তরকারির পেঁয়াজ নাকি রাজনীতির পেঁয়াজ

11

সুরেশ কুমার দাশ

গতবছর যখন ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল, তাতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গিয়েছিল, দীর্ঘদিন ধরে বাড়তি দাম আর পড়েনি। যাদের পক্ষে সম্ভব তখন অল্পস্বল্প পেঁয়াজ ব্যবহার করেছে। কিন্তু যখন পেঁয়াজের দাম কমার সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছিল না, তখন অনেকেই পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল হয়তো। এমনকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই ধরনের কথা বলেছিলেন। যারা পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ করেনি, তারা মশলা হিসাবে পেঁয়াজের ব্যবহার অনেকেই কমিয়ে দিয়েছিল। কারণ পেঁয়াজের দাম ছিল অনেক মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। সরকার নানাভাবে নানা দেশ থেকে পেঁয়াজ আনলেও কিন্তু শেষ পর্যন্ত পূর্বের মত সুলভ দামে কিনতে পারেনি। এক পর্যায়ে পেঁয়াজ নিয়ে কথাবার্তা ভাটা পড়েছিল। মানুষও চেষ্টা করেছে মশলা হিসাবে পেঁয়াজের নির্ভরতা কমাতে। সেই পরিস্থিতি থাকলে আজও ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের খবর মানুষের মধ্যে তেমন শোরগোল তুলতে পারত না। কিন্তু পরবর্তিতে মৌসুমে পেঁয়াজের দাম কমে যাওয়ায়, ব্যবহার আবার বাড়িয়েছে। এভাবে পেঁয়াজের রাজনীতির সঙ্গে রসুইঘরের রাঁধুনি থেকে শুরু করে ক্রেতা থেকে জনগণ সকলে যুক্ত হয়ে পড়েছে। জনগণের প্রধান চাহিদা-তাদের নৈমিত্তিক বাজার-সওদা সুলভ ও সহজে ক্রয় করার নিশ্চয়তা। ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে।
এখানে কিছু কথা বলতে হয়- আমাদের কৃষি বিপুল উন্নতি করেছে- তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। বিশেষ করে- চাল উৎপাদনে সরকারের সহযোগিতা অভাবনীয়। অভাবনীয় না হলেও মানুষের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। যে কারণে খাদ্য ঘাটতির শঙ্কা জনগণের নেই।
এক্ষেত্রে সম্ভবত আমরা শুধু চালের পিছনেই ছুটেছি। কিন্তু মানুষের তো চাহিদার শেষ নেই। সরকার উন্নত রাষ্ট্রের কথা বলছে। সেখানে মানুষের নতুন নতুন চাহিদাগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর পেঁয়াজের চাহিদা মানে আকাশের তারা চাওয়া নয়। কিন্তু আমরা বরাবরই অপ্রস্তুত। বাজারে এখন পেঁয়াজের দাম চড়ছে। এর কারণ আমরা গত বছরের শিক্ষা থেকে কিছু গ্রহণ করিনি। ভারত যখন পেঁয়াজ বন্ধ রপ্তানি করল। আমরা উৎপাদন করতে না পারলেও আমাদের যে ভারত ছাড়া অন্য দেশগুলো থেকে আমদানিসম্পর্ক তৈরি হয়েছিল সেটা ধরে রাখা বা চলমান রাখা দরকার ছিল। সেখানে একটা কথা আসে- সেটা হচ্ছে ভারত থেকে পেঁয়াজ সস্তায় আমদানি করা যায়। এই সস্তার কারণে পেঁয়াজের ব্যবহারও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বলে মনে হয়। এটা অভ্যাসবশত। অভ্যাসে ছেদ পড়ে বলে যখন বাজারে দাম চড়তে থাকে তখন আর গ্রাহকের হুঁশ থাকে না। পেঁয়াজের রাজনীতির সঙ্গে ভারত- বাংলাদেশের রাজনীতি যুক্ত হয়। ভারত থেকে বাংলাদেশ কি পেল আর বাংলাদেশ থেকে ভারত কি পেল সেই যক্তি তর্কে লেগে পড়ে সকলে।
এজন্যই বলছি- চাহিদা পূরণ করতে হবে একের পর এক। উন্নত রাষ্ট্রের প্রচারণাও জনগণ শুনেছে। এই যোগানের বিষয়ে সামর্থ্যবান হওয়া মানে উন্নত রাষ্ট্রের যোগ্যতার প্রমাণও বটে। তাই জনগণকে আর তাদের চাহিদা কমানোর কথা বলে দমানো যাবে না। অভ্যাস থেকে ফেরানো যাবে না। কারণ তাদের টোপ দেওয়া হয়েছে। বাঙালির সুদিন সমাগত-অভাবের মধ্যে থাকতে চাইছে না। কিন্তু ভারতের মত সস্তা বাজারে যেখানে পেঁয়াজের চাষ করে কৃষকরা পোষাতে পারে না। সেখানে বাংলাদেশের মত কম জমির দেশে, যখন কৃষি শ্রমিকের দাম দৈনিক ৫/৬ শ টাকার কম নয় সেখানে পেঁয়াজ চাষ করে কৃষকরা কি করবে। একই সাথে অতি গুরুত্বপূর্ণ ফসলগুলো ফলানো যেখানে জরুরি। এ কারণেই- হয়তো মশলা হিসাবে যেমন পেঁয়াজের নির্ভরতা কমাতে হবে, অথবা পেঁয়াজের জন্য ভারত নির্ভরতা কমাতে হবে।
পাকঘরে রাঁধুনিদের হিসাব এরকম: মশলার অনেক পদ থাকার পরও তাদের কাছে পেঁয়াজের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি। প্রয়োজন থাকলেও পেঁয়াজ। আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহারের নামও পেঁয়াজ। এই প্রয়োজনীয়তা বেশি হওয়ার কারণ ভারতের সস্তা পেঁয়াজ। আসলেই মৌসুমে পেঁয়াজের দাম অত্যন্ত কমে যায়। সস্তা হওয়ায় সর্বত্র ব্যবহার বাড়ে। তরকারির বাইরেও ব্যবহার করা হয়। মনে হয়- পেঁয়াজের মত একটি মশলার দাম এত কম হওয়ার দরুণ এটার চাহিদা অত্যন্ত বেশি। ভাবতে হবে পাশাপাশি অন্য মশলাগুলোর চাহিদা কতটা তরকারি রান্নায়। এটার কারণ হচ্ছে – পেঁয়াজের মত অন্য মশলাগুলো পেঁয়াজের মত সস্তা নয়। আর পেঁয়াজকে মশলা ছাড়াও আমরা নানাভাবে ব্যবহার করছি। সস্তার সঙ্গে ব্যবহার ও প্রয়োজনীয়তার একটা বিষয় আছে। সস্তা খাদ্যপণ্য নানা ব্যঞ্জনে বা নানা পদে নানা কিছুতে ব্যবহারের বিষয় আছে। যেমন- যেসব অঞ্চলে নারকেলের উৎপাদন বেশি, সেসব দেশে নারকেলকে নানাভাবে তারা ব্যবহার করে। এর কারণও বাড়তি উৎপাদন ও বাড়তি ব্যবহার এবং অপচয় কমানো। উৎপাদন অঢেল বলেই সেটার ব্যবহার বেড়েছে। আর এখানেও সস্তা বলেই ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন তো ব্যবহার অনুপাতে হচ্ছে না। সেটা বাইর থেকে আসে। অর্থাৎ পর মুখাপেক্ষি। এই প্রেক্ষিতে সবার রাজনীতিতে যুক্ত না হওয়া শ্রেয়। পেঁয়াজের মত একটা বিষয় এত রাজনীতি রাজনীতি না করে যুক্তিসঙ্গত কারণে রাজনীতি করলে দেশের জন্য ভালো হবে। তা পেঁয়াজ উৎপাদনে আমরা কি করছি। আমাদের কৃষি জমি আসলেই খালি পড়ে থাকে কিনা মৌসুমে। ভারত তো বাংলাদেশকে সারাজীবন পেঁয়াজ সাপ্লাই দিতে পারবে না।
বাংলাদেশের মানুষের সাথে পেঁয়াজের কারণে ভারতের একটা সম্পর্ক আছে। সেটা ইদানিং রাজনৈতিক সম্পর্ক হয়ে উঠছে। ভারতও চায় বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক। তারা চায় বাংলাদেশের জনগণ যাতে ভারত সম্পর্কে বন্ধুসুলভ মনোভাব নিয়ে থাকে। তারা ভারত বাংলাদেশের জনগণের মধ্যেও একটা সুসম্পর্ক দেখতে চায়। কিন্তু পেঁয়াজ থেকে বোঝা যায়-ভারত বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গেও কেমন সুসম্পর্ক চায়। অথচ চাইলে এই পেঁয়াজের মাধ্যমে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্কের একটা সূত্র তৈরি হত। দুদেশের হিসাবে বেশ বন্ধুত্বর্পূর্ণ সম্পর্ক দুদেশের। ভারত চায় জনগণের সঙ্গে জনগণের সুসম্পর্ক। কিন্তু পেঁয়াজের সঙ্কট শুরু হলে- মানে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলেই- ভারতবিরোধি তো বটেই দেশের প্রায়ই জনগণ ভারতের বিরুদ্ধে বলতে শুরু করে। এমনভাবে বলাবলি করে যখন মনে হয়- ভারতের দায়িত্ব বাংলাদেশকে পেঁয়াজ দেয়া। কিন্তু ভারত বিষয়টা এভাবে দেখছে না। ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ দিয়ে এতটা বন্ধুত্ব যদি জনগণের কাছ থেকে তারা পায় তাহলে সেক্ষেত্রে- তাদের অন্য কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশকে প্রায়োরিটি দেওয়া দরকার। কিন্তু এসব সম্পর্কের বিষয় যেন কথার কথা।
