টাকা তুমি দেখতে গোল-করো যতো গন্ডগোল

আবদুল হাই

14

বয়স ৬৬তে ঠেকেছে। পুরোদস্তুর বৃদ্ধ। চরণের জোড় নেই। বক্ষ প্রসারিত করে হাঁটা হয়না। হিম্মত ক্ষীণ। অবসর সময়টা একগুঁয়ে মনে হয়। গল্প করার কেউ নেই। বার্ধক্যকে ঠেক দিতে মাথায় কলপ মাখা হয়। প্রাপ্তবয়স্কতার সুবাধে মুখে দাডি-গোঁফ গজানোর পর থেকে দীর্ঘদিন ক্লীন সেবের অভ্যাস। বরাদ্দকৃত আয়ু থেকে প্রতিদিন বিয়োগপ্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। স্বীয় চেহেরার পরিচর্যার পর আয়নার মুখোমুখি হলে লাবণ্যতার করুণ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে নিজেকে নিজে ব্যাংগাতে ইচ্ছে করে। বাক্সভর্তি সার্ট প্যান্টগুলোর পালাক্রমে গায়ে দিয়ে দেখি। কিছু রূপচর্চার প্রসাধনসামগ্রী? না কিছুর কিছুই হবার নয়। নানা-দাদার কাতারে এসে দাডিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ভাবতে থাকি। দাডি-গোঁফ আর সাফান-সাফ্ফা করা যাবেনা। অগত্যা সহধর্মিণীর এজাজত নিয়ে গোঁফ দাডি হেফাজত শুরু করলাম দুর্ভাগ্য, গালপুরো দাডি আমার নেই। জামির মধ্যে এ খোঁচা দাডি। আমার স্ত্রী বেশ পরেজগার দাডি রাখতে ও দারুন খুশী। খুঁটিযে খুঁটিয়ে দৃষ্টি নিবন্ধ করলাম সমস্ত দাডিতে পাক ধরেছে। মন্দকি অভিজ্ঞতার সাইনবোর্ড। শুকরিয়া এ দাডি বাদ বাকী জীবনকাল অবধি থাকবে আমার নবীর সুন্নত পালিত হবে।


আমার তারুণ্যের একটা আলোকচিত্র দেখতে দেখতে দেখার তৃপ্তি যেন নিঃশ্বেষ হচ্ছেনা। নিজের অজান্তে নিজেকে নিজে ভালবাসতে শুরু করলাম। আত্মভাবনার এক পর্যায়ে নিজের সঙ্গে নিজেরই আলাপচারিতা। বলতে থাকি এই ছেলেটা সত্যি সুদর্শন। মাথাভর্তি চুল, টান টান চামতা কি নাদুসনাদুস চেহেরা। এই আমি সেই আমি নই; হতে পারে অন্যকেই। আমি কি তাহলে দৃষ্টিভ্রমের ঘূর্ণিপাকে ঘুরপাক খাচ্ছি? ছবি, ছবিই। এতো একটি সুদূর অতীতের জড় চিহ্ন। এতে হারিয়ে যাওয়া তারুণ্যের দুঃখ। জীবন যেন স্বল্পদৈর্ঘের অভিনয় জগৎ। তারুণ্যকে যদি স্রোতঃসিনীর পূর্ণিমার জোয়ার রুপে কল্পনা করা যায় তবে বার্ধক্যটাই যেন ভাটির টান। জীবনকে উপভোগ্য করতে মানুষের হর হামেশাই প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতার শেষ সীমারেখা নেই। অর্থাৎ চাওয়া-পাওয়ার ইস্প্রিহার অগ্রযাত্রার অন্তিমতা কোথায়? অন্তযামীইজ্ঞাত। ভালো কিছুর প্রতিযোগিতার অনুরক্ততার জায়গায় মন্দ কর্মের প্রতি আসক্তিতার আস্ফালন বিকৃত রুচির বহিঃপ্রকাশ। ভালোমন্দ বাচবিচারে আমাদের বিবেকই যথেষ্ট। একটা মানুষ স্বীয়কার্যের উত্তম সাক্ষী। বিবেকসম্পন্ন মানুষ নিজের তরে উত্তম বিচারক। আমরা যেন এক ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করছি। আমাদের ধর্মমতে হযরত মুহাম্মদ (স.)কে জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিলো কেয়ামত কখন সংগঠিত হবে? তখন নবী করিম (স.) বলেন, ‘যখন আমানত খেয়ানত করা হতে থাকবে তখন কেয়ামতের জন্য অপেক্ষা করো। লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করে আমানতের কেয়ানতের রূপকি হবে ? হুজুর পাক বলেন, রাষ্ট্রীয় কার্য পরিচালনা বা শাসন ক্ষমতার ভার যখন অযোগ্য লোকের হাতে পড়বে। অযোগ্য ও অবিশ্বস্ত লোকদেরকে যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নির্বাচন বা নিযুক্ত করা হবে তখন জগৎ ধ্বংসের অপেক্ষা করতে থাকবে। (বোকারিশরীফ) হাদিস নং-২০২৭। কেয়ামতের আলামত সম্পর্কে রসুলপাক (স.) বলেন, এলেম উঠে যাবে, অজ্ঞতা প্রবল হবে, মদ্যপান, জ্বেনা ব্যভিচার বৃদ্ধি পাবে, এমন কি উহা আর লুকায়িত বিষয় থাকবে না হাদিস নং-২০২৮। নবী (স.) আরো ভবিষতবাণী করেন, সময় সংকীর্ণ হবে, কাজ স্বল্প হয়ে যাবে, কৃপণতা দেখা দেবে, বিপদাপদ বৃদ্ধি পাবে আর (হারজ) হত্যার সংখ্যা বাড়বে। আমি এ হাদীসের শুধু শেষোক্ত অংশটুকুর ১ম ব্যাখ্যা করবো, হারজ অর্থাৎ হত্যা নিয়ে। হত্যা যেন প্রতিদিনকার কামনা সংবাদ, শুনতে, শুনতে দেখতে-দেখতে মন তেতো হয়ে গেছে। হত্যার খবর কারো কাছে শুনবার আগ্রহ আর জন্মায়না। স্বামী-স্ত্রীকে, ছেলে বাবাকে। মা তাহার আপন অবুঝ শিশুকে, বন্ধুর হাতে বন্ধু, রাজনীতিতে একপক্ষ দ্বারাতার প্রতিপক্ষ হত্যার শিকার হচ্ছে। অর্থাৎ এ পরিস্তিতে সবাই নীরব। অনেক ক্ষেত্রে বিচারের নামে প্রহসন। মানুষকে রক্ষা করতে মানুষ অগ্রসর হচ্ছেনা। সত্যিকার অর্থে দেশ আজ বিপদসংকুল। ঘর থেকে বেরুলে সহিসালামতে ঘরে ফিরতে পারা বড়ই সৌভাগ্য। যখন তখন চিনাতাইয়ের কবলে পড়তে পারেন। আপনি হত্যা বা গুম হতে পারেন বা গাড়ীর দুর্ঘটনায় কিংবা চাকার পিষ্ঠ হয়ে আহত নিহত হতে পারেন। তার পরও নন্দলালের মত গৃহে দুর্ঘটনার ভয়ে একনাগারে অবস্থান করাতো যায়ান।
এ ভবিষ্যৎ বাণীও সত্য যে, সময় সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। দেখতে দেখতে সময় ফুরিয়ে যায়। কাজের পরিধি স্বল্প হয়ে গেছে। সব কাজগুলো ডিজিট্যালাইজ হয়ে গেছে ম্যানুয়ে কাজ বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। মানুষের কর্ম ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বেকারত্বের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হচ্ছে।
এবার চলমান স্বদেশ পরিস্থিতি নিয়ে কিছু কথা তুলে ধরতে চাই। বেশ কিছুদিন পূর্বে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি প্রসঙ্গে শূন্য সহনশীলতা মনোভাব ভাব ব্যক্ত করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি স্পষ্ট উক্তি করেছেন, ‘অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খলতা বা অসৎ কর্মে যদি কেউ ধরা পড়ে, তবে সে যেই হোক না কেন আমার দলের হলে ও ছাড় হবে না। তিনি বলেন, যে পরিমাণ উন্নয়ন প্রকল্প নিচ্ছি, তার প্রতিটি টাকা যদি সঠিকভাবে ব্যয় হতো আজকে বাংলাদেশ আরো অনেক বেশি উন্নত হতে পারতো। তাঁর কথায় ১ রত্তিভর ও ভুল নেই। তিনি দু হাত উজার করে প্রকল্পের বরাদ্দ দিয়েছেন। উদ্দেশ্য দু চোখভরে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করে মনখুলে তুপ্তির হাসি হাসবেন। তাঁর আব্বাজান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গর্বস্বরে রবিঠাকুরের উদ্দেশ্যে চ্যালেজ্ঞ ছুড়ে বলেছিলেন, রবিঠাকুর আপনিই বলেছিলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি। বঙ্গবন্ধুর এ উক্তির পশ্চাতের হেতু ছিলো অর্থাৎ আজ আমরা স্বাধীন রবি ঠাকুর দেখে যান আজ আমাদের জাতীয়পতাকা আছে। জাতীয় সঙ্গীত আছে। স্বাধীন অস্তিত্ব আছে। এ পরম পাওয়ার পর, পাওয়ার আর কিইবা অবশিষ্ট আছে ? আচ্ছা আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি আজ আমাদের স্থান কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। আজ জাতিসংঘে আমাদের সম্মান আমাদের পতাকা উড়ছে। ওখানে আমাদের জন্য সংরক্ষিত আসন। ওখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমাদের ভাষায় বক্তব্য রাখছেন। কি অমূল্য প্রাপ্তি ? এ প্রাপ্তি অস্বীকার করার অবকাশ নেই। এক সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ করলে নাক ছিটকাতো অবহেলার চোখে দেখতো। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আমাদের শ্রমজীবি মানুষদের বলতো ‘কুল্লে মিস্কিন’ অথচ তাদের উন্নয়নের পরতে পরতে ইটের গাঁতুনীতে এদেশের মানুষের ঘাম আর শ্রম বিদ্যমান। আজ আমরা উন্নয়নের দ্বার প্রান্তে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো আমাদেরকে আজ সমীহ করে কথা বলে। কিন্তু তারপরও অবশ্য বলতে হয় চেরাগের নিচে আঁধার। শ্রæত আছে বাংলাদেশে ধনী হওয়া অত্যন্ত সহজ। এখানে কালো টাকাকে সাদা করার জন্য বাজেটে প্রতিবছর ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়। এখানে আইন পিঞ্জিরার বন্দী পাখী। ওখান থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় পাখীটি ছট্পট্ ছট্পট্ করছে। সাম্প্রতি কালে কতিপয় ক্লাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঝটিকা অপারেশন শুরু করেন এবং অপারেশন সাক্সেস। ফান্দে পরিয়া বগা কাঁন্দে। ২২ সেপ্টেম্বরের পত্রিকার খবর, শনিবার রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত র‌্যাব সদস্যরা নগরীর সদরঘাট আইস ফ্যাক্টরী রোড এলাকায় অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদ চট্টগ্রাম খাদ্যগুদামসংলগ্ন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, হালিশহর আবাহনী লিমিটেড, আসকারদিঘির