্ষে যাওয়ায় মমতা সে রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রচার করার ব্যাপারে উৎসাহিত হন নাই।
২০১১ সালে ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং এর বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়েছিল এবং চুক্তির খসড়াও বাংলাদেশ ও ভারতের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে তৈয়ার করা হয়েছিল। তখন বিশ^স্ত সূত্রে জানা গিয়েছিল, তিস্তার পানির ৪২.৩ শতাংশ ভারত এবং বাংলাদেশ ৩৭.৫ শতাংশ পাবে এবং বাকী ২০ শতাংশ নদীর নাব্যতার জন্য রাখা হবে। তখন পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তীব্র বাঁধার মুখে মনমোহন সিং চুক্তি স্বাক্ষরে ব্যর্থ হন। এর পর বহু বৎসর পেরিয়ে গেল, কিন্তু তিস্তার চুক্তির কোন অগ্রগতি হয় নাই। পরে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ সরকারকে আশ^স্ত করেছিলেন যে বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগেই তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন করবেন। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপরোল্লিখিত বক্তব্যের পর তিস্তা চুক্তির বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।
বর্তমান ভারতের ক্ষমতাসীন দল বি.জে.পি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কট্টর সমালোচক হলেন মমতা ব্যানার্জী, এমনকি আগামী নির্বাচনে মমতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জোর প্রয়াস চালাচ্ছেন বলেও ভারতীয় গণমাধ্যমে অহরহ খবর বের হচ্ছে। কাজেই মমতাকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের সাথে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি করা নরেন্দ্র মোদির জন্য ভারতের আসন্ন নির্বাচনের আগে কিছুতেই সম্ভব নহে। কিন্তু ভারতের ক্ষমতাসীন এবং বিরোধীদল উভয়ের নিশ্চয় জানা আছে যে তিস্তার পানি পাওয়ার অধিকার বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত অধিকার, ইহাতে অনুকম্পার কোন ব্যাপার নেই। বরং বৎসরে পর বৎসর ধরে যে তিস্তা এবং অন্যান্য নদীর পানি থেকে বাংলাদেশকে কূটকৌশলে বঞ্চিত করা হচ্ছে তা ভারতের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নৈতিকতার অভাবই বলতে হবে। ইহা এক প্রকার রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রাহাজানি। মমতা ব্যানার্জির তিস্তার ব্যাপারে বিভিন্ন বিবৃতি এবং আলোচনায় বুঝা যায়, তিনি তিস্তার এক বিন্দু পানি দেওয়ার পক্ষে নয়। ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্র প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায় ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মমতা তিস্তা নদীর পরিবর্তে পশ্চিম বঙ্গের ‘তুরশা’ নামে পরিচিত নদী থেকে বাংলাদেশকে পানি দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। মমতার এই প্রস্তাব শুধু অগ্রহণযোগ্য নয় বরং আন্তর্জাতিক আইনেরও অবমাননা। এই প্রস্তাবে বাংলাদেশের প্রতি তুচ্ছ তাচ্ছিল্যই প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে তুরশা নদীর উৎপত্তিস্থান হল ভুটান। কাজেই তুরশা থেকে পানি পেতে হলে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির প্রয়োজন হবে। অর্থ্যাৎ বাংলাদেশ, ভারত এবং ভুটানের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির প্রয়োজন হবে।
আরও জানা যায়, মনু নদীর উজানের দিকে ত্রিপুরায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে যাতে বাংলাদেশের হবিগঞ্জ পানির অভাবে শুকিয়ে যাবে। ১৯৭২ ইংরেজিতে বাংলাদেশ এবং ভারতের সমন্বয়ে যে নদী কমিশন গঠিত হয়েছিল সে কমিশনের উদ্যোগে উক্ত বাঁধ নির্মাণের দ্বারা বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের এবং এই সমস্যা সামাধানের উপায় বের করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের মাধ্যমে পশ্চিম ভারত থেকে মালামাল উত্তর ভারতে পরিবহনের সকল ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের মালামাল ভারত হয়ে ভুটান এবং নেপাল যাওয়ার যে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার কথা তা এখনও বাস্তবায়িত হয় নাই। এই ব্যাপারে ভারতের দীর্ঘসূত্রিতা বাংলাদেশে ভারত সম্পর্কে অনীহা সৃষ্টি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত থেকে ৫৪ টি নদী বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে কিন্তু একমাত্র ১৯৯৬ সালে গঙ্গা নদীর ৩০ বৎসরের জন্য পানি বণ্টনের চুক্তি ছাড়া আর কোন নদীর ব্যাপারে কোন চুক্তি করা সম্ভব হয় নাই। পাকিস্তানের নদীগুলিরও উৎপত্তিস্থল একই এবং ভারতের উপর দিয়ে প্রবাহিত। অথচ পানি সমস্যা নিয়ে ভারতের সাথে পাকিস্তানের কোন সমস্যায় নেই। ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে করাচীতে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে পানি সমস্যার স্থায়ী সামাধান হয়েছে। এই চুক্তি সই করেছিলেন ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং বিশ^ ব্যাংকের তদানীন্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট। এই চুক্তি অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলীয় তিনটি নদীর পানি এককভাবে (রাবি, বিয়াস এবং সুটলেজ নদী) ভারত ব্যবহার করবে। আর পশ্চিম অঞ্চলীয় তিনটি নদী (সিন্ধু, ঝেলাম এবং চেনাব) নদীর পানি এককভাবে পাকিস্তান ব্যবহার করবে। এই তিন নদীর পানি সংরক্ষণ করার জন্য যে কর্ম পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল তাতে বিশেষজ্ঞরা ১০৭০ মিলিয়ন ইউএস ডলার বাজেট করেছিলেন তাতে ৮৭০ মিলিয়ন ডলার পাকিস্তানের অংশেই খরচ করা হয়েছিল এবং সম্পূর্ণ টাকা তখন বিশ্বব্যাংকেই যোগান দিয়েছিল এবং এ ব্যাপরে ভারতীয় প্রধানন্ত্রীর জওহারলাল নেহেরুও প্রশংসনীয় ভূমিকা ছিল। পাকিস্তানের পানি সমস্যা সামাধানের সমস্ত কর্মযজ্ঞ সফলতার সহিত সম্পন্ন হয়ে যায়। ব্যাপারে নেহেরুর সম্পর্কে পাকিস্তানের তদানীন্তন স্বৈর-শাসক আইয়ুব খাঁন যা বলেছিলেন তার একটি উদ্ধৃতি দেওয়ার প্রয়োজন। তিনি তাঁর লিখিত বই, “Friends Not Masters” এ লিখেছিলেন- I also must say that in the final stage of negotiation, Mr. Nehru’s Personal intervention helped to remove certain differences that arisen over arrangement during transitional period. অর্থাৎ ‘আমাকে বলতে হবে আলোচনার শেষ প্রান্তে নেহেরুর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের ফলে আমাদের মধ্যে বহু মতপার্থক্যের অবসান হয়েছে’।

লেখক : কলামিস্ট