তাপদাহে ওষ্ঠাগত প্রাণ

আরও দুইদিন থাকবে তীব্র গরম, শনিবার থেকে ঝড়বৃষ্টির আভাস

তুষার দেব

44

এবারের গ্রীষ্মকালে কী তাহলে ক্রিকেটের মারকাটারি সংস্করণ টি-টোয়েন্টির মেজাজেই তেঁতে থাকবে প্রকৃতি? পহেলা বৈশাখ থেকেই এবারে ছক্কা হাঁকাচ্ছে গরম। মৌসুমের একেবারে প্রথম থেকেই অনুভূত হচ্ছে তাপদাহ। সকাল পার না হতেই মাত্রাছাড়া গরম। আকাশে গনগনে সূর্যের উপস্থিতি উজ্জ¦ল থেকে উজ্জ্বলতর হওয়ার সাথে পাল্লা দিয়েই বাড়ছে রোদের চরম উত্তাপ। সবমিলিয়ে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে আবহাওয়া পরিস্থিতি। মৌসুমের প্রথম তাপদাহে অস্বস্তিতে ভুগছে দেশের মানুষ। তীব্র গরমে ওষ্ঠাগত প্রাণ।
আরও অন্তত দুইদিন এ অবস্থার পর শনিবার থেকে ঝড়বৃষ্টি হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
গতকাল বুধবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, গত কয়েকদিন ধরে খুলনা, যশোর, পটুয়াখালী ও ভোলা অঞ্চলসহ চট্টগ্রাম বিভাগের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহ বিস্তৃতি লাভ করছে। যা অব্যাহত থাকতে পারে আরও কয়েকদিন। নতুন বছরে তাপদাহের দহনজ্বালা একেবারে বৈশাখের শুরু থেকেই টের পেতে শুরু করে চট্টগ্রামসহ দেশের বেশিরভাগ এলাকার মানুষ। ঝড়-বাদলকে শিকেয় তুলে রেখে চড়তে থাকা তাপমাত্রার পারদ গত মঙ্গলবার রাঙামাটিতে ৩৭ দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘর ছুঁয়েছে। অবশ্য চলতি সপ্তাহে দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে তা ৪০-এর ঘর ছুঁতে পারে বলেও আভাস দিয়ে রেখেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। দিন যতই গড়াচ্ছে তার আলামতই যেন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান ও অনুভূত হচ্ছে। গরম বেড়ে যাওয়ায় দুর্ভোগ বাড়ছে মানুষের। দেখা দিচ্ছে নানা ধরনের রোগ-ব্যাধি। বিশেষত শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা গরমজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাপমাত্রার পারদ সবচেয়ে বেশি চড়ছে চট্টগ্রাম অঞ্চলেই। গত মঙ্গলবার ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কোথাও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়নি। চট্টগ্রাম সদরে রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এদিকে, অতিরিক্ত গরমে মানুষের শরীরে নানা ধরনের জীবানুর সংক্রমণের পাশাপাশি হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। দীর্ঘ সময় প্রচন্ড গরমে থাকার ফলে শরীরের তাপমাত্রা একশ’ পাঁচ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে গেলে মানুষ হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এ অবস্থায় শরীরের ঘাম বন্ধ হয়ে যায় এবং অনেক সময় মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এ ধরনের ঝুঁকি এড়াতে তরল খাবারের পাশাপাশি একাধিকবার গোসলেরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের উষ্ণতম মাস মে। বাংলা বর্ষপঞ্জির ঋতু পরিক্রমায় গ্রীষ্মের হামাগুড়ির সময়। বাংলা নববর্ষের প্রথম মাস বৈশাখের প্রথম পক্ষের বিদায়ে যাত্রা শুরু হয় মে মাসের। ২০১৭ সালের মে মাসে টানা ১৯ দিনের তাপদাহে বিপর্যস্ত হয়েছিল সারাদেশ। ওইবছর ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব জেলায় দিনের তাপমাত্রা ছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁইছুঁই। রাজশাহীতে তাপমাত্রার পারদ মৌসুমের সর্বোচ্চ ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে ছিল। কিন্তু গত বছর মানে ২০১৮ সালের মে মাস ছিল উল্টো বৃষ্টিমুখর। ওই বছর মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে দেশে গড় বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। অধিদপ্তরের গবেষণার তথ্য বলছে, ১৯৮১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা ৩০ বছর গ্রীষ্ম ঋতুতে গড় বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কিছু কম। কিন্তু জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতির খেয়ালী আচরণের ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সাল থেকে গ্রীষ্ম ঋতুতে আবহাওয়া পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ওই বছর থেকে গ্রীষ্ম ঋতুতে অতিবৃষ্টি, দীর্ঘ সময় ধরে কালবৈশাখী, অত্যধিক বজ্রপাতের প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, পারদ চড়ার প্রবণতা আপাতদৃষ্টিতে অব্যাহত থাকলেও চলতি এপ্রিল মাসের শেষ দিকে ফের কালবৈশাখীর দাপট ও সাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টির আলামত রয়েছে। তবে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষদিকে শুরু হতে যাওয়া রমজানে রোজাদারদের অস্বস্তির অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে তাপদাহ। পুর্বাভাসেই এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। পুরো মে মাসজুড়েই দেশের অধিকাংশ এলাকায় দাপট থাকবে তাপদাহের। মাসের শেষের দিকে দেশের উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে একটি তীব্র তাপপ্রবাহ এবং অন্যান্য স্থানে এক থেকে দুটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুটি নিম্নচাপ সৃষ্টির আলামত রয়েছে, যার একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। উল্লেখ্য, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আবহাওয়াবিদরা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রাকে তীব্র তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মাঝারি এবং ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মৃদু তাপপ্রবাহ হিসেবে গণনা করেন।