টুনটুনির গল্প

সনজিত দে

5

দুটো পাখি টুইটুই করে ডাকে আর লেজ দুলিয়ে কখনো লাউয়ের মাচায় কখনো শিমের ঝোপে টুপটাপ টুপটাপ করে ছোট ছোট ডানা মেলে ফুড়–ৎ ফুড়–ৎ করে এ গাছ ওই গাছে লাফানোর দৃশ্য দেখে কার না চোখ জুড়ায়। তাদের উড়োউড়ি দেখতে মুমু রোজই ছুটে যায় বাগানে। পাখিগুলো এত ছোট যে ইচ্ছে হয় তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করতে। কিন্তু এই পাখিদের ধরা এত সহজ নয়। তারা বুদ্ধিতে পাকা। হাতে ধরা দিয়ে ও ধরা দেয় না। অনেক সময় মুমুর রাগ হয় কী ক্ষতি হয় একটু আধটু হাতে ধরা দিলে। না হয় আদর করে ছেড়ে দিতাম। থাক তোমরা ঝোপে-ঝাড়ে, আমি চলে যাচ্ছি।
মুমু, মুমু
কে আমায় নাম ধরে ডাকে
আমরা টুনটুনি
তোমরা কথা বলতে জানো?
না! তবে আমরা আমাদের ভাষায় কথা বলি।
তোমরা আমার নাম জানো কী করে!
তোমার মা যখন তোমাকে নাম ধরে ডাকে তখন তার কাছ থেকে শুনে তোমার নামটি মুখস্থ করে ফেলেছি।
আমরা টুনটুনি কথা বলতে পারি না সত্যি, তুমি যখন বাগানে এসে আমাদেরকে ডাকো, আমরা তখন তোমার কথা শোনার জন্য কান পেতে থাকি। আর কান পেতে শোনা কথাগুলো মনের ভেতরে জমা রেখেছি এতদিন আজ তোমাকে বলতে পারায় কী না খুশি লাগছে।
আমারও ভাল লাগছে তোমাদের কথা।
তুমি প্রতিদিন এস। তোমার সাথে এ সময়টা হেসে খেলে কাটাব।
শুনো টুনটুনি পাখিরা, তোমরা কি একটি বারের জন্য আমার হাতে ধরা দিতে পার না?
পারি তো।
তাহলে আমার হাতে ধরা দাও
তাতে কী বন্ধুত্ব বাড়বে- বাড়বে না।
কারণ “বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃ কোলে”। যার যেখানে থাকার কথা সেখানে থাকা উচিত নয় কি? আমরা পাখি নিজের খাবার নিজেরা জোগাড় করি। সব সময় মুক্ত হাওয়ায় থাকতে ভালবাসি। পরাধীনতায় নয়। এর পরেও তুমি যদি বল তোমার হাতে ধরা দিতে হবে। তবে তাই দেব তোমাকে আমাদের খুব ভালো লেগেছে।
না, না, না আমি আর কখনো এ কথা বলব না আমি শুধু নিজের চাওয়া বড় করে দেখেছি। তোমাদের কথায় আমার এক তরফা নিজের চাওয়াটাকে প্রাধান্য দেওয়া স্বার্থপরতা। আমি আমার নিজের ভুল বুঝেছি। যুক্তি দিয়ে তোমরা তা আমাকে বুঝিয়ে দিলে। তার জন্য তোমাদের ধন্যবাদ।
তোমাকেও ধন্যবাদ মুমু, সহজ কথাটি সহজে বুঝে নেওয়ার জন্য । কিন্তু দেখ সবাই তা বুঝেও বুঝতে চায় না। আমরা কারো ক্ষতি করি না। বরং কৃষকের উপকার করি।
