ঝরনা, পাহাড় ও সাগরের সঙ্গে দুদিন

তামজিদ হাসান

11

প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি ঝরনা। আর এই ঝরনা তার রূপের সব পসরা সাজিয়ে হাজির হয় বর্ষাকালে। চট্টগ্রামের মীরসরাই ও সীতাকুন্ড উপজেলায় অনেক সুন্দর সুন্দর ঝরনা আছে। সেই সব ঝরনা দেখার ইচ্ছে ছিল অনেক দিন ধরে। সুযোগ মেলে কিছুদিন আগে। অনলাইন ট্রাভেল গ্রুপ বাংলার পথে দুদিনে অন্তত ১০টি ঝরনা দেখা ও গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত দেখার আয়োজন করে। খরচ ধরে সাড়ে তিন হাজার টাকা।
খৈয়াছড়া ঝরনা : এটি মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এর মধ্যে এক কিলোমিটার পথ গাড়িতে করে যাওয়া যায় ঝরনাটির কাছাকাছি একটি গ্রামে। আমাদের হাঁটা শুরু হয় সেখান থেকে। পোশাক পাল্টে ও চিকন বাঁশ নিয়ে হাঁটতে থাকি ঝিরির পথ ধরে। যেতে যেতে বেশ কিছু খাবারের দোকান পাওয়া যায়। ঝিরিতে পানি তুলনামূলক কম ছিল। তবু কখনো কখনো হাঁটুপানিতে হাঁটতে হয়েছে। মাঝেমধ্যে ঝিরি ছেড়ে উঠতে হয়েছে পাশের টিলায়। চারপাশে জঙ্গল, নানান প্রজাতির গাছপালা। মনে হচ্ছিল মানববসতি ছেড়ে কোনো দুর্গম জায়গাতে চলে এসেছি। প্রায় ঘণ্টা খানেক হাঁটার পর দেখতে পাই খৈয়াছড়া ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্য।
খৈয়াছড়ার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অন্যান্য ঝরনার মতো এটি সরাসরি ওপর থেকে নিচে এসে পড়েনি। ঝরনাটির মোট সাতটি (কারো মতে নয়টি) ধাপ আছে। এর মধ্যে নিচ থেকে তিনটি ধাপ দেখা যায়। ওপরের চারটি ধাপ দেখতে হলে বাঁ পাশের প্রায় খাড়া পাহাড় বেয়ে আপনাকে উঠতে হবে আরো শখানেক ফুট ওপরে। ওপরে উঠলে দেখা মিলবে আরো একটি ধাপের। এর বাম পাশ দিয়ে সামান্য হাঁটলেই দেখা মিলবে অপর তিনটি ধাপের।
আমাদের ভ্রমণের দিনটি শুক্রবার হওয়ায় খৈয়াছড়া ঝরনায় অনেকে ভিড় জমিয়েছিলেন। একটু ভিড় কমলে ঝরনার শীতল পানিতে কিছুক্ষণের জন্য শরীর জুড়িয়ে নিই। চলে ছবি তোলা। এরপর ভেজা জামা নিয়েই আবার হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি গাড়ির কাছে। রওনা দেই নাপিত্তাছড়া ট্রেইলের দিকে।
নাপিত্তাছড়া : এটি কোনো ঝরনার নাম নয়। এটি একটি পাহাড়ি পথ বা ট্রেইলের নাম। এর অবস্থান মীরসরাই উপজেলার নদুয়ার হাট এলাকায়। এই পথে রয়েছে কুপিকাটাকুম, বান্দরকুম ও মিঠাছড়ি ঝরনা এবং বেশ কিছু ক্যাসকেড। আমাদের গাড়ি নদুয়ারহাট এলাকায় রেল লাইন পর্যন্ত যেতে পারে। এরপর প্রায় ৪০ মিনিট ঝিরিপথ ও পাহাড় বেয়ে আমরা পৌঁছাই প্রথম ঝরনা কুপিকাটাকুমে। ঝরনার সামনে বেশ গভীর পানি। তাই দূর থেকেই সেই ঝরনা দেখি আমরা। এরপর আরো ৪০-৫০ মিনিটের ঝিরিপথ ও পাহাড় পাড়ি দেই। পথে বেশ বড় বড় পাথর বেয়ে ওপরে উঠতে হয়, যা ছিল বেশ পিচ্ছিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। একটু পা পিছলালে ভাঙতে পারে হাড়। তুমুল অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে পৌঁছাই দ্বিতীয় ঝরনা বান্দরকুমে। বেশ উঁচু থেকে তুমুল বেগে পড়ছিল ঝরনার পানি। আমাদের অনেকে কিছুক্ষণ গোসল করে। কিন্তু ছবি তোলে সবাই।
এরপর আধা ঘণ্টার মতো হেঁটে পৌঁছাই মিঠাইছড়ি ঝরনায়। অনেকে এটিকেই নাপিত্তাছড়া ঝরনা বলে থাকে। এই ঝরনার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর উৎপত্তিস্থলে একটি মুখ থাকলেও নিচের অংশে ঝরনাটি দুভাগে বিভক্ত হয়েছে। এই অপরূপ সৌন্দর্য কিছুক্ষণ অবলোকন করার পর আমরা রওনা দেই রেললাইনের দিকে, যেখানে আমাদের গাড়ি রাখা ছিল। রেললাইনের পাশের একটি হোটেলে আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নেই। এরপর আমাদের ছোট কমলদহ ট্রেইলে বেশ কিছু ঝরনা দেখার কথা ছিল। কিন্তু গ্রুপের অনেকের পায়ে ব্যথা শুরু হওয়ায় এবং ক্লান্ত থাকায় তারা রিল্যাক্স করার মতো কোনো স্থানে নিয়ে যেতে বলেন। সবার সঙ্গে আলাপ করে রওনা দেই মহামায়া লেকের উদ্দেশে।
মহামায়া লেক : মূলত এটি একটি সেচ প্রকল্প। রাঙামাটির কাপ্তাই লেকের পরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম লেক এটি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মীরসরাই উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়ন ঠাকুরদীঘি বাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্বে লেকটি অবস্থিত।
এই মহামায়া প্রকল্পে রয়েছে লেক, পাহাড়, ঝরনা ও রাবার ড্যাম। আয়তন প্রায় ১১ বর্গ কিলোমিটার। পাহাড়ের কোলঘেঁষে আঁকাবাঁকা লেকটি দেখতে খুব সুন্দর। এর জলাধারের চারপাশে দেখলে মনে হবে সবুজের চাদর বিছানো রয়েছে। মনে হবে যেন কোনো এক শিল্পীর আঁকা সুনিপুণ ছবি। ছোট ছোট ডিঙি নৌকা বা কায়াক ভাড়া করে লেকে ঘোরা যায়। একেক জন ঘণ্টায় ৩০০ টাকা করে। আধা ঘণ্টা ২০০ টাকা। মহামায়া লেক ঘুরে আমরা যাই গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতে।
গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত : সীতাকুন্ড উপজেলার মুরাদপুরে অবস্থিত এই সমুদ্র সৈকত। সীতাকুন্ড বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। এই সমুদ্র সৈকতে রয়েছে দিগন্তজোড়া জলরাশির পাশাপাশি কেওড়া বন। জোয়ারের সময় কেওড়া বন থাকে পানিতে পরিপূর্ণ। আর ভাটার সময় সবুজ ঘাসে পরিপূর্ণ থাকে পুরো সৈকত এলাকা। সন্ধ্যা পার হয়ে রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে রওনা হই সীতাকুন্ড পৌর শহরে। সেখানে আমাদের গাড়িকে থামায় দুজন লোক। ধরিয়ে দেন ৪০ টাকার পৌর টোলের স্লিপ। তাদের এখানে নাকি এটাই নিয়ম যেকোনো যানবাহন পৌরশহরে ঢুকলেই টোল দিতে হবে।
আমরা শুনেছিলাম সীতাকুন্ড শহরের আল আমীন হোটেলের খাবার ভালো। কিন্তু আমাদের সবার অভিজ্ঞতা ছিল এর উল্টো। রাতের খাবারে ভাত, গরু ও মুরগির মাংস এবং ডাল ছাড়া আর কিছু ছিল না সেখানে। অথচ সময় তখন রাত ৮টা। এর কোনো আইটেমই আমাদের ভালো লাগেনি। ভাতের অবস্থা ছিল সবচেয়ে খারাপ। কোনো রকমে রাতের খাবার শেষে আমরা যাই আগে থেকে ঠিক করে রাখা স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন সংস্থা ইপসার মানবসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্রের ভবনে। সেখানে চারটি কক্ষে দুই গাড়ির চালকসহ আমরা ১৪ জন ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম থেকে সকাল ৮টায় ওঠে বেরিয়ে পড়ি সীতাকুন্ড ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের উদ্দেশে, আরো দুটি ঝরনা দেখতে।
সীতাকুন্ড ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন চন্দ্রনাথ রিজার্ভ ফরেস্ট ব্লকে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা চিরসবুজ বনাঞ্চল। এটি চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব পাশে অবস্থিত। এই বনাঞ্চলে লুকিয়ে আছে দুটি সুন্দর ঝরনা ; একটি সহগ্রধারা অন্যটি সুপ্তধারা।
সহগ্রধারা ঝরনা : আমরা নির্ধারিত ফি দিয়ে টিকেট কেটে গাড়ি নিয়ে চলে যাই ইকোপার্কের ভেতরে। কেউ চাইলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেও যেতে পারবেন। পাহাড়ের ওপর থেকে প্রায় এক হাজার ফুট নিচে সহগ্রধারা ঝরনা। ঝরনায় যাওয়ার জন্য রয়েছে ৫৮২টি সিড়ি। সেই সিঁড়িগুলো নেমে একটু সামনে এগিয়ে দেখতে পাই বিশাল সহগ্রধারা ঝরনা। ঝরনার সামনে বেশ খানিকটা পানি। চাইলে হেঁটে হেঁটে বা সাঁতার কেটেও যাওয়া যায় ঝরনার নিচে। সকাল সকাল লোকজন বলতে আমরাই ছিলাম। ঝরনার শীতল পানিতে নেমে জুড়িয়ে যায় শরীর। অনেকে নানান ভঙ্গিতে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঝরনা দেখে আবার ৫৮২টি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয়। ওপরে উঠতে বেশ কষ্ট হয়। এজন্য বেশ কয়েকবার জিরিয়ে নেই আমরা।
সুপ্তধারা ঝরনা : সহগ্রধারা দেখে সুপ্তধারার পথে রওনা হই আমরা। পাহাড়ের এই পথটা বেশ সুন্দর। পাহাড় থেকে সবুজ অরণ্য ও বঙ্গোসাগর দেখা যায়। সুপ্তধারা ঝরনায় যাওয়ার জন্যও সিঁড়ি রয়েছে। বন বিভাগের দেওয়া ছোট সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, সুপ্তধারা ঝরনার দূরত্ব দুই হাজার ২৯৬ ফুট। অনেক সিঁড়ি নামার পর বেশ খানিকটা ঝিরিপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাই সুপ্তধারা ঝরনায়। বেশ প্রশস্ত এই ঝরনা। উঁচু পাহাড়ের তিনটি স্থান থেকে ঝরনার পানি পড়ছিল। সেখানে গোসল করতে ঝাপিয়ে পড়েন প্রায় সবাই। বেশ কয়েকজন ঝরনার পাশ দিয়ে ওপরে উঠেন এর উৎসমুখ দেখতে। সