তাহাদের কথা

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

212

চট্টগ্রামের কিছু কিছু রাজনৈতিক কর্মীর জন্য আমার দুঃখ হয়। কর্মী বললাম বটে, কিন্তু তাঁদেরকে রাজনৈতিক নেতা বলাই সঙ্গত। তাঁরা খুবই ত্যাগী, পরিশ্রমী, সৎ, নিবেদিতপ্রাণ নেতা।


যাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি এই লেখাটায় হাত দিয়েছি, তাঁরা হচ্ছেন-বোয়ালখালীর মোছলেম উদ্দিন আহমদ (দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি), হাটহাজারীর এম.এ. সালাম (উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান), শহরের খোরশেদ আলম সুজন (মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি), মিরসরাইর গিয়াস উদ্দিন (সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান), ফটিকছড়ির পেয়ারুল ইসলাম (সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান), সাতকানিয়ার মাইনুদ্দিন হাসান চৌধুরী (কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি) ও মওলানা-খ্যাত আমিনুল ইসলাম;
এরা এমনিতে পার্টিতে যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে অবস্থান করেন; কেউ কেউ বর্তমানে অফিসিয়ালি নেতৃত্বের আসনে না থাকলেও তাঁরা যে এক সময় নেতৃত্বপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, কেই বা সেটা অস্বীকার করতে পারেন। তাঁদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে যে নেতৃত্বের উপস্থিতি পরিদৃষ্ট হয়, সেটাই তাঁদেরকে সর্বত্র সম্মান ও সমীহ আদায় করে নিতে সাহায্য করে।
কিন্তু পার্লামেন্টের মেম্বার হওয়াই যদি রাজনীতির মোক্ষ হয়, তাহলে তাদের জীবনটা ষোল আনাই মিছে বলতে হয়। কারণ এভাবে চলতে থাকলে তাঁরা কোনদিন এমপি হতে পারবেন না। এমপি হওয়ার জন্য যেটা দরকার মনোনয়ন, যার শিকে কোনদিন তাঁদের ভাগ্যে ছিঁড়বে না। ভোট যতবারই আসে তাঁরা তাঁদের দলের কাছে মনোনয়ন চান কিন্তু তাঁরা কখনো মনোনয়ন পান না। কারণ নানা সমীকরণের ফাঁদে পড়ে তাঁদের মনোনয়ন ঝুলে যায়। শেষ মুহূর্তে তাদের বাড়া ভাতে ছাই দিতে উদয় হন কোন না কোন জোট-কোটার প্রার্থী।
যতদিন মহাজোট প্রয়োজন হবে, ততদিন দলের বৃহত্তর স্বার্থে তাদেরকে স্যাক্রিফাইস করতে হবে হয়ত। তাঁরা স্যাক্রিফাইস না করলে দল জোট গঠন করতে পারে না। জোট না হলে ক্ষমতায় যেতে পারে না। হ্যাঁ, রাজনীতি অর্থই যদি হয়, দেশ ও জনগণের কল্যাণের জন্য একটি নির্দিষ্ট আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে সুসংগঠিতভাবে কাজ করা, তাহলে আমি বলব তারা আদর্শ নেতার আসনে থাকবে।
আমার তো এই কথাটা খুব জোর গলায় বলতে ইচ্ছা করে, পঁচাত্তর পরবর্তী গত তেতাল্লিশ বছর চট্টগ্রাম ছাত্রলীগ থেকে শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ফসল কারা উৎপন্ন হয়েছে সেটা যদি আমরা হিসেব করতে যাই তাহলে আমরা পাব-মরহুম ডা. জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু, এম এ সালাম, খোরশেদ আলম সুজন, আ.জ.ম নাছির উদ্দিন (মেয়র-চসিক), মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী এবং গিয়াস উদ্দিনকে। একদা চাকসু’র জিএস জমির চৌধুরীকে আমি ধরলাম না কারণ তাঁর রাজনীতির ধারাবাহিকতা নেই। অতুলনীয় সাংগঠনিক দক্ষতা, অসাধারণ কর্মক্ষমতা, গণমুখী মানসিকতা, জনসেবা ও সার্বক্ষণিক সক্রিয়তা দিয়ে তিনি হেঁটে হেঁটে ঢুকে যাবেন এই তালিকায়। আমি শুনে তাজ্জব বনে গেছি গিয়াস না কি প্রতিদিন রুটিন করে ভোর হতে না হতেই চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে ছুটে যান। মিরসরাই থেকে অসুস্থ হয়ে কিংবা পথ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য কেউ এসেছে কি না সেটা দেখার জন্য তিনি সাত সকালে সেখানে যান। প্রত্যেকের শারীরিক অবস্থা তিনি দেখেন, সঙ্গে আগত আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ-খবর নেন এবং ডাক্তার, নার্সদের সাথে কথা বলে প্রত্যেকের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। রক্ত লাগলে রক্ত যোগাড় করে দেন এবং ওষুধ পথ্যের ব্যবস্থা করেন। কারো টাকা পয়সা না থাকলে তিনি টাকা দেন এবং লক্ষ রাখেন টাকার অভাবে যাতে কারো চিকিৎসা ব্যাহত না হয়।
আমিন, মফিজ ও আবু সুফিয়ানকেও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমিন তো এখন কেন্দ্রীয় নেতা, মফিজ দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আবু সুফিয়ান এক সময় দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের কর্ণধার ছিলো, পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে দলের একজন বিশিষ্ট নেতা হিসেবে পরিগণিত হন। সুফিয়ান অনেক দিন থেকে সাংবাদিকতায় নিয়োজিত আছেন। তিনি ‘চট্টলা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক এবং বর্তমানে রূপালী ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বেশ কয়েকবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন।
তেতাল্লিশ বছরের প্রোডাক্ট থেকে দু’জনও যদি বেছে নেয়া হয়, সেখানেও সালাম থাকবেন। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক হয়ে সালাম এমন শান্ত, ধীরস্থির ও প্রজ্ঞাপূর্ণ আচরণ করছেন যে, তাঁকে একজন ম্যাচিউরড পলিটিসিয়ানই মনে হচ্ছে।
আ.জ.ম নাছিরের মধ্যে নেতৃত্বের বিকাশ কত বেশি ঘটেছে তা বোঝানোর জন্য এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে যে, তিনি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত মেয়র।
সালাম একজন পড়ুয়া নেতা। জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত¡, রাজনীতি, সাহিত্যের আনকোরা বই বাজারে বের হলেই এই মেধাবী নেতার তা’ পড়া চাই। খোরশেদ আলম সুজনের কথা ভাবতে বসলে তিনি এখন যা’ হয়েছেন তা নয়, তিনি যা’ হতে পারতেন বা হন নি সেটাই আমার বেশি করে মনে হয়। তবু তিনি যা’ হয়েছেন সেটাও কম নয়। তিনি লেখাপড়া জানেন, লেখাপড়া করেন, সুবক্তা এবং মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতো সাহসী ও আন্দোলনমুখী নেতা। ঝুঁকি নিতে পারেন। লেখাপড়ার কথা যখন উঠলো তখন টিংকু ও সালামের কথাও বলতে হয়। টিংকু যখন স্কুলগামী কিশোর, তখন থেকে আমি তাঁকে দেখেছি। তখনই তাঁর মধ্যে প্রতিভার ঝলক আমি দেখেছি এবং সেই বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে প্রচুর জ্ঞান পিপাসা লক্ষ করেছি। সেজন্য দেখেছি খুঁজে খুঁজে বই পড়তে এবং সিনিয়রদের সঙ্গে আলোচনা করে রাজনীতিসহ অনেক বিষয়ে তার জিজ্ঞাসা, কৌতূহল নিবৃত্ত করার চেষ্টা করতে। সালাম বরাবরই গভীর অধ্যবসায়ী, মনোযোগী পাঠক। ছাত্র রাজনীতি এবং এখন আওয়ামী রাজনীতিতেও সালাম একজন মেধাবী সংগঠক, স্ফটিকস্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ।