ফলফলাদির ক্ষতি করা পোকামাকড়গুলো আমরা আহার হিসেবে গ্রহণ করি। এতে মানুষের উপকার হয় আমাদের জীবনও বাঁচে। অথচ ভালো করে দেখ আমাদের শরীরটা ছোট। এইটুকু পাখি আমরা মিষ্টি পাখি হিসেবে আমাদের সুনামও আছে।
অথচ দুষ্টু ছেলেরা গুলতি নিয়ে আমাদের পেছনে ছুটে। তাদের থেকে আমরা পালিয়ে বেড়াই আবার অনেক সময় তাদের শিকারে পড়ে খাদ্যের তালিকায় চলে যাই। আমাদেরকে মরিচ মশলা দিয়ে ভুনা করে খেয়ে ফেলে। আমরা ছোট ছোট গাছপালায় থাকতে ভালবাসি মানুষের কাছাকাছি তাই ঝোপ-ঝাড়ে আমাদের বসবাস।
তোমাদের কথাগুলো আমাকে ব্যথিত করে তুলেছে। আর তাই তোমাদের রক্ষা করার জন্য আমি চেষ্টা করব। কতটুকু পারব জানি না। আমি আজই ইশকুলে গিয়ে হেডস্যারের মাধ্যমে সকল ছাত্র-ছাত্রীদের পাখি শিকার করা থেকে বিরত থাকার জন্য একটা বক্তব্য দিতে স্যারকে অনুরোধ করব। আশা করি স্যার আমার কথাগুলোর মূল্যায়ন করবেন।
সেদিন মুমু হেডস্যারকে পাখি শিকারের বিরুদ্ধে আবেদন জমা দেয়। হেডস্যার পরদিন সবাইকে টিফিন ছুটির সময় ইশকুল মাঠে একটি সভা ডেকে সবাইকে উপস্থিত থাকার জন্য বলে। ইশকুল ছুটি হলে মুমু বাড়ি এসে বই-খাতা রেখে ছুটে যায়। টুনটুনি পাখিদের কাছে।
টুনটুনি পাখিরা তোমরা কোথায় এসো খবর আছে।
মুমু তুমি কী আমাদের ডেকেছ?
হ্যাঁ বন্ধু, একটি ভালো খবর আছে।
কী খবর তাড়াতাড়ি বল।
পাখি শিকারের বিরুদ্ধে কাল ইশকুলে একটা সভা ডেকেছেন হেডস্যার। পারলে তোমরাও এসো।
ঠিক আছে সুযোগ থাকলে আমরাও যাব।
পরদিন ইশকুল মাঠে সভা শুরু হল ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে অনেক অভিভাবকও আসেন। একটি ছোট গাছে টুনটুনি দুটো চুপচাপ বসে আছে দেখে মুমুও খুব খুশি হল। উপস্থিত সবাই আগ্রহভরে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অত্র ইশকুলের প্রধান শিক্ষকের কথাগুলো শুনে অনেকে মাথা নেড়ে হেডস্যারকে সমর্থন জানাল। হেডস্যারের বক্তব্যে বার বার মুমুর কথারই ফুলঝুড়ি। কারণ এই অনুষ্ঠানের প্রধান আগ্রহী হল মুমু। সবাই মুমুর জন্যে হাততালি দিতে থাকে। এতসব দেখে খুশিতে পুলকিত হয় বন্ধু টুনটুনি দু’টো। অনুষ্ঠানে তাৎক্ষণিক একটি ছড়া বানিয়ে ফেলে মুমু
পাখি ডাকা ভোর
খুলে দেব দোর
বাঁচবে পরিবেশ
ধন্য হবে দেশ
আবার করতালিতে মুখরিত হয় ইশকুল মাঠের পরিবেশ। হেডস্যারের সমাপনী বক্তব্যে বার বার পাখি শিকার থেকে বিরত থাকার জন্যে সবাই অনুরোধ করেন। হেডস্যার বলেন, পাখিরা আমাদের নিকট আত্মীয়। তাদের রক্ষার জন্যে সবার এগিয়ে আসা উচিত।