ডায়রির শেষপাতা

আব্দুস সালাম

54

নওফার বাবা বছর পাঁচেক আগে মেহেরপুরে বদলি হয়ে আসেন। রবিন স্যারের বাড়িতে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে নওফার সঙ্গে জীবনের পরিচয় হয়। নওফা তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত আর জীবন পড়ত দশম শ্রেণিতে। তাদের বাসাও ছিল একই পাড়াতে। নওফা দেখতে শ্যামলা হলেও তার ছিল নজর কাড়া রূপ। সুকেশা, সুদন্তী, লজ্জাবতী, লাস্যময়ী এরকম নানান গুণে তাকে গুণান্বিত করা যেত তাকে। স্যারের বাসাতে তারা প্রায়ই একসাথে পড়তে যেত এবং পড়া শেষে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরত। এসএসসি পরীক্ষার আগ পর্যন্ত জীবন রবিন স্যারের পড়ত। এসএসসি পাশের পর সে মেহেরপুর সরকারী কলেজে ভর্তি হয়। ওদিকে নওফার হাতে-পায়েও ছিল শাসনের বেড়ি। তাই দু’জনার সঙ্গে আগের মতো আর দেখা হতো না বললেই চলে। তবে জীবনের মনটা সবসময় পড়ে থাকত রবিন স্যারের বাড়িতে। যদি কখনও নওফার সঙ্গে জীবনের দেখা হতো তাহলে তার সারাদিনটা খুব ভালোভাবে কেটে যেত। আর ভালোলাগার রেশটা সহজে শেষ হতো না। সেই রেশ অনেকদিন ধরে থাকত। নওফাও যে জীবনের জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষার প্রহর গুনতো তা তার আচার আচারণে প্রকাশ পেত।
এসএসসি পাশের পর নওফাও মেহেরপুর সরকারী কলেজে ভর্তি হয়। তখন জীবন পড়ত অনার্স ফার্স্ট এয়ারে। বিভিন্ন কারণেই তাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ একটু বেশি বেশিই হতো। নওফার মনটাও সবসময় কলেজে পড়ে থাকত। কলেজ ছুটি থাকলে তার একদম ভালো লাগত না। কলেজটা তার কাছে এত প্রিয় কেন? এরকম প্রশ্ন সে মনের কাছে যতবার করেছে ততবারই ছোট্ট একটাই উত্তর পেয়েছে। আর তা হলো জীবন। জীবনের সাথে তার জীবন যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ওদিকে জীবন তার হৃদয়ে একজনকেই ঠাঁই দিয়েছে। সে হলো নওফা। নওফার কালো দুটি আঁখি যেন প্রশান্তির সাগর। যার প্রতি দৃষ্টি গেলেই জীবনের ক্লান্ত হৃদয়ে শক্তি ফিরে আসে। ফিরে আসে প্রশান্তি। তার সুরেলা কণ্ঠ জীবনের কাছে সুধার মতো মনে হয়। সে চায় ভালোবাসার চাদরে নওফাকে সবসময় আগলে রাখতে। তার খুব ইচ্ছা করে নওফাকে বলবে আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু সে মুখে তা বলতে পারত না। অনুরূপ ইচ্ছা নওফারও করত। সেও মুখে বলতে পারত না। এভাবেই তাদের ইচ্ছাগুলো নদীর ঢেউয়ের মতো কোথায় যেন হারিয়ে যেত।
একদিন কলেজ ক্যাম্পাসে জীবন বড় শিশুগাছটির নিচে নওফাকে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। দুনিয়ার সকল বিষন্নতা যেন তাকে গ্রাস করেছে। ধীর পায়ে সে নওফার দিকে এগিয়ে যায়। সেদিন আর জীবনকে দেখে নওফা আগের মতো খুশি হয় না। তাই জীবনের মনটাও হাঠাৎ একটা দমকা হওয়ায় হোঁচট খায়। ‘কী হয়েছে? মন খারাপ কেন?’ জীবন জানতে চায়। কিন্তু নওফা উত্তর দেয় না। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে জীবনের দুই চোখের দিকে অপলকে চেয়ে থাকে। নওফা তার চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করে। চোখের সে ভাষাও যেন কুহেলিকায় আবৃত। পুনরায় জীবন প্রশ্ন করলে সে বলে : তুমি ঠিকই বলেছ। মনটা আমার ভীষণ খারাপ।