তবে যাঁর কথা খুব বেশি করে বলা প্রয়োজন, যাঁর জন্য আমাদের দুঃখের বোঝা অনেক ভারি হয়, তিনি হচ্ছেন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেমউদ্দিন আহমদ। তিনি এখন দক্ষিণ জেলায় রাজনীতি করলেও প্রথম জীবনে অর্থাৎ ছাত্র রাজনীতির সময়ে শহরই ছিলো তাঁর রাজনীতির ক্ষেত্র। মৌলভী সৈয়দ, মহিউদ্দিন চৌধুরীকে বাদ দিলে তিনিই ছিলেন শহরের বড় ছাত্রনেতা। ইদরিস আলম, সুলতান উল কবির এবং হাজি কামাল-সিটি কলেজের ‘সুইকা’ ক্লাবের এই তিনি মহারথীর নাম আসতে পারতো, কিন্তু তাঁরা ঠিক মৌলভী সৈয়দ ও মহিউদ্দিনের মতো নেতা ছিলেন না। ৬ দফা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতার আকাল পড়লে মান্নান ভাই আর ইদরিস আলমকে শহর আওয়ামী লীগের যথাক্রমে সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে হয়। সে এক আশ্চর্য সময় ছিলো-ইদরিস আলম একই সময়ে সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের জিএসও নির্বাচিত হয়ে যান। সুলতান ভাই, কামাল ভাই ছিলেন সিটি কলেজ কেন্দ্রিক ছাত্রনেতা, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নেতা নন। তবুও তাঁরা বড় নেতাই ছিলেন। মোছলেমউদ্দিন ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী এবং চৌধুরীর মতো ছাত্রলীগের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেতা, শহরময় ছিল যার বিচরণ। মোছলেমউদ্দিন শহর ছাত্রলীগের সেক্রেটারি, সভাপতিও হন। মহিউদ্দিনের সঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভের দ্বিতীয় দিনেই গ্রেফতার হয়ে যান পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে। স্বাধীনতার পর তিনি আবার সমাজকর্মী হিসেবে আবির্ভূত হন এবং দুই দফা লালখান বাজার ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হন।
পাকিস্তানি জমানার এহেন বিখ্যাত ছাত্রনেতা মোছলেমউদ্দিন এখনো সমানে দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করে যাচ্ছেন। তাঁর রাজনীতিতে নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতাও খুঁজে পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত আছেন। বঙ্গবন্ধুর পিরিয়ড বাদ দিলেও শেখ হাসিনার জমানায়ও আওয়ামী লীগ তিন দফায় ক্ষমতা আছে। অনেকে অনেক কিছু হয়েছেন কিন্তু মোছলেম উদ্দিনের ভাগ্য এতই খারাপ যে, তিনি কিছুই পেলেন না। তাঁকে একবার পটিয়া থেকে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিলো কিন্তু স্বল্প ভোটের ব্যবধানে তাঁকে হারের স্বাদ নিতে হয়। কেন? সেটা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ?
পাকিস্তানি জমানার আরো ক’জন ছাত্রনেতা এখনো বেঁচে আছেন। তাঁদের কথা না বললে পাপ হবে। তাঁরা সবাই মোছলেউদ্দিনের সিনিয়র। তাঁরা হলেন-আবু ছালেহ, বখতেয়ার কামাল, নুরুন্নবী চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, নুরুল আলম চৌধুরী এবং গোলাম রব্বান। রউফ খালেদ আর অধ্যক্ষ শায়েস্তা খানও আছেন। কিন্তু পাকিস্তান আমলের পর তাঁরা আর রাজনীতি করেন নি। এমনকি পাকিস্তান আমলেই হয়তো তাঁরা পেশাগত কারণে রাজনীতি থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন।
যাঁদের কথা বলছিলাম, মোছলেম উদ্দিন, সালাম, গিয়াস, সুজন, মাঈনুদ্দিন, পেয়ারু, আমিন, এমনকি রাজনীতি বা সাংবাদিক আবু সুফিয়ানের কথাও ধরা যায় তাঁরা কেউ কিন্তু এমন বেয়াড়া নন যে, মনোনয়ন না পেলে বেঁকে বসবেন। বিদ্রোহ করে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করবেন এমন মানসিকতা কারো নেই। তাঁরা মাথা নিচু করে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন। এমন অনুগত কর্মী পেয়ে শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই ধন্য।
এবার নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে অতীতে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা পেশ করি। প্রথম ঘটনা ৫৪ সালের। নারায়ণগঞ্জের আউয়াল, আলমাস দুই ভাই প্রথম দিকার বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা এবং সোহরাওয়ার্দীর অনুগত। সবাই ধরে নিয়েছিলেন ৫৪ সালে ডবলমুরিং-সীতাকুÐ আসন থেকে এমএ আজিজই যুক্তফ্রন্টের মনোনয়ন পাবেন। কারণ তখনই তিনি চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে যুক্তফ্রন্ট থেকে মনোনয়ন দেয়া হলো ব্যবসায়ী মাহমুদুন্নবী চৌধুরীকে। নবী চৌধুরী সাতচল্লিশের দেশভাগের পর কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে নিজের শহরে এসে আন্দরকিল্লায় নবী স্টোর নাম দিয়ে ব্যবসায় নিয়োজিত হয়ে শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তি হয়ে উঠেন। ভোটের আগে তিনি শেরে বাংলার সঙ্গে যোগাযোগ করে কেএসপিতে যোগদান করেন এবং নমিনেশনও বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন। কিন্তু তাঁর মনোনয়নকে কেউ সহজভাবে নিলেন না, গোটা চট্টগ্রামে তাঁর প্রার্থিতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, প্রতিবাদের ঝড় বয়ে গেল। খোদ আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানীও চটেমটে লাল। কেএসপি ছিলো শেরে বাংলার দল। তিনিই গোঁ ধরে নবী চৌধুরীকে যুক্তফ্রন্টের টিকিট দেন। বাংলা বাঘ যখন গৌঁ ধরেন, তখন যুক্তফ্রন্টের অন্যান্য নেতা যেমন সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, খেলাফতে রব্বানীর মওলানা আতহার আলী-দের কিই-বা করার থাকতে পারে। কিন্তু ভাসানী গরম মানুষ, তিনি গোস্বা করে তাঁর ব্যক্তিগত প্রার্থী হিসেবে এম এ আজিজকে মনোনয়ন দিয়ে দিলেন। এই সময় গÐগোল উপস্থিত হলে সোহরাওয়ার্দী সাহেব পূর্বোক্ত আউয়াল-আলমাস ভ্রাতৃদ্বয়কে দিয়ে ঋধপঃং ভরহফরহম পড়সসরঃঃবব করে ঘটনা তদন্তে তাদেরকে পাঠালেন চট্টগ্রামে।
এমএ আজিজের অনুসারীরা স্টেশন রোডে ওয়ালেস হোটেলের (বহু আগে বিলুপ্ত এই হোটেলটি দিয়েছিলেন পাথরঘাটার বিশিষ্ট ভদ্রলোক, সেকালের বি.এ. পাস ও আওয়ামী লীগ নেতা কবিরউদ্দিন বি.এ.। কবির মিঞার পুত্ররা সবাই কৃতী-সাবেক সচিব আইয়ুব কাদেরী, মুক্তিযোদ্ধা আনিস কাদেরী, সার্জিসকোপ ক্লিনিকের এমডি হাসনাত কাদেরী এবং এক পুত্র ওয়ান ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা, তার নাম আমার মনে নেই। কবির মিঞার জামাতা আরো বিখ্যাত মানুষ-তিনি সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. শামসুল হুদা) সামনে দুই ভ্রাতার পাঞ্জাবি ছিঁড়ে দেয়। তারা ওয়ালেস হোটেলে উঠেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব আসলেও ওয়ালেস হোটেলেই উঠতেন। প্রহৃত ও অপমানিত আউয়াল-আলমাস দু’ভাই ঢাকা গিয়ে সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে আজিজ অনুসারীদের হাতে তাদের হেনস্থা হওয়ার কথা বলেন। শুনে সোহরাওয়ার্দী সাহেব উত্তেজিত হয়ে বলেনÑ ‘চট্টগ্রামের এম এ আজিজ গুÐা আছে, মাগার হামি বি কম ক্যায়া’? ইতিহাসের যারা খোঁজ খবর রাখেন, তারা জানেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ‘মীনা পেশোয়ারি’ নামে তাঁর একজন অনঅফিসিয়াল ও অসামরিক অবাঙালি দেহরক্ষী ছিলো। মীনা পেশোয়ারি কলকাতা নিউ মার্কেট ও ধর্মতলা এলাকার ফল ব্যবসায়ীদের নেতা, তবে তিনি প্রচÐ দৈহিক শক্তির অধিকারী এবং খুব সাহসী লোক ছিলেন।
দ্বিতীয় ঘটনা সত্তরের নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে। সত্তরে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি বোর্ডে চট্টগ্রাম থেকে একমাত্র সদস্য ছিলেন এম এ আজিজ। জহুর আহমদ চৌধুরী ছিলেন না। মনোনয়ন ঘোষণার পূর্বে এমএ আজিজ জেলে ছিলেন। সারা দেশের প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করার পর চট্টগ্রামের প্রসঙ্গ আসলে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি আজিজের সঙ্গে কথা না বলে চট্টগ্রামের মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে পারবো না’। তিনি চট্টগ্রাম এসে জেলে গিয়ে এমএ আজিজের সঙ্গে দেখা করেন এবং কথা বলেন। তারপর ঢাকা গিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেন। প্রার্থী তালিকা বের হবার পর দেখা গেল চট্টগ্রাম থেকে এমন কিছু নাম এসেছে যারা আগে আওয়ামী লীগ করতেন না এবং নির্বাচনী জল্পনা-কল্পনায়ও তাদের নাম ছিল না। কেউ আশা করে নি তারা নমিনেশন পাবেন। কিন্তু এম এ আজিজ তাদের নমিনেশন দেয়ার জন্য সুপারিশ করেছেন, সুতরাং বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন। প্রতিক্রিয়া হলো মিরসরাইর প্রাদেশিক পরিষদে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, পটিয়ায় প্রাদেশিক পরিষদে সুলতান আহমদ কুসুমপুরী, আনোয়ারা-বাঁশখালী-কুতুবদিয়া জাতীয় পরিষদে আতাউর রহমান কায়সার, সাতকানিয়া প্রাদেশিক পরিষদে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মনোনয়ন নিয়ে। কারণ তারা নব্য আওয়ামী লিগার এবং মুসলিম লীগ নেতা ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর পুত্র। অবশ্য কুসুমপুরীর ক্ষেত্রে এই অভিযোগ খাটে না। তিনি অনেক পুরোনো আওয়ামী লিগার। চট্টগ্রামের সে সময়ের শীর্ষ ছাত্রনেতা, তুখোড় বক্তা, দুর্ধর্ষ সংগঠক, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম ইউসুফ এটা সহ্য করতে পারলেন না। তিনি লালদিঘি ময়দানে সভা ডেকে এম এ আজিজের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন ‘আওয়ামী লীগে নীলবর্ণ শৃগালের অনুপ্রবেশ ঘটেছে।’
পাদটীকা : বিএনপিতেও এরূপ ক’জন নেতা প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চেয়ে প্রত্যাখ্যান ও বঞ্চনার গ্লানি সয়ে সয়ে ধুঁকে ধুঁকে তাঁদের মাথা টাক হয়ে যেতে কিংবা চুলে রূপালী রেখা গজাতে দেখছি। এই নেতাদের মধ্যে আছেন আবু সুফিয়ান, এরশাদুল্লাহ (এই দু’জনই বোধ হয় এবার চান্দগাঁও-বোয়ালখালী আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছেন), সাতকানিয়ার শেখ মহিউদ্দিন, বাঁশখালীর সাবেক পৌর মেয়র কামরুল ইসলাম হোসাইনী, বাঁশখালীতে যাঁকে ছাত্রদলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়, সেই সাখাওয়াত জামাল দুলাল-যাঁর প্রতি ভ্রাতৃজ্ঞানে আমি খুব নৈকট্য অনুভব করি-তিনি হয়তো দু’একবার মনোনয়নের জন্য আগ্রহী হয়ে আবার পিছিয়ে গেছেন অসম্মানের ভয়ে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক