প্রতিক্রিয়া। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ৫ বিশিষ্ট ব্যক্তি পূর্বদেশকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। 

তরুণ প্রজন্মকে দেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানাতে হবে

আ জ ম নাছির উদ্দীন

এম এ হোসাইন

18

‘পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে সন্ত্রাস, জাঙ্গিবাদ, মাদক ও অপসংস্কৃতির কবল থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে পারবো। নিজস্ব ঐতিহ্য আমরা তুলে ধরতে পারবো। তরুণ প্রজন্ম বাঙালির সংস্কৃতি সম্পর্কে জানবে, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানবে এবং নিজেদের অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রাখবে।’ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন পহেলা বৈশাখের আয়োজনের অনুভূতি পূর্বদেশের কাছে এভাবেই উপস্থাপন করেন।
মেয়র বলেন, বাঙালি জাতিসত্তার রয়েছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই অঞ্চলের মানুষ জাতিগতভাবেই অতিথিপরায়ণ। একে অন্যের বিপদে এগিয়ে আসার প্রবণতা এই ভূখন্ডে বহু পুরোনো। এসব জানাতে হবে নতুন প্রজন্মের নাগরিকদের। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে হবে পর্যাপ্ত সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ ও সুযোগ। দেশিয় সংস্কৃতিকে জানানোর ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
তিনি বলেন, আমি নগরবাসীর সেবক। নগরবাসী যেটা ধারণ করেন সেটার সাথে থাকা আমার নৈতিক দায়িত্ব। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে এবারই প্রথম ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠান সাজিয়েছি। এই তিনদিনের অনুষ্ঠানে আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরব। কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাদের পরিবার মিলে এটা মিলনমেলায় পরিণত হবে। পাশাপাশি নগরবাসীও আমাদের অনুষ্ঠানে সামিল হতে পারবে।
আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক, জাতি হিসেবে আমরা বাঙালি। আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আছে। এটাকে ধারণ করে আমাদের আরো উন্নত জাতিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ আছে। আমাদের নিজেদের গর্ব করার মতো যে সংস্কৃতি আছে তা নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে হবে।
মেয়র বলেন, আগে পহেলা বৈশাখ উৎসব ব্যবসায়ীদের হালখাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। গ্রামের বিশেষ কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার পর এটা বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিশেষ গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের উৎসব এটা নয়। ধর্ম, বর্ণ নিবিশেষে এই অনুষ্ঠান শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
বাঙালির এ উৎসব সম্পর্কে আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, পহেলা বৈশাখ ধর্মীয় উৎসবগুলোর মতো স্বীকৃতি পেয়েছে। ধর্মীয় উৎসবে যেমন সবাই নতুন পোশাক পরিধান করেন, আনন্দ উপভোগ করেন তেমনি পহেলা বৈশাখেও যার যার সামর্থ অনুযায়ী নতুন পোশাক পরিধান করেন, সাজগোজ করেন। আনন্দ উপভোগ করেন।
তিনি বলেন, এবার বৈশাখী উৎসব গতবারের চেয়ে আরো ব্যাপকতা লাভ করেছে। প্রায় প্রতিষ্ঠান করছেন, সংগঠন করছেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনও বৈশাখী অনুষ্ঠানের আয়োজন করছেন। নগরে যারা বসবাস করেন প্রত্যেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বৈশাখী অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত। প্রত্যেকের অংশগ্রহণের মধ্যেই অনুষ্ঠানের সফলতা জড়িত।

এইদিনে বাংলার
সংস্কৃতির সবকিছু
এক হয়ে যায়
আহমেদ ইকবাল হায়দার

সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদের আহবায়ক ও তির্যক নাট্যদলের প্রধান আহমেদ ইকবাল হায়দার বলেন, এই দিনটাতে আমার খুবই ভালো লাগে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নিবিশেষে আমরা পহেলা বৈশাখ উদযাপন করি। বাংলাকে নিয়ে আমরা অহঙ্কার করি।
এইদিনে সর্বক্ষেত্রে বাংলার সংস্কৃতির সবকিছু এক হয়ে যায়। এটা সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে আমার কাছে খুবই গৌরবের মনে হয়। পহেলা বৈশাখ নিয়ে আমি গর্ব বোধ করি। বাঙালি সংস্কৃতির চেতনায় নতুন প্রজন্মকে জাগ্রত করতে হবে।
ডিসি হিলের বৈশাখী আয়োজন সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের এ আয়োজন এবার ৪১ বছরে পড়েছে। ডিসি হিলে ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির উৎসব, সবার যোগে জয়যুক্ত হোক’ এই স্লোগানে আমরা বাঙালির এ উৎসব করে আসছি। বরাবরের মতো এবারও আমরা দুইদিনের অনুষ্ঠানমালা হাতে নিয়েছি। চৈত্র সংক্রান্তি বা বর্ষবিদায় অনুষ্ঠান হবে শনিবার বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং পহেলা বৈশাখের আয়োজন থাকবে রোববার (আজ) ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। চট্টগ্রামের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন আমাদের অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করবে। থাকবে নাছ, গান ও নাটক।
আগামীর পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে আহমেদ ইকবাল হায়দার বলেন, পহেলা বৈশাখের কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকিকরণ হয়ে যাচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে। আয়োজনের মধ্যে আমরা যেন বাংলাকে ধারণ করতে পারি সে দিকটাতে নজর দিতে হবে।

বাঙালির প্রাণের
মেলায় রূপ নিয়েছে
পহেলা বৈশাখ
শায়লা শারমিন স্বাতী

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক শায়লা শারমিন স্বাতী বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের মেলায় রূপ নিয়েছে। বহুদিন ধরে আমরা সেই চেষ্টাতেই ছিলাম। আজ এটা সার্ববজনীন অনুষ্ঠানে রূপ পেলো। এটা আমাদের জন্য গর্বের। আমরা সত্যিকার সংস্কৃতির কথা বলবো। সবাইকে নিয়ে আমরা একসাথে সংস্কৃতিটাকে এগিয়ে নিবো। তাহলেই বন্ধ হবে অপসংস্কৃতি।
তিনি বলেন, সারা পৃথিবী আজ কানেক্টেড। সারা বিশ্বের উৎসবের সাথে আমরা পরিচিত হচ্ছি। প্রত্যেক দেশ নিজস্ব সংস্কৃতি ধারণ করে থাকে। আমাদের যে লাল-সাদার সংস্কৃতি সেটা প্রকৃতির সাথে গুরুত্ব বহন করে। প্রকৃতির সাথে আমার পরিচয় বহন করে আমাদের সংস্কৃতি।
চারুকলার এবারের আয়োজন সম্পর্কে শায়লা শারমিন স্বাতী বলেন, চারুকলা থেকে প্রতিবারের ন্যায় এবারও র‌্যালি বের হবে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে। দিনব্যাপী অনুষ্ঠান হবে। এবারের শোভাযাত্রায় বিপন্ন কর্ণফুলীকে প্রতীকী নারীর মুখাবয়বে তুলে ধরা হচ্ছে। কর্ণফুলী নিয়ে একটি কথা প্রচলন আছে, এক নারীর কানের দুল নদীতে পড়ে যায়। প্রতীকীতে সেটা তুলে ধরে এক কানে থাকবে দুল, অন্যটি খালি থাকবে। এছাড়া বড় আকারের মাছ, নৌকা-সাম্পান, হরেক রঙের মুখোশসহ নানান প্রতিকৃতি নিয়ে সবাই মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন। বিকালে বাউল গান ও ব্যান্ড শো থাকবে।
তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকেই আমি সংস্কৃতিমনা পরিবারে বড় হয়েছি। তখনো পহেলা বৈশাখে ঘর সাজানো, নতুন কাপড় পরা হতো। স্কুল পর্যায়েও কিছুটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় ডিসি হিলে আসতাম। আগে আনুষ্ঠানিকতায় হতো শুধু। এতো আন্তরিকতায় হতো না।

বাঙালি সংস্কৃতির
ব্যাপকতা বাড়ছে
সবাই অংশ নিচ্ছে
সাইফুল আলম বাবু

‘আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতির, বাঙালির সংস্কৃতির ব্যাপকতা এখন আরও বেড়েছে। সারাদেশ এমনকি চট্টগ্রামের এমন কোনো গ্রাম বা মহল্লা নেই যেখানে পহেলা বৈশাখের আয়োজন নেই। বৈশাখে সবাই নতুন পোশাক পরিধান করছেন। শ্রমজীবীরাও বৈশাখের উৎসবে মিলিত হচ্ছেন। পহেলা বৈশাখ আজ প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই উৎসবকে ঘিরে আয়োজন হচ্ছে নানান উৎসবের। সংস্কৃতির সমস্ত মাধ্যমের মিলন ঘটছে।’
জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বাবু পহেলা বৈশাখের উৎসবের ব্যাপকতা বর্ণনা করেন এভাবেই।
তিনি বলেন, পরবর্তী প্রজন্মকে আমরা যত দিতে পারবো তত তারা উপকৃত হবে। আমি একটা স্কুলে দেখেছি বৈশাখের আয়োজন লিখেছে ইংরেজিতে। তারা কি পারতো না এটা বাংলায় লিখতে। পরবর্তী প্রজন্মকে আমাদের সঠিক শিক্ষা দিতে হবে। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের জানাতে হবে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানলেই তারা সন্ত্রাস, মাদক ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে থাকবে। এজন্য সাংস্কৃতিক কর্মকাÐের জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো দরকার।
শিল্পকলার বৈশাখী আয়োজন সম্পর্কে সাইফুল আলম বাবু বলেন, শিল্পকলায় দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। নতুনভাবে আল্পনায় জানানো হবে। যন্ত্রসংগীতের মাধ্যমে বর্ষ বিদায় অনুষ্ঠান হবে। বেহেলার সুর, লোকগান, বিদায়ী গানসহ দুইজন ক্ষুদে শিল্পীর বাউল গান পরিবেশনা থাকবে। পহেলা বৈশাখের আয়োজনে সার্কিট হাউজ থেকে সকালে র‌্যালি বের করা হবে। বৈশাখের আলোচনা, পুঁথিপাঠ, যাত্রাপালা ও নৃত্যসহ সব আয়োজন থাকবে।

বৈশাখের আয়োজন
সম্মিলিতভাবে করা
এখন সময়ের দাবি
হাজী মো. সাহাবউদ্দিন

সিআরবি শিরীষতলা নববর্ষ উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. সাহাবউদ্দিন বলেন, পহেলা বৈশাখ নিয়ে সরকারের হস্তক্ষেপে একক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে ভালো হয়। এখন ডিসি হিল, সিআরবিসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুষ্ঠান হচ্ছে।
কেউ একটা অনুষ্ঠানে গেলে আরেকটা দেখার সুযোগ পাচ্ছে না। বড় পরিসরে সম্মিলিতভাবে বৈশাখের আয়োজন করা যায়। স্টেডিয়াম বা পলোগ্রাউন্ডে সেটা করা যায়। তখন প্রত্যেক সংগঠনের কারুকার্য সবার চোখে পড়তো।
সিআরবির বলিখেলা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের অনুষ্ঠানের এবার ১১ বছর চলছে। সাংবাদিক, সমাজসেবক, সংস্কৃতিকর্মী সবার সিন্ধান্তের আলোকে আমি বলি খেলার আয়োজনে সম্পৃক্ত হই। তখন জব্বারের বলিখেলা ছাড়া অন্য কোনো বলি খেলা হতো না। সবার অনুরোধে আমি অনুষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছি। পরবর্তীতে মেয়র মহোদয় বলিদের প্রশিক্ষণের কথা বলেন। সেটারও উদ্যোগ নিয়েছি। আগামী বছর থেকে বলিদের প্রশিক্ষণও প্রদান করা হবে।
সিআরবিতে এবারের আয়োজন সম্পর্কে সাহাবউদ্দিন বলেন, এবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আবৃত্তি ও নজরুল গীতি থাকবে। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলবে। বিকেল ৩টা থেকে বলি খেলার আয়োজন থাকবে। এবার ৬০/৭০ জন বলি অংশ নিবেন। আমরা হয়তো ৩০/৪০ জনকে খেলায় সুযোগ দিতে পারবো।
তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সহযোগিতা করেছেন। এতে আমরা আনন্দিত। আমরা চাই, বিশ দরবারে বাঙালি সংস্কৃতি স্থান করে নিক।