তথ্য নেই প্রশাসনের কাছে, অভিযান জোরদারের দাবি সংশ্লিষ্টদের

14

জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ওষুধের দাম বাড়াতে লাগে না কারণ। এ জন্যে কোনো কারণ ছাড়াই ওষুধের দাম সারা বছর ধরে বাড়ে। অসাধু ব্যবসায়ী ও ফার্মেসি মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ওষুধের বাজার। বিধি অনুযায়ী দাম বাড়ানোর বিষয়টি ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে জানানোর কথা থাকলেও কোনো ওষুধের দাম বেড়েছে কিনা এমন তথ্য নেই প্রশাসনের কাছেও। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষ ওষুধ কিনতে প্রতিনিয়তই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আর যারা প্রতিনিয়ত এসব ওষুধ সেবন করেন, তারা পড়েছেন বিপাকে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট, র‌্যাব ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করার দাবি জানান সংশ্লিষ্টরা।
ওষুধ সংশ্লিষ্টরা জানান, ওষুধের প্রতি স্ট্রিপ বা পাতায় মূল্য উল্লেখের বিষয়টি আমলে নিতে হবে। ওষুধ নীতিমালা ১৯৮২ এর আলোকে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ সরকারের হাতে থাকলে কোম্পানি এবং রোগী সবার জন্যই ভালো হতো। ঔষুধের মূল্য নির্ধারণে সরকারের কোনো ভ‚মিকা না থাকায় কারণ ছাড়া ওষুধের দাম বাড়তে থাকে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে সর্বমোট ২৬৯ অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ২৪ হাজার রকমের ওষুধ তৈরি করে। আর সরকারিভাবে উৎপাদিত হয় ১১৭ ধরনের ওষুধ, যার দাম নির্ধারণ করে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। বেসরকারি কোম্পানিগুলো নিজেদের চাহিদা মতো ওষুধের দাম বৃদ্ধির অনুমতি নিয়ে রাখে। সুবিধা মতো সময়ে তারা বাজারে বাড়তি দামে ওষুধ ছাড়ে।
ভোক্তারা জানান, ওষুধের প্রতিটি পাতায় দাম উল্লেখ না থাকার কারণে ওষুধ ব্যবসায়ী এবং ফার্মেসিগুলো অতিরিক্ত দাম নিয়ে মানুষের পকেট কাটছে। কিছু ওষুধের দোকান বাড়তি টাকা আদায়ের কারণে দন্ডপ্রাপ্ত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতারণা চলছে। সাধারণত ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের পাতায় সেগুলোর মূল্য মুদ্রিত থাকে না বলে দোকানদারদের মুখের কথার ওপর নির্ভর করেই ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে। প্যাকেটের গায়ে মোট মূল্য লেখা থাকলেও খুচরা ওষুধ কেনার সময় ওষুধের প্যাকেট দোকানদারের কাছ থেকে নিয়ে মোট মূল্য দেখে সেটাকে ভাগ করে প্রতি পাতার মূল্য বের করে ওষুধ কেনা দুরূহ ব্যাপার। তাছাড়া গ্রামের অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত মানুষ এতকিছু ঘেঁটেও দেখেন না। এমনকি মফস্বল বা শহরের শিক্ষিতরা এ নিয়ে মাথাও ঘামায় না। আর এই সুযোগে ওষুধের মূল্য নিয়ে প্রতারণা করছে এক শ্রেণির বিক্রেতা।
সরেজমিনে নগরীর বৃহত্তম ওষুধের পাইকারি বাজার হাজারী গলি ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারিতে কিছু কিছু ওষুধের দাম ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। আর কিছু ওষুধের দাম ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। প্রয়োজনীয় অনেকগুলো ওষুধ ফার্মেসিতে মিলছে না। আগে একপাতা ফেক্সো ট্যাবলেট বিক্রি হতো ৭০ টাকা, বর্তমানে ৭২ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এনবি ট্যাবলেট একপাতা আগে ৮০০ টাকা বিক্রি হলে বর্তমানে ৯৫০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। ক্লিনক্সে বিজেল আগে ১৩০ টাকা বিক্রি হতো, যা বর্তমানে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এরকম এমএস ট্যাবলেট, শিশু ও অ্যাজমা রোগীদের ওষুধ ছাড়াও নোসপা, এভোমিন, তুসকফ, মেলটিকস, নাফগাল ক্রীম, পোপানেন্ট জেল এবং সুপার সিলভার ইত্যাদির দাম বেড়েছে।
কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে প্রায় সময় ওষুধের দাম বাড়ানো হয় জানিয়ে ওষুধ ব্যবসায়ীরা বলেন, কোম্পানির কারসাজির কারণে ওষুধের দাম বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণের আগে কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
নগরীর ওষুধের পাইকারি বাজার হাজারী গলিতে ওষুধের মূল্য নিয়ে চলছে নৈরাজ্য। এখানকার প্রায় ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন সময় জরিমানা করা হয়েছে।
ওষুধ কিনতে আসা সুতা ব্যবসায়ী হাজী আজিজ জানান, একেক দোকানে ওষুধের দাম একেক রকম। যে যেভাবে পারছে ক্রেতার কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা কাগজের মোড়কে করে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দিয়ে দিচ্ছে।
খুচরা ওষুধ বিক্রেতারা বলেন, ওষুধ কোম্পানিগুলো ওষুধের দাম বাড়ালে কখনোই জানায় না যে, ওষুধের দাম বাড়ছে। অধিকাংশ সময়ই ওষুধের মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে দেখা যায় বেশি দামেই ওষুধ কিনতে হচ্ছে অথচ বিক্রি করা হয়েছে আগের দামেই। এতে ক্ষতি হয় খুচরা বিক্রেতাদের।
চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হোসাইন মোহাম্মদ ইমরান বলেন, ওষুধের দাম বেড়েছে এমন কোন তথ্য আমাদের জানা নেই। যদি কেউ এমআরপি’র বেশি দাম নিয়ে থাকে, প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি বলেন, বাজার তদারকিতে আমাদের অভিযান সব সময় অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহে হাজারী গলিতে অভিযান চালিয়ে বিদেশি ওষুধ, সাপ্লিমেন্ট ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উদ্ধার করা হয়। এসময় তিনটি দোকানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান জানান, প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন স্থানে বাজার তদারকিমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। জনস্বার্থে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।