রুবি গেট মাইজপাড়া

‘টোকাই শামসু’র ইয়াবা ব্যবসা অপকর্মে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক

47

নগরীর পাঁচলাইশ থানাধীন রুবি গেট মাইজপাড়া (সিডিএ-জে ব্লক) এলাকায় এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন স্থানীয় জনগণ। শামসুল আলম বেপারি ওরফে টোকাই শামসু এলাকায় প্রকাশ্যে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। তার এ মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে শামসু এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে আতংক সৃষ্টি এবং হঠাৎ করে দলবল দিয়ে এলাকায় ‘ঝটিকা হামলা’ চালিয়ে প্রতিবাদকারীদের দোকানপাটে ভাঙচুর চালায়। এলাকায় আরও বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে টোকাই শামসুর নেতৃত্বে।
দীর্ঘদিন এসব অপকর্মের কারণে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেন এলাকাবাসী। মাদক রুখতে প্রশাসনের সহযোগিতার পাশাপাশি নিজস্ব টহল টিমও গঠন করে মহল্লা কমিটি। এতে টোকাই শামসু ক্ষিপ্ত হয়ে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থানকারীদের টার্গেট করে মামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়রা জানান, যশোর থেকে চট্টগ্রাম শহরে টোকাই হিসেবে আসে শামসুল আলম। এক সময় ষোলশহর রেল স্টেশনে সে আশ্রয় নেয়। সেখানেই মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। এলাকার কিছু যুবককে সাথে নিয়ে তার মাদকের ব্যবসার প্রসার ঘটাতে থাকে। তবে এলাকার সচেতন মানুষের নজরে পড়ে যাওয়ায় ষোলশহর থেকে তাকে বিতাড়িত করা হয়। কয়েক বছরের ব্যবধানে সে মাইজপাড়াস্থ সিএন্ডবি কলোনিতে সরকারি জায়গায় ঝুঁপড়ি ঘর গড়ে তুলে আবার মাদকের কারবারে নেমে পড়ে। নিজের পরিবারকে ব্যবহার করে ইয়াবা ব্যবসার বিস্তার শুরু করে। গড়ে তোলে নিজস্ব একটি টিমও। এলাকায় নিয়মিত মোটরসাইকেল নিয়ে টহল ও লোকজনকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তার বাহিনীর সদস্যরা। এরই মধ্যে কয়েকবার ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকসহ গ্রেপ্তার হয় টোকাই শামসু। কিছুদিন জেলে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে আবার মাদকের কারবারে জড়িয়ে পড়ে সে। এদিকে মাদকের থাবা থেকে নিজেদের পরিবার ও সমাজকে রক্ষা করতে উদ্যোগী হয় মহল্লা কমিটি। পালাক্রমে মহল্লা পাহারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে শামসুর মাদকের ব্যবসায় কিছুটা ভাটা পড়ে। এ অবস্থায় মাদক ব্যবসা সচল রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা নেয় শামসু। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হুমকি, ভয়ভীতি ও হয়রানিমূলক নানা মামলা দেওয়া শুরু করে। এসব মামলার বাদি ও সাক্ষী সবাই শামসুর নিজস্ব ও পরিবারের লোক। অন্তত ডজন খানেক এমন মামলা রয়েছে থানায়। এসব মামলায় এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। তাছাড়া শামসুর বাহিনীর লোকজন এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। হঠাৎ করেই তার লোকজন এসে দোকানপাট ভাঙচুর চালিয়ে পালিয়ে যায়। এতে পুরো এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে মহল্লা কমিটির সভাপতি হাজী সিদ্দিক আহমদ কোম্পানি পূর্বদেশকে বলেন, ‘টোকাই শামসু পুলিশের চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ী। ইয়াবা ছড়িয়ে দিয়ে সে পুরো এলাকার যুব সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এলাকাবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিই। এলাকায় রাতে পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করি। এ অবস্থায় শামসু এলাকায় অস্ত্রের মহড়া দেওয়া শুরু করে। তার লোকজন আমাদের বিভিন্নজনকে হুমকি দেয়, হামলা করে। এলাকার লোকজনের নামে ভুয়া মামলা দেওয়া শুরু করেছে। এসব মামলায় তার পরিবারের লোকজনই বাদি ও সাক্ষী।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিউদ্দিন মাহমুদ বলেন, শামসুকে আমি মাদকসহ পতেঙ্গা থেকে গ্রেপ্তার করেছিলাম। সে কেমন লোক এটা আমার জানা আছে। জামিনে বেরিয়ে সে আবার বিভিন্ন অপরাধ করছে। জামিন নেয় নাই, এমন আরো একটা মামলা আছে। এলাকার লোকজনকে আমরা বলেছি, তাকে আটক করার জন্য। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করতেছি। আশা করছি, দ্রæত সময়ের মধ্যে একটা ব্যবস্থায় যেতে পারবো।
শামসুর পরিবারের পক্ষ থেকে এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক বিভিন্ন মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সে যে কত খারাপ লোক সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এলাকার পুরো মানুষ তার বিরুদ্ধে সোচ্চার। সে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেয়, এটা তো আর নিষেধ করা যাবে না। এ বিষয়ে আমরা অবগত। এলাকার লোকজনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, মামলা হচ্ছে সেগুলো নিয়ে এলাকাবাসী কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হবেন না। বিষযটি আমাদের ভালোভাবেই জানা আছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্থানীয় শুলকবহর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মোরশেদ আলম বলেন, এলাকাবাসী প্রতিনিয়ত ইয়াবা শামসুর বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ করছেন। কয়েক হাজার পরিবারকে জিম্মি করার জন্য সে বিভিন্ন ধরনের হামলা, মামলা করছে। এলাকাবাসী তার ইয়াবা ব্যবসার বিরুদ্ধে, অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, আমরা এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে মাদক প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ কারণে শামসু এলাকার নিরীহ মানুষজনকে হয়রানি করছে, মিথ্যা মামলা দিচ্ছে, গভীর রাতে এলাকায় হামলা করছে। আমাদের মহিলা কাউন্সিলর একটি সভায় মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলায় শামসু তাকে হত্যার হুমকিও দিয়েছিল। মেয়র মহোদয়সহ প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমার এলাকার কোথাও মাদকের কারবার চলতে দেব না। এলাকাবাসীকে নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে সব সময় আমি সোচ্চার। এ কারণে আমাকেও অনেকবার হুমকি দেওয়া হয়। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ী যে যতই শক্তিশালী হোক, যতই টাকা পয়সার মালিক হোক কাউকে কোনোভাবে ছাড় দেওয়া হবে না এলাকাবাসীকে নিয়ে, সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছি।
সিটি কর্পোরেশনের ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর জেসমিন পারভীন জেসি বলেন, মাইজপাড়া ও আশপাশের এলাকার লোক নিয়ে একবার পুলিশ উঠান বৈঠক করে। সে বৈঠকে আমি মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াতে ইয়াবা শামসু ফোন করে আমাকে হত্যার হুমকি দেয়। এরপর মাদকসহ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। জামিনে বেরিয়ে সে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এলাকায় মাদকের আখড়া তৈরি করে রেখেছে। তার লোকজন নিয়ে এলাকাবাসীকে হুমকি দিচ্ছে। প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকলেও তার বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা আমরা দেখছি না।