ট্রাম্পের জেরুজালেম নীতি ও আমেরিকার বিশ্ব নেতৃত্বের অবসান

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী

47

আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট উইলসন্্্ বলেছিলেন, “ডব রিষষ সবধহ ঃড় ষরাব ড়ঁৎ ড়হি ষরাবং ধং বি রিষষ, নঁঃ বি সবধহ ধষংড় ঃড় ষবঃ ষরাব. ডব ধৎব, রহফববফ, ধ ঃৎঁব ভৎরবহফ ঃড় ধষষ হধঃরড়হং ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ, নবপধঁংব বি ঃযৎবধঃবহ হড়হব, পড়াবঃ ঃযব ঢ়ড়ংংবংংরড়হ ড়ভ হড়হব, ফবংরৎব ঃযব ড়াবৎঃযৎড়ি ড়ভ হড়হব.” অর্থাৎ আমরা আমাদের মতো করে জীবন-যাপন করতে চাই, অন্যকেও বাঁচতে দিতে চাই, আমরা সত্যিকারভাবে বিশে^র সমস্ত জাতির বন্ধু কারণ আমরা কাকেও হুমকি দেই না, কারও সম্পদের প্রতি লোভ করি না এবং কাকেও পদচ্যুত করার ইচ্ছা পোষণ করি না।” এ প্রসঙ্গে আমেরিকার প্রাক্তন পররাষ্ট্র সেক্রেটারি তদানীন্তন বিশে^ আলোড়ন সৃষ্টিকারী, হেনরী কিসিঞ্জারেরও একটি উদ্ধৃতি দিতে চাই। তিনি বলেছিলেন-“অসবৎপধহ ষবধফবৎং যিড় ংযধঢ়বফ ঃযব ঢ়ড়ংঃ ধিৎ ড়িৎষফ বসবৎমবফ ভৎড়স ধহ রহঃবষষবপঃঁধষ ঃৎধফরঃরড়হ ড়ভ বীঃৎধ-ড়ৎফরহধৎু ঈড়যবৎবহপব ধহফ ারঃধষরঃু.” অর্থাৎ “আমেরিকার নেতৃবৃন্দ যাঁরা যুদ্ধোত্তর বিশে^র পুনর্গঠন করেছিলেন, ঐতিহ্যগতভাবে তাঁরা ছিলেন অসাধারণ মেধাবী সুসংহত এবং জীবনীশক্তি সম্পন্ন।”
আমেরিকার গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারের এক পর্যায়ে ২০১৬ এর মার্চ মাসে আমেরিকান ইসরাইলী পাবলিক এফেয়ার্স কমিটির (অওচঅঈ) এক সভায় প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে এক বক্তৃতা করেন, সেখানে বিপুল করতালির মধ্যে তিনি ঘোষণা করেন- “ডব রিষষ সড়াব ঃযব অসবৎরপধহ বসনধংংু ঃড় ঃযব বঃবৎহধষ পধঢ়রঃধষ ড়ভ ঔবরিংয ঢ়বড়ঢ়ষব ঔবৎঁংধষবস.” অর্থাৎ “আমরা আমেরিকার দূতাবাস ইহুদীদের আদি রাজধানী জেরুজালেমে স্থানান্তর করব।” ডোনাল্ড ট্রাম্পের দায়িত্বভার গ্রহণের পর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিহুয়া যুক্তরাষ্ট্রে সফরে যান। উভয়ের উপস্থিতিতে ফেব্রæয়ারি (২০১৭) ১৫ তারিখে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও ট্রাম্প একবারের জন্যও দুই রাষ্ট্রের প্রতি তার সমর্থন জানান নাই।
২০১৭ সালের মে মাসে ট্রাম্প ইসরাইল সফরে যান তখন তিনি অনুসৃত রীতি ভঙ্গ করে জেরুজালেমে যান। যাই হউক, জাল মধ্যস্থতাকারীর মুখোশ উন্মোচন করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ডিসেম্বরের ৬ তারিখে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। দীর্ঘকাল ধরে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেটিক উভয় পার্টির ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টরা ফিলিস্তিনি সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থকারী হিসেবে অভিনয় করেছেন। তাদের মুখোশ ডোনাল্ড ট্রাম্প খুলে দিয়েছেন। অন্তত সে কারণে তিনি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। গত কয়েক দশক ধরে ডেমোক্রেটিক এবং রিপাবলিকান পার্টি উভয়ই ক্ষমতাসীন অবস্থায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করেছেন। ফিলিস্তিনিদের বারবার আশ^াস দিয়েছেন এবং ইসরাইলকে অস্ত্রে সুসজ্জিত করেছেন এবং ইসরাইলের সমস্ত অন্যায় কার্যাবলী ধামা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ যে প্রস্তাবের মাধ্যমে ইহুদি রাষ্ট্র গঠন করেছিল তাতে জেরুজালেমকে বাদ রেখে ফিলিস্তিনকে দুইভাগে ভাগ করা হয়। এক ভাগ ইসরাইল আরেক ভাগ ফিলিস্তিন। কিন্তু ১৯৪৮ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধে ইহুদিবাদী সেনারা জেরুজালেমের পশ্চিম অংশ দখল করে নেয়। ১৯৬৭ সালে মিসর, সিরিয়া ও জর্ডানের সঙ্গে ছয় দিনের যুদ্ধে জেরুজালেমের পূর্ব অংশও দখল করে নেয় তখন এটা ছিল জর্ডানের অংশ। ইসরাইল ১৯৬৭ সাল থেকে পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদি বসতি গড়তে শুরু করে। ১৯৮০ সালে ইসরাইল জেরুজালেম আইন পাশ করে জেরুজালেমকেই ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রেজুলেশন ৪৭৮ পাস করে এবং ইসরাইলের আইন বাতিল ঘোষণা করে। এর আগে ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘের ১৮১ নাম্বার প্রস্তাব অনুসারেও জেরুজালেম একটি আন্তর্জাতিক জোন। (ঈড়ৎঢ়ঁং ঝবঢ়ধৎধঃঁস, ঃযধঃ রং, ধ ংবঢ়ধৎধঃব বহঃরঃু ঁহফবৎ রহঃবৎহধঃরড়হধষ লঁৎরংফরপঃরড়হ) এজন্য কোন রাষ্ট্রই ইসরাইলের বেআইনি দখলকৃত এলাকায় নিজের অফিস খুলে বিতর্কিত হওয়ার ঝুঁকি নেয় নাই। কিন্তু আমেরিকাই সর্বপ্রথম জাতিসংঘের এই আইন অমান্য করে। ১৯৯৫ সালে আমেরিকার সংসদের উভয় হাইসে (সিনেট এবং প্রতিনিধি সভা) জেরুজালেম আ্যাম্বেসি অ্যাক্ট ১৯৯৫ নামে একটি আইন পাস করে যা প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর আইনে পরিণত হয়েছিল তবে আমেরিকার সিনেট প্রেসিডেন্টকে একটি সুযোগ দিয়েছিল যে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার কারণে এই আইন প্রেসিডেন্ট ছয় মাসের জন্য স্থগিত করতে পারেন। এইভাবে ছয়মাস করে কেয়ামত পর্যন্ত বাড়ালেও সিনেটের কোন আপত্তি থাকবে না । সে জন্য ১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সময় এই আইন পাশ হওয়া সত্তে¡ও আমেরিকার কোন প্রেসিডেন্ট সে আইন বাস্তবায়িত করবার ঝুঁকি নেন নাই।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ৬ই ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণার পর থেকে ফিলিস্তিনসহ সারা বিশ^ অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। মুসলিম বিশে^ বইছে প্রতিবাদের ঝড়, সৌদি আরব, মিসর, জর্দান এর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পরও সে সব দেশের গণঅভুত্থানের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টির কারণে সে সব দেশের সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এই সিন্ধান্তের জন্য তীব্র নিন্দা জানাতে বাধ্য হয়েছে। চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও নিন্দা জানিয়েছে। ইস্তাম্বুলে গত ১৩ই ডিসেম্বর ও.আই.সির বর্তমান চেয়ারম্যান তুরস্কের প্রসিডেন্টের সভাপতিত্বে ও.আই.সির বর্তমান শীর্ষ সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে সম্মেলনে ও.আই.সির সব সদস্যই (৫৭) যোগদান করেছেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে নি¤œলিখিত প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন। “ডব ৎবপড়মহরুব ঃযব ংঃধঃব ড়ভ চধষবংঃরহব রিঃয ঊধংঃ ঔবৎঁংধষবস ধং রঃং পধঢ়রঃধষ, বি রহারঃব ঃযব ড়িৎষফ ঃড় ৎবপড়মহরুব ঊধংঃ ঔবৎঁংধষবস ধং ঃযব ড়পপঁঢ়রবফ পধঢ়রঃধষ ড়ভ ঃযব ংঃধঃব ড়ভ চধষবংঃরহব.” অর্থাৎ “আমরা পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছি। আমরা সারা বিশ^কেও দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহŸান জানাচ্ছি।” এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো ও.আই.সি. ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যান্য ব্যাপারে মতপার্থক্য থাকা সত্তে¡ও উক্ত প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে।
গত ১৮ই ডিসেম্বর (২০১৭) এই ব্যাপারে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য মিসর একটি প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাবে জেরুজালেমে কূটনৈতিক মিশন স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সুপারিশ করা হয় এবং সেখানে বর্তমানে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক মিশন স্থাপনের সিন্ধান্তের নিন্দা জানানো হয়। আমেরিকার এই সিন্ধান্তকে আন্তর্জাতিক ঐক্যমত এবং আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকী ১৫ জন সদস্য এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট প্রদান করেছেন। আমেরকিার দূত নিকি হেলী এই প্রস্তাবে ভেটো প্রদান করেন এবং বলেন আমেরিকা এই অপমান কোনদিন ভুলবে না। এরপর ২১ ডিসেম্বর ইয়ামেন এবং তুরস্কের অনুরোধে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভা আহŸান করা হয়। এই পরিষদে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করার অনুরোধসহ জেরুজালেমে আমেরিকার দূতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা করা হয়। পরাজয় টের পেয়ে আমেরিকার দূত যে আচরণ করেছেন তা জাতিসংঘের ইতিহাসে কলংকজনক অধ্যায় হিসাবে লেখা থাকবে। তিনি বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব কিছু লক্ষ্য করছেন এবং যারা আমেরিকার বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সাহায্য বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমেরিকার দূতের এই বন্য ব্যবহারে আমেরিকার স্বাধীনতার প্রয়াতঃ স্থপতিরাই বেশি অপমানিত হয়েছেন। যাঁরা মেধা, জ্ঞান এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে আমেরিকাকে মহান করার চেষ্টা করেছেন। যাই হোক- সাধারণ পরিষদে ঐ প্রস্তাব বিপুল ভোটে (১২৮) অনুমোদিত হয়। এই পরিষদে মোট ভোটের সংখ্যা ১৯৩। মাত্র ৯ টি সদস্য প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেন এবং ৩৫ সদস্য ভোট দানে বিরত থাকেন। বাংলাদেশও এই প্রস্তাবের অন্যতম স্বাক্ষরকারী ছিল। এই প্রস্তাব আমেরিকা মানতে বাধ্য না হলেও এই প্রস্তাবের নৈতিক চাপ এত প্রবল ছিল যে বিশে^র পরাশক্তি হিসেবে তার অনিবার্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিহুয়া জাতিসংঘকে মিথ্যার সূতিকাঘর আখ্যা দিয়ে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
যাই হোক- ফিলিস্তিন এবং সারা বিশ^ এখন বুঝতে পেরেছে যে আমেরিকার মধ্যস্ততায় এই সমস্যা সামধান হওয়ার নয়। সবচাইতে এখন প্রয়োজন ফিলিস্তিনের নেতৃত্বে পাথরসম ঐক্যের (জড়পশ ষরশব ঁহরঃু) প্রয়োজন। এবার সারা বিশে^ ফিলিস্তিনের পক্ষে যে সমর্থন এবং জনমত সৃষ্টি হয়েছে তা ধরে রাখার কোন বিকল্প নেই।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট