ডুলাহাজারা সংরক্ষিত বনে ৫ শতাধিক অবৈধ বসতি

ইকবাল ফারুক, চকরিয়া

9

কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের অধীন চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা বনবিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধ বসতি গড়ে উঠছে। গত দুই বছরে এ বনবিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাঁচ শতাধিক অবৈধ বসতি নির্মিত হয়েছে। এসব জায়গায় কলোনি নির্মাণ করে ঘর ভাড়াও দিচ্ছেন অবৈধ দখলদারারা। এর ফলে একদিকে যেমন বনবিভাগের জায়গা বেহাত হচ্ছে তেমনি অন্যদিকে বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ডুলাহাজারা বনবিটের বিট কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় এবং ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তার সম্মতিতেই এসব বসতি গড়ে উঠছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পশ্চিম পার্শ্বে ডুলাহাজারা বনবিটের অধীন মালুমঘাট সংরক্ষিত বনাঞ্চল এলাকায় তিন শতাধিক অবৈধ বসতি নিয়ে গড়ে উঠেছে হাসিনাপাড়া নামের একটি গ্রাম। গ্রামটিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি মসজিদ। তার সামান্য পশ্চিমে গিয়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ বসতি। গত এক বছরের মধ্যেই গড়ে উঠেছে এসব বসতি। বনবিভাগের লোকজন কয়েকবার লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালায়। তারপরও বন্ধ হয়নি এসব বসতি নির্মাণের কাজ।
হাসিনাপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল হক বলেন, গত ৮ মাস পূর্বে মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি থেকে এসে তিনি একটি বসতবাড়ি তৈরি করেছেন। মাটি ও পলিথিনের ছাউনি দিয়ে বসতঘরটি তৈরি করতে স্থানীয় বনবিট কর্মকর্তা ও অপর দুইজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে মোটা অংকের টাকা দিতে হয়েছে। তবে কার হাতে টাকা দিয়েছেন তা বলতে রাজি হননি তিনি।
নুরুল হকের পাশের বাড়ির বাসিন্দা মো. ফোরকান। তিনি স্থানীয় যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা। তার বাড়িটি সেমিপাকা। বন বিভাগের লোকজন হাসিনাপাড়া এলাকায় বিভিন্ন সময় কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযান চালালেও যুবলীগ নেতার বাড়ি ভাঙ্গার সাহস দেখাননি। তবে যুবলীগ নেতা ফোরকান বলেন, আমার ঘরটি অনেক দিনের পুরোনো। শুধু আমি কেনো আমার পরেও অনেকে হাসিনাপাড়া এলাকায় বসতঘর নির্মাণ করেছেন। এছাড়া যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আব্দুল গণি (৩৫) সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জায়গা দখল করে কলোনী ও দোকানঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। তবে আব্দুল গনি দাবি করেন, তার জায়গাটি অনেক আগে থেকেই তার দখলে রয়েছে। স¤প্রতি সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করেছেন তিনি। ঘর নির্মাণের সময় বনবিভাগের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাঁধা দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।
এভাবে হাসিনা পাড়া এলাকাটিতে পর্যায়ক্রমে নির্মিত হয়েছে অবৈধ তিন শতাধিক বসতি। এছাড়া হাসিনাপাড়া ছাড়াও মালুমঘাট ফিশারিঘাট এলাকা এবং আগরবাগান, চা-বাগান, উত্তর পাড়া, পূর্ব ডুমখালী, মিঠাছড়ি, রিজার্ভ পাড়া, পূর্ব পাড়া, রং মহল, অলি বাপের জুম, নার্সারি পাড়া এলাকাতেও গত দুই বছরে আরও অন্তত দুই শতাধিক নতুন অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। এসব অবৈধ বসতি নির্মাণের সময় ডুলাহাজারা বনবিটের বর্তমান বিট কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ও তার আগের বিট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে টাকা আদায় করেছেন ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মতিন।
ডুলাহাজারা বনবিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধ বসতি নির্মাণ করা বেশ কয়েকজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে বাড়ি নির্মাণ করতে রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মতিনকে বসতিপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। কেউ টাকা না দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করলে তা ভেঙ্গে দেওয়া হয়।
ডুলাহাজারা কলেজের অধ্যক্ষ ও ফাঁসিয়াখালী সহব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বনবিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে যারা বসতি গড়ে তুলেছেন নিশ্চয় তাদের সাথে বনকর্মকর্তাদের ‘গোপন সমঝোতা’ রয়েছে। নইলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এতো ঘর উঠার কথা নয়। বনবিভাগের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোন অভিযান না থাকায় বনভ‚মি দখলের পর ভ‚মিদস্যুরা বেপরোয়া হয়ে পাকা বাড়িও নির্মাণ করেছেন। ফলে বন বিভাগের জায়গা দিনদিন যেমন বেদখল হচ্ছে তেমনি মাদার ট্রিসহ ছোটবড় বৃক্ষ নিধনের কবলে পড়ে বৃক্ষশূন্য হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলটি।
ডুলাহাজারা বনবিটের বিট কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ডুলাহাজার বনবিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নতুন করে কোন বাড়ি নির্মিত হয়নি। যেসব বাড়ি গড়ে উঠেছে সেগুলো অনেক আগের। সংরক্ষিত বনে নতুন করে কোন বাড়ি নির্মিত হয়নি এবং কোন টাকাও নেওয়া হয়নি। তার কাছে কি পরিমাণ বনভ‚মি বেদখল হয়েছে জানতে চাইলে তিনি অফিসে চায়ের দাওয়াত দিয়ে মুঠোফোনের লাইন কেটে দেন।
এ ব্যাপারে ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মতিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি ‘আমি বিভাগীয় অফিসে ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব’ বলে ফোন কেটে দেন।
ডুলাহাজারা বন বিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নতুন করে কোন বাড়ি নির্মিত হয়নি এমন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (ডিএফও) হক মাহবুব মোরশেদ বলেন, ওখানে যেসব বসতি রয়েছে তা অনেক পুরোনো। এছাড়া সম্প্রতি আগর বাগান এলাকায় তার নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বেশকিছু বসতি উচ্ছেদ ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।