তাসে নাশ, জুয়ায় দেশের সর্বনাশ

মোঃ শফিকুল আলম খান

5

বিচিত্র এদেশ, বাংলাদেশ। এক এক সময় এক এক ঘটনা সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। পরিনত হয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নির্বাচন, হরতাল, পেট্রোল বোমা, আগুন সন্ত্রাস, মানুষ হত্যা, জঙ্গি হামলা, সড়ক দুর্ঘটনা বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ধর্ষণ, চট্টগ্রামে পুলিশ অফিসাদের স্ত্রী মিতু হত্যা, কুমিল্লার কলেজ ছাত্রী সোহাগী হত্যা, ফেনীতে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যা, বরগুনার রিফাত হত্যা এবং সর্বশেষ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের পদ থেকে অপসারণের ঘটনা সারাদেশে খুবই আলোচিত ছিল। হালে যুক্ত হয়েছে ক্যাসিনো। ক্যাসিনো ব্যবসাকে কেন্দ্র করে, বাংলাদেশের আকাশে এখন উড়ছে শত, হাজার কোটি টাকা। চারদিকে ছড়াচ্ছে মদের গন্ধ।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সম্প্রতি র‌্যাব ও পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে ঢাকার প্রায় ত্রিশ/ পঁয়ত্রিশটি ক্যাসিনো ও ক্লাব থেকে উদ্ধার করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ এবং ক্যাসিনো পরিচালনার মেশিন। গ্রেফতার হয়েছে যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা, টেন্ডারবাজ জি.কে. শামিম, খালেদ মাহমুদ ভূইয়া, কৃষকলীগ নেতা শফিকুল আলম এবং মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন ভূইয়াসহ অনেকে। সবার বাসায় পাওয়া গেছে নগদ কোটি কোটি টাকা, কয়েক শতকোটি টাকার এফ.ডি.আর ও স্বর্ণালংকার। অভিযুক্ত শীর্ষ নেতাদের অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছে এবং আবার কেহ কেহ দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তাছাড়া খুবই আতংকে রয়েছে দুষ্কর্মে লিপ্ত আওয়ামীলীগ, যুবলীগসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী এবং সরকারি কর্মকর্তারা। তারা সবাই দূরে থেকে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে।
র‌্যাব এবং পুলিশ কর্তৃক যাদের ধরা হয়েছে বা যাদের খোঁজা হচ্ছে তারা মূলত ক্যাসিনো বা ক্লাব পরিচালনা করে বা ভাড়া দিয়ে এত ধন সম্পদের মালিক হয়েছে। তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে যাদের টাকার অংশ বিশেষ পেয়ে তারা এত টাকার মালিক হয়েছে সে আসল জুয়ারী কারা? এই ক্যাসিনোগুলোতে বা ক্লাবে কারা জুয়া খেলে। খেলার জন্য তারা কোটি কোটি কোথা থেকে পেয়েছে? তাদের আয়ের উৎস কি? তারা কি বৈধভাবে এই টাকা আয় করেছে? তারা কি সরকারকে কর দেয়? এ সমস্ত রাগব বোয়ালদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। জানা গেছে পুলিশের নাকের ডগায় বছরের পর বছর এই অবৈধ ব্যবসাগুলো চলত। পুলিশ কেন এতদিন ব্যবস্থা নেয়নি তাও খতিয়ে দেখা দরকার।
আমরা জানি জুয়া হচ্ছে এক ধরনের বাজি। সে হিসেবে আমি, আপনি, সবাই জীবনে কোন না কোন সময় বাজি ধরেছি বা জুয়া খেলেছি। শৈশব ও কিশোর বয়সে আমরা সমবয়সীর সাথে কোন বিষয় বা খেলায় বাজি ধরেছি। তখন শর্ত থাকত, যে হারবে তাকে বিজয়ীকে খাওয়াতে হবে বা কোন শাস্তি মেনে নিতে হবে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময় দেখেছি গ্রামের সিনিয়র অনেক লোকজন রাতদিন তাস খেলতেন। তখন কাচ্চু, টুয়েন্টি নাইন, ফ্ল্যাশ ইত্যাদি খেলার নাম শুনেছি। সে সময় গ্রামে যাত্রা গান হত। যাত্রাগানের মূল আকর্ষণ ছিল জুয়া। স্থানীয় থানাকে ম্যানেজ করে সারা রাত জুয়ার আসর বসত। আয়োজকরা জুয়া খেলা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা পেত। পরবর্তীতে শহরের বিভিন্ন জায়গায় চালু হয় হাউজি খেলা। চট্টগ্রামের বিভিন্ন অভিজাত ক্লাবের আলাদা কক্ষে, অভিজাত ধনী ব্যক্তিরা কার্ড খেলেন। সেখানে মদ পানও চলে।
জুয়া কিন্তু নতুন খেলা নয়। প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে জুয়ার প্রচলন ছিল। যিশু খ্রিষ্টের জন্মের তিন হাজার বছর আগে থেকে ইরাক, সিরিয়া, তুরস্কে বাজি খেলা হত গুটি দিয়ে এবং যিশু খ্রিষ্টের জন্মের এক হাজার বছর আগে চীনে পশু লড়াইয়ের উপর বাজি ধরা হত। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এখনো ঘোড় দৌড়ের ওপর বাজি ধরা হয়।
সময়ের বিবর্তনে জুয়ার গতি প্রকৃতি বদলীয়ে ক্যাসিনো হচ্ছে জুয়ার আধুনিক সংস্করণ । বর্তমানে সারা বিশ্বে জুয়ার আসরে চলে ক্যাসিনোর রমরমা ব্যবসা। এ সমস্ত ক্যাসিনোতে পোকার, বাক্কারাট, রুলেট, পল্টুন, ফ্লাশ, বিট, ডিলার, বø্যাক জ্যাক এবং কার্ড ¯øট মেসিনের খেলা ছাড়াও একসাথে চলে মদ ও নাচগান। উড়ানো হয় হাজার কোটি টাকা। আমেরিকা, রাশিয়া ছাড়াও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ চীন, সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত ও নেপালে চলে ক্যাসিনোর রমরমা বাণিজ্য। এদেশের ক্যাসিনোগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জুয়ারী পর্যটকদের বেশি আকর্ষণ করে। যার ফলে পর্যটন খাতে তাদের প্রচুর টাকা আয় হয়।
একটা প্রবাদ আছে তাসে নাশ, জুয়ায় সর্বনাশ। জুয়ায় যে হারে সেতো সর্বস্ব হারায় আবার যে জিতে সেও হারে। জুয়ারীদের পরিবারে সবসময় অশান্তি বিরাজ করে। সব হারানোর পরও অনেকে চেষ্টা করেও এটা থেকে তারা ফিরতে পারে না। এটাতে তারা মাদকের মত আসক্ত হয়ে পড়ে। জুয়ার প্রভাবে যুব সমাজ বিপথে পরিচালিত হয়। তারা অসৎ পথে টাকা রোজগারে মরিয়া হয়ে ওঠে। এতে সমাজে ঘুষ, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কাজ বৃদ্ধি পায়। তখন দেশের হয় সর্বনাশ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশক্রমে পরিচালিত এই অভিযানে সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল বলেছেন ঘুষ, দুর্নীতি, মদ, জুয়া ইত্যাদির বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে অভিযান অব্যাহত থাকবে। অপরাধী যত বড় গড ফাদার বা গ্র্যান্ড ফাদার হউক না কেন তাকে ধরা হবে। শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রথমে নিজ দলের প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় এই অভিযান সর্বমহল কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। কারণ অতীতে কোন সরকারই নিজ দলের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোন সময় কোন ব্যবস্থা নেয়নি। তবে কেউ কেউ বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বি.এন.পি এটাকে আই ওয়াশ বা চোখ দেখানো বলে অভিহিত করেছে।
আমরা সাধারণ নাগরিকরা চাইব, আওয়ামীলীগ বা তার অঙ্গ সংগঠনের অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে তা সারাদেশে চলমান থাকবে। অদৃশ্য কোন অশুভ শক্তির হস্তক্ষেপে তা অংকুরে বিনষ্ট হবে না। যারা প্রকৃত অপরাধী, যারা ঘুষ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদক, জুয়া ইত্যাদি অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত তাদের সবাইকে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা হবে। তাহলে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার শেখ হাসিনার আন্তরিক ও নিরলস প্রচেষ্টা সফল হবে।

লেখক : রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক