ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস

28

আগে বলা হতো ‘যার হয় যক্ষা, তার ‘নাই’ রক্ষা’; কিন্তু এখন অবস্থা ভিন্ন। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি, রোগ নির্ণয়ে উন্নত প্রযুক্তি আর দেশীয় চিকিৎসকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে যক্ষা এখন অনেকটা নিরাময়যোগ্য রোগ। তবে এ রোগের প্রাদুর্ভাব কিন্তু এদেশে কমছে না যদিও উন্নত বিশ্বে যক্ষা হয় না বললেই চলে। তাহলে আমাদের দেশে যক্ষার প্রবণতা বেশি কেন?
কেইস স্টাডি এক : মিস ফারহানা, বয়স ২২। একজন গ্রাম থেকে আসা গার্মেন্টস কর্মি। থাকে এক রুমের একটা বাসাতে সঙ্গী আরো তিন জন। তার কাশি এক মাস ধরে, ইদানিং কাশির সাথে কফ যাচ্ছে আর বিকালের দিকে গায়ে ঘুসঘুসে জ্বর আসে। শরীর দুর্বল আর খাওয়া-দাওয়াতে অরুচি। ফার্মেসি থেকে কিছুদিন ওষুধ খেয়েছে কিন্ত কাজ হচ্ছে না তাই এবার গার্মেন্টস থেকে ছুটি নিয়ে এসেছে হাসপাতালে। ডক্তার তাকে রক্ত, কফ পরীক্ষা আর এক্স-রে করতে বলেছে।কেইস স্টাডি দুই : মি. অরুণ, বয়স ৩৩; একজন অফিস সহকারী। তার বামপাশের গলাতে কয়েকটা গোটার মত দেখা দিচ্ছে গত ১৫-২০ দিন ধরে। গোটাগুলো নরম, ব্যথা নাই আর কয়েকটা এক সাথে যেন লেগে আছে। কয়েকদিন ধরে জ্বরজ্বর ভাব আর দুর্বলতা। ডাক্তার প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা- নিরীক্ষা দিয়েছে আর পরে বলল তাকে গোটা থেকে রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। সে একটু ভয় পেয়েছে; কি না কি হল আবার।
আলোচনা : য²া মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি অতি প্রাচীন রোগ, মিশরের মমীর দেহে যক্ষা রোগের জীবানু পাওয়া গেছে। মাইকোব্যাক্টেরিয়াম নামক জিবানু গ্রæপেরদ্বারা এই রোগ হয় আর এর মধ্যে মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকুলোসিস হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সারা পৃথিবীর দুই বিলিয়ন বা তিন ভাগের একভাগ লোক যক্ষার জীবানুতে আক্রান্ত আর প্রতি বছর ১.৮ মিলিয়ন বা আঠার লক্ষ লোক এই রোগে মারা যায়। আশ্চর্যের বিষয় হল এই মৃত্যুর ৯৮% ঘটে অনুন্নত বিশ্বের দেশগুলিতে আর এর বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়ষ্ক অথবা মধ্যবয়সি উপার্জনশীল নরনারী।
সা¤প্রতিক তথ্যনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি লাখে ৪০৪ জন যক্ষা রোগী আছে আর প্রতিবছর লাখে ২২৫ জন নতুন রোগী যুক্ত হয়।যক্ষা রোগকে চিকিৎসা আর রোগ নির্ণয়ের সুবিধার্থে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ফুসফুসীয় যক্ষা আর ফুসফুস বহির্ভুত যক্ষা। তবে আমাদের দেশে ৮০% যক্ষাই ফুসফুসীয়। এরূপ য²াতে দুই/তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, অল্প জ্বর যা সাধারণত বিকালে বা সন্ধ্যাতে আসে আর দুর্বলতা আর ক্ষুধামন্দা থাকে। কাশি দিয়ে কফ যেতে পারে আবার নাও যেতে পারে। কখনো কখনো কাশি দিয়ে রক্ত যেতে পারে। কফ পরীক্ষা, এক্স-রে আর রক্ত পরীক্ষা করে য²ারোগ নিশ্চিত করা হয়। বর্তমানে জিন এক্সপার্ট নামক আধুনিক পরীক্ষা ফুসফুসের যক্ষা নির্ণয় অনেক সহজ করে দিয়েছে। কফ পরীক্ষা আর জিন এক্সপার্ট পরীক্ষা সরকারিভাবে ফ্রি করা যায়।
ফুস ফুস বহির্ভুত যক্ষাতে রোগীরা একটু বেশি কষ্ট পায়। দেহের প্রায় প্রতিটা স্থানে এইরূপ য²া হতে পারে। তবে লীম্ফ গ্রন্থি, ফুসফসের পর্দা, মেরুদন্ড, অন্ত্র আর মস্তিষ্কের পর্দাতে এরূপ যক্ষার হার একটু বেশি। এটা নির্ণয় করতে দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আর উন্নত প্রযুক্তির রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা দরকার।
তবে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আর শহর এলাকার বেশরকারি ল্যাবে ফুসফুস বহিঃর্ভুত যক্ষা নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা সম্ভবযক্ষা রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা একটু জটিল আর সময় স্বাপেক্ষ। চার বা ততোধিক ওষুধ দিয়ে এর চিকিৎসা শুরু করা হয়। সরকারি হাসপাতাল, হেলথ কমপ্লেক্স, বেসরকারি হাসপাতাল যেখানে ডট’স কর্নার আছে সেখান থেকে বিনামূল্য ওষুধ সরবরাহ করা হয়। যক্ষারোগের ওষুধগুলির অনেক ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে এবং তা মাথায় রেখেই ওষুধ খেতে হয়। সর্বনিম্ন ছয়মাস, আট মাস, এক বছর এমন কি স্থান ভেদে দুই বছর এই ওষুধ খেতে হতে পারে।ফিরে দেখা : প্রথম রোগীর ফুসফুসীয় যক্ষা হয়েছে। জনাকীর্ণ স্থানে কাজ করা, এক সাথে গাদাগাদী করে থাকা- এরূপ জীবনযাপন প্রণালী য²ারোগের সহায়ক। দুই-তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, বিকেল বেলার ঘুসঘুসে জ্বর, শরীরে দুর্বলতা আর খাওয়াতে অরুচি য²ারোগের লক্ষণ। রক্ত, কফ আর এক্স-রে প্রয়োজনে কফের জিন-এক্সপার্ট পরীক্ষা এই রোগীর জন্য করতে হবে। ফুসফুসে জীবানু পাওয়া না গেলেও অথবা জিন এক্সপার্ট পজিটিব নয়া হলেও, চিকিসক যদি এক্স-রে দেখে মনে করেন এটা য²া তাহলে ওষুধ শুরু করতে হবে। আর কফ পরীক্ষায় জীবানু পাওয়া গেলে আর/অথবা জিন এক্সপার্ট পজিটিব হলে য²া তো নিশ্চিতই হলো। এ ধরণের রোগীকে ছয়মাস ওষুধ খেতে হয়। যক্ষার ওষুধ নিকটবর্তি সরকারি হাসপাতাল বা ব্র্যাক পরিচালিত ডট’স কর্নার থেকে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়।দ্বিতীয় রোগীর ফুসফুস বহির্ভুত যক্ষা হবার সম্ভাবনা। তার লীম্ফ গ্রন্তি থেকে এফ এনএসি নামক পরীক্ষণ পদ্ধতি দ্বারা কোষযুক্ত রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। প্যাথলজিস্ট লীম্ফ গ্রন্থির যক্ষার নিশ্চিত রিপোর্ট দিলে তাকেও য²ার ওষুধ থেতে হবে। তবে তাকে কমপক্ষে ছয় মাস থেকে এক বছরেরও অধিক সময় ধরে ওষুধ খেতে হতে পারে এবং সময়টা বিষেশজ্ঞ চিকিৎসক ওষুধের রেসপন্স আর লীম্ফ গ্রন্থির অবস্থা দেখে নির্ধারণ করবেন। লীম্ফ গ্রন্থির ক্যান্সার যেমন লিম্ফোমা কখনো কখনো লীম্ফ গ্রন্থির য²ার সাথে রোগ নির্ণয়ে সংসয় তৈরি করে।
ফুসফুস বহির্ভুত য²া যেমন লীম্ফ গ্রন্থির য²া, মেরুদÐের য²া বা অন্য যেকোন স্থানের য²াতে রোগীরা অনেক কষ্ট পায় তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা ওষুধে নিরাময়যোগ্য। ফুসফুস বহির্ভুত য²া কেন হয় বা কাদের হয় তার কোন নির্দিষ্ট কারণ নেই তবে আমাদের জীবনধারণ প্রণালী আর ফুসফুসীয় য²ার উচ্চ হার এর জন্য দায়ী বলে ধারণা করা হয়।যক্ষারোগের চিকিৎসায় মনে রাখতে হবে অবশ্যই ছয়মাস বা রোগ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত ওষুধ খেতে হবে। তা-নাহলে ওষুধ প্রতিরোধী জীবানু তৈরি হয় আর য²ার এরূপ ওষুধ প্রতিরোধী জীবানু থেকে পরিত্রাণ পাওয়া খুবই ব্যায়বহুল, সময় সাপেক্ষ আর কষ্টসাধ্য।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