: কেন?
: আমার বাবার রংপুরে বদলির অর্ডার হয়েছে? খুব শ্রীঘ্রই যেতে হবে।
: বল কী ! তাহলে কি আমাদের আর দেখা হবে না?
নওফা মনে মনে ভাবে এখনই সুযোগ পাল্টা প্রশ্ন করে তার মনের কথাটি জেনে নেওয়া। তাই সে বলে, কী হবে দেখা করে? দেখা তো অনেক দিনই হলো। আর কত? জীবনের বুকটা মৃদু কেঁপে ওঠে। ভালোবাসি কথাটি বলতে গিয়েও বলতে পারে না। কণ্ঠনালিতে আটকিয়ে যায়। মনের কথাটা শেষপর্যন্ত তার আর বলা হলো না। সে মনে মনে ভাবে এ প্রশ্নের উত্তরটা সে মুখে না বলে লিখেই জানাবে। তাই সে উত্তর দিল, “সে কথা না হয় আর একদিন বলা যাবে।” এভাবে আরও কয়েকটি দিন কেটে গেল। বিদায়ের একদিন আগে জীবন নওফার সঙ্গে দেখা করে। সে তাকে নববর্ষের একটা নতুন ডায়রি উপহার দেয়। ডায়রিটার শেষের একটি পাতায় নওফার প্রশ্নের উত্তরটি হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা মিশ্রিত ভাষায় অতিযত্নে লিখে রাখে। রংপুরে যাওয়ার পর নওফা একটি কলেজে ভর্তি হয়। আগের মতো তার আর নিয়মিত ডায়রি লেখা হয় না। তাই জীবনের দেওয়া উপহারটি নওফা খুব যত্ন করে রেখে দেয়। ডায়রির প্রতিটি পাতা তার আর উল্টানো হয় না। তবে যখন কিছু লিখতে ইচ্ছা হয় তখন সেই প্রিয় ডায়রিতেই লিখে রাখে। জীবনকে নিয়ে দেখা সুখের স্বপ্নগুলো ভোরের শিশিরের মতো কোথায় যেন হারিয়ে যেতে বসে। তবুও সে মন থেকে জীবনকে ভুলতে পারে না। ভুলতে পারে না তাকে নিয়ে মধুর স্মৃতিগুলো। ওদিকে জীবন অপেক্ষা করতে থাকে নওফার উত্তর শোনার জন্য। সে কোন উত্তর পায় না। বিরহ ব্যথা তাকে কুরে কুরে খায়। ভালোবাসার গ্রোত থমকে দাঁড়ায়। ওতে একসময় শ্যাওলা জন্মে। ভালোবাসার মোহনায় মিলিত হওয়ার সাধ অপূর্ণই থেকে যায়। তার বিশ্বাস- নওফা তাকে ভোলেনি। কোন না কোন দিন তার ভালোবাসার কাছে নওফা পরাজিত হবেই।
এভাবেই প্রায় বছর দুয়েক কেটে গেল। বিভিন্ন জায়গা থেকে নওফার বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। তার মা-বাবাও সিদ্ধান্ত নেয় যে, ভালো সম্বন্ধ এলে কন্যাকে বিয়ে দিয়ে দেবন। একদিন ঘটক তার জন্য ভালো একটি বিবাহের সম্বন্ধ নিয়ে আসে। মা-বাবার পছন্দ হয়। তাই মা-বাবার পছন্দকে নওফা অসম্মান করেনি। তার সম্মতি পাওয়ার পরই বিবাহের দিন ধার্য করা হয়। নওফা তার মনের কষ্টগুলো সে ডায়রিতে লিখতে থাকে। ডায়রির সাদা পাতাগুলোও একে একে শেষ হয়ে আসে। বিবাহের দুইদিন আগে ঠিক মধ্যরাতে ডায়রি একটি পাতা উল্টাতেই সে চমকে ওঠে। তার চোখে পড়ে ‘ভালোবাসি তোমাকে। ভীষণ ভালোবাসি। -উত্তরের অপেক্ষায় জীবন।’ লেখাটি। ডায়রিটা বুকের মধ্যে পরম যত্নে জড়িয়ে ধরে বলে, আমি জিতেছি। আমার ভালোবাসা জিতেছে। বিবাহের দিন ধার্য হওয়ার কথাটি মনে পড়তেই সে ডুকরে কেঁদে ওঠে। দহন জ্বালা হু হু করে ওঠে তার প্রতিটি লোহিত কণিকায়। নির্বাক নিস্তব্ধ হয়ে যায় সে। চোখের তপ্ত লোনা জলে ডায়রি শেষ পাতাটি ভিজে যায়।
লেখার প্রতিটি অক্ষর থেকে বেদনার নীল রং ছড়িয়ে পড়ে। তার মনটা ছটফট করতে থাকে জীবনের সঙ্গে কথা বলার জন্য। কিন্তু তার পক্ষে আর সম্ভব হয় না দেখা করা। চাপা কাঁন্নায় তার বুকের বসন ভিজে যায়। একসময় রাত শেষ হয়ে যায় তবুও তার কাঁন্না থামতে চায় না।