আরো যদি বলতে তাহলে বাংলাদেশ সরকারের বদান্যতার বিষয়গুলো ভারতকে স্মরণ করিয়ে দিতে হয়। যেমন বিবিসির এক সাক্ষাতকারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমেনা মহসিন বলেছেন- ভারত মোটামুটি আমাদের কাছ থেকে যা চেয়েছিল বাংলাদেশ সবগুলোই পূর্ণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের চাওয়াগুলো বাংলাদেশ পাচ্ছে না। আমাদের মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে ভারত নিজস্ব স্বার্থ দেখেই চলছে এবং তাদের জাতীয় স্বার্থে তারা যেটা মনে করছে তারা তাই করছে। তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তারা সেভাবে কার্ড প্লে করছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও তারা সেভাবেই আছে। পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও কি এ কথা বলা যায়-ভারত নিজেদের প্রয়োজনেই দেশে রাজনীতি করবে এটা সত্য। কিন্তু তাদের মনে রাখা দরকারÑ শুধু পেঁয়াজের ইস্যুতে বাংলাদেশে ভারতের মনমর্জি নিয়ে যে ধরনের রাজনীতি হয়, জনসমালোচনা, তা ভারতবিরোধি মনোভাবকে উস্কে দিতে সহায়তা করে।
বেশিদিন হয়নি- ভারতের পণ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে ত্রিপুরায় মালামাল পাঠিয়েছে। এটাও পারস্পরিক সম্পর্ক ও চুক্তির কারণেই। এক সময় এসব ব্যাপারে দেশে অনেক হুজুগ-গুজব সৃষ্টি হত। কিন্তু বাংলাদেশে এখন এটা হয় না। কারণ আওয়ামী লীগ সরকার শুধু ভারত কাগজে পত্রে নানা চুক্তি করেছে তা নয়, এর বাইরেও ভারতের ক্ষেত্রে জনগণের মানসিক পরিবর্তনে সহায়তা করেছে। যা ভারতের সঙ্গে কাগজপত্রের চুক্তিতে নেই। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ভারত বিরোধিতার এই জায়গায় বিরাট পরিবর্তন সূচিত করেছে বাংলাদেশ সরকার। এই সফলতা ধরে রাখার দায়িত্ব শুধু একা বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারের নয়, ভারতের সরকারের কাছ থেকেও সহযোগিতা আসতে হবে। পেঁয়াজের মাধ্যমেও বাংলাদেশের জনগণ এটা আশা করতে পারে। জনগণের সুসম্পর্কের জন্য তো কোনো চুক্তি হতে পারে না। এটা ভারতকে বুঝতে হবে। আর রাজনীতিক বিশ্লেষক আমেনা মহসিনের কথায়- ভারত যদি বাংলাদেশের কাছে যা চেয়েছিল তা পেয়েই থাকে, তাহলে- এটাও ভারতের ভিন্ন দৃষ্টিতে স্মরণ রাখা দরকার। চুক্তির কথা বলা হয় – তিস্তা, ফারাক্কা, গঙ্গার ব্যাপারে ভারত বাংলাদেশের কোনো প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
কথা যা হলো- তা সৌহাদ্য ও সুসম্পর্কের কথা। প্রতিবেশি দেশ হিসাবে আবদারও বলা যায়। বাস্তবে ভারত পেঁয়াজ দিতে অক্ষম হলে কিছু করার নেই। ভারত বাংলাদেশকে পেঁয়াজ দিতে বাধ্য নয়। এটা এদেশের জনগণকে মনে রাখা দরকার। পেঁয়াজের মত একটা সামান্য বিষয় নিয়ে আমরা যে পরিমাণ মাতামাতি করি তা পরনির্ভরতার প্রকৃষ্ট একটা প্রমাণ। শুধু পেঁয়াজের জন্যই ভারতের সমালোচনাÑ নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশ সরকারের জন্য অস্বস্তি তৈরি করি। কেন করি- বরং আমরা আমাদের প্রকৃত স্বার্থের ব্যাপারে দাবিদাওয়া তুলতে পারি। সরকারের মাধ্যমে। তাতে আমাদের নাগরিক সম্মান বাড়বে। সুজন ও সজ্জন নাগরিক দেশের দেশেরও গৌরব। তাই আমাদের দরকার হয়তো পেঁয়াজ উৎপাদন করা, না হলে অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা। আর বাংলাদেশের অবৈধ মুনাফা অর্জনকারী ব্যবসায়ীদের লাগাম টানতে যথাসম্ভব পেঁয়াজের ব্যবহার কমানো। পেঁয়াজ এমন নয় যে ডায়রিয়ার ওরস্যালাইনের মত, যা না খেলে ডায়ারিয়া রোগী হয়ে কেউ মারা যাবে। আর শুধু ভারতের দিকে তাকালে হবে না, আমাদের যে ব্যবসায়ীরা আছেন, পেঁয়াজ ব্যবসার মত মজুদদারি ব্যবসা করে, তাদের দিকে তাকাতে হবে। তাদের চরিত্রচিত্রণ করতে হবে। এসব মুখপোড়া ফড়িয়াগোষ্ঠির কথা এই পর্বে নাই বা হলো।

লেখক : সাংবাদিক