দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ফিরোজের খোঁজ পায়নি পুলিশ

ট্যাক্সি ও মোবাইলেই ঘুরপাক খাচ্ছে তাসফিয়ার মৃত্যুরহস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

184

স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিনের মৃত্যু নিয়ে কোন প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। একা কেন ট্যাক্সিতে উঠল, কিভাবে পতেঙ্গা গেল, কোথায় কেন পোষাক পাল্টাল-তার জবাব পাওয়া যায়নি। এছাড়া তাকে বহনকারি ট্যাক্সি এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনেরও হদিস মিলেনি। সব মিলিয়ে পুলিশ এখনো অন্ধকারে।
এদিকে মামলার আসামি ফিরোজ সম্পর্কে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সে একজন দুর্ধর্ষ ক্যাডার। একসময়ের এই শিবির ক্যাডার বর্তমানে যুবলীগ ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। তাকেও খুঁজে পায়নি পুলিশ।
জানা যায়, তাসফিয়ার মৃত্যু নিয়ে গোলক ধাঁধায় পড়েছে পুলিশ। কোন ধরনের ক্লু পাচ্ছে না। তবে পুলিশ বেশ ক’টি ইস্যু নিয়ে এগুচ্ছে। কোন কারণে মনোমালিন্য নিয়ে বন্ধু আদনান তার বন্ধুদের দিয়ে খুন করিয়েছে কি-না, অভিমান করে আত্মহত্যা করেছে কি-না অথবা ট্যাক্সি চালক বা তৃতীয় কোন পক্ষ সুযোগ নিয়েছে কিনা; তা রহস্যই থেকে গেছে।
তাসফিয়া এবং আদনান গোলপাহাড় মোড়ে চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে একা ট্যাক্সিতে কেন উঠল
সে একা কেন পতেঙ্গা গেল, তার সাথে আদনান যায়নি কেন-তার জবাবও পাওয়া যায়নি পুলিশের কাছ থেকে। এছাড়া রেস্টুরেন্টে এক ধরনের পোষাক ছিল তাসফিয়ার গায়ে কিন্তু মরদেহে ছিল আরেক ধরনের পোষাক। তাহলে সে মাঝপথে কোথায় কিভাবে পোষাক পাল্টাল, বাসায় যাওয়ার কথা বলে কেন সে পতেঙ্গা গেল-এসব প্রশ্নেরও উত্তর মিলছে না। যে ট্যাক্সিতে করে সে পতেঙ্গা গিয়েছিল সে ট্যাক্সির খোঁজ মিলেনি এখনো।
পুলিশ বলছে, ট্যাক্সিটির খোঁজ পেলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। সে কেন তাকে সেখানে নিয়ে গেল, মাঝপথে কোথায় পোষাক পাল্টাল বা রাস্তায় আর কেউ ট্যাক্সিতে উঠেছিল কিনা এসব বিষয় পরিস্কার হবে।
রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার পর অর্ডার দিয়েও কেন না খেয়ে তারা বের হয়ে গেল-কি নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য, তা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। মনোমালিন্যের কারণেই দু’জন দু’টি ট্যাক্সিতে গেছে কিনা তাও দেখছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনেকে মনে করছেন আদনান সবকিছু ঠিকঠাক করে অপর ট্যাক্সিতে করে চলে যায়, যাতে কেউ টের না পায়। হয়ত সেও পতেঙ্গা যাওয়ার কথা বলেছে তাসফিয়াকে। আলাদা যাওয়ার কথা হয়েছে। সে না গিয়ে বাসায় চলে যায়। তা পূর্বপরিকল্পনাও হতে পারে।
জানা যায়, দু’টি মোটর সাইকেলযোগে চার যুবক তাকে অনুসরণ করছিল। তারাই হয়তো পতেঙ্গা যায় পিছু পিছু। তারাই খুন করতে পারে তাসফিয়াকে। আদনানের হয়ে তারা খুন করতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
সহকারি কমিশনার (কর্ণফুলী জোন) মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে এখনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয়নি। আমরা বিভিন্ন দিক নিয়ে তদন্ত করছি। হত্যা বা আত্মহত্যা কোনটিই বলা যাচ্ছে না। ময়না তদন্ত রিপোর্ট পেলে পরিস্কার হওয়া যাবে।
পুলিশ এখনো পর্যন্ত তাসফিয়াকে বহনকারি ট্যাক্সি ও তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটির সন্ধান পায়নি। সিসিটিভিতে ট্যাক্সির নাম্বার স্পষ্ট না হওয়ায় সেটি চিহ্নিত করতে কষ্ট হচ্ছে বলে জানান পতেঙ্গা থানার ওসি আবুল কাশেম।
এদিকে মামলার এজাহারভুক্ত বাকি ৬ আসামিকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এদের মধ্যে ফিরোজ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। যুবলীগ নামধারি ক্যাডার ফিরোজের নামে ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে ৮টিরও বেশি মামলা রয়েছে।
জানা যায়, ২০১১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে প্রবর্তক মোড়ে শেভরন থেকে সন্ত্রাসীরা ১১ লাখ টাকা লুট করে নেয়। ডাকাতি ঘটনার পরদিন বায়েজিদ থানার কয়লাঘর এলাকা থেকে শিবির ক্যাডার মো. ফিরোজ ও মনিরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ফিরোজের পাঁচলাইশের আস্তানা থেকে ১২ রাউন্ড গুলিভর্তি দুটি বিদেশি পিস্তল, তিনটি গুলিসহ একটি ম্যাগজিন, একটি একনলা বন্দুক, একটি বন্দুকের ব্যারেল, তিনটি কার্তুজ, দুটি চাপাতি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জামিনে বেরিয়ে আসে ফিরোজ। ২০১৩ সালের ১৯ জুলাই রাতে তিন রাউন্ড গুলিভর্তি নাইন এম এম পিস্তলসহ আবারও ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। গত মাসে ফিরোজকে র‌্যাব মুরাদপুর থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাকে পরদিন ছেড়ে দেয়।
তাসফিয়া হত্যা মামলায় ফিরোজের নাম আবারো আলোচনায় উঠে আসে। মামলার প্রধান আসামি আদনান মির্জাকে দিয়ে পরিচালিত ‘রিচ কিডস গ্যাং’ এর মূল হোতা এই ফিরোজ। তাদের মাধ্যমে ফিরোজ বিত্তশালী পরিবারের ছেলে-মেয়েদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, মেয়েদের ফাঁসিয়ে ব্লাকমেইলিং সহ নানা অপরাধ করে আসছে।
এছাড়া ফিরোজ ডাকাতি মামলায় জড়িত। বিগত কয়েক বছর আগে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় সিরিয়াল ঘোষণা দিয়ে লাগাতার ডাকাতির ঘটনায় ফিরোজ নেতৃত্ব দিয়েছিল। এসময় গ্রিল কেটে কমপক্ষে ২০-২৫টি অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার চুরি, সরাসরি ডাকাতি করেছে। চান্দগাঁও থানার ডাকাতি মামলাগুলোতে ফিরোজ আসামি।
সূত্র জানায়, ফিরোজ মূলত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ খানের সহযোগী। সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে কাতারে পালিয়ে যাওয়া সন্ত্রাসী সরোয়ার এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু সে। তার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে বর্তমানে ফিরোজ। ২০১৫ সাল থেকে ফিরোজ যুবলীগের কর্মকান্ডে সক্রিয় হয়।
পুলিশের তথ্য মতে, গত মঙ্গলবার বিকেলে তাসফিয়া নিখোঁজের পর তার মায়ের ফোন পেয়ে আদনান তাদের বাসায় যায়। এ সময় তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন প্রথমে আদনানকে নিয়ে চায়না রেস্টুরেন্টে যান। সেখান থেকে আবারও বাসায় আসেন। সেখানে আদনানকে আটকে রাখেন তিনি। খবর পেয়ে কথিত যুবলীগ নেতা ফিরোজ ও যুবলীগ কর্মী ইকরাম তাসফিয়াদের বাসায় আসে। এ সময় আদনানকে ছেড়ে দিতে সময় বেঁধে দেয় তারা। পরে দুই ঘণ্টার মধ্যে তাসফিয়াকে বাসায় ফেরত দেয়ার কথা বলে আদনানকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায় তারা। এরপর রাতেই তারা লাপাত্তা হয়ে যায়।