ফ্রেন্ডস ক্লাবে অবিযান চালানো হয়। এসব ক্লাব থেকে তাস এবং জুয়ার সরঞ্জাম উদ্ধার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন। বাপদাদার চৌদ্দগোষ্ঠী ও শোনেনি ক্যাসিনো কি চিজ। এতদ্ব্যাপারে আমাকে বাঁ-আল বলবেন না। ক্যাসিনোর উদ্ভাবক কে ? ২৬ সেপ্টেম্বর বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন ক্যাসিনো আওয়ামী লীগের সৃষ্টি আবার বর্তমান তথ্যমন্ত্রীর মতে তারেক রহমানই ক্যাসিনো সম্রাট। টাহর করে প্রত্যক্ষ করলাম আরো এতো জুয়ার চড়কি। এ চড়কি ঘুরিয়ে কত জনকে ফতুর করে ফকিরে রূপান্তর করা হয়েছে গায়েবের মালিক আল্লাহ জানেন। যেখানে অভিযান চালু হয়েছে সেখানেই টাকা। রীতিমতো টাকার খনি বল্লে অত্যুক্তি হবেনা। মনে হয় টাকার পর্বতে কুল্লে মিসকিন চাপা পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুগ্রহ পূর্বক টাকাগুলো সাফ মেখে ধবধবে সাদা করে সহিসালামতে গনিমতের মাল রূপে রূপান্তরিত করুন। ময়নামতি ছায়াছবির একটি গান হঠাৎ স্মরণে পড়লো। টাকা তুমি দেখতে গোল করো মতো গÐোগোল আমারে খাওইচো গোল আমি কিন্তু ছাড়–মনা এবং এ নিয়ে উত্তাল বাক্যও কমতি হয়নি। একজন আর একজনকে হুমকিধমকিসহ, ক্লাবে তাস খেলা বন্ধ হলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি ঘোষণা। আমি তাসখেলবো আপনারা কেন আঙ্গুল চুষছেন। আমি কারো সম্মান হানি করতে নয় বঙ্গবন্ধুর অনুসারি হয়ে বঙ্গবন্ধুর মুজিব কোট পরিধান করে বঙ্গবন্ধুর দলে অবস্থান করে সেই দলের সিদ্ধান্তের বিপরীতে অবস্থান করে যদি তাস জুয়ার পক্ষে আন্দোলনে নামেন মানুষ খারাপ বলবে। আমি বঙ্গবন্ধুর অনুসারি, তাঁর আদর্শ লালন করি, অবৈধ কাজ আজ অবধি করিনি। আমার ছেলের চাকুরির জন্য কোন সরকারি অফিসে তদবীর করিনি। কোন ঘুষের ব্যাপারে অর্থ লেনদেন করিনি। ওরা পরীক্ষায় প্রতিযোগিতা করে যখন নির্বাচিত হয় তখন ওদের বললাম। বাবারা দুর্নীতি করবে না। অবৈধ অর্জন থেকে নিজেকে সংবরণ করবে। দেশের স্বার্থকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দিও। জীবনের অন্তিম সময় আবধি সৎভাবে চলতে চেষ্টা করবে।
আমি একটি দেশ পেয়েছি, একটি পতাকা পেয়েছি একটি জাতীয় সঙ্গীত পেয়েছি একটি জাতীয় পরিচয় পেয়েছি। এ চারটি আমার পরম পাওয়া এরপর আর প্রাপ্তির কিছুই অবশিষ্ট নেই।
আজ ব্যাংকে তারল্য সংকট। গ্রাহকদের টাকা দিতে পারে না অথচ ক্লাবে ক্লাবে, সিন্দুকে সিন্দুকে টাকা আর স্বর্ণ। জুয়া, মাদক, ক্যাসিনো নয়। আমার প্রিয় ভ্রাতাগণ তাস-জুয়ার জন্য উদ্ভট আন্দোলন দলকে দলের লোকদেরকে হাস্যস্পদ করবে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা তিনি যেন সবার নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে দেশকে ভালবাসার পথ বাতলিয়ে দেন।

লেখক : কলামিস্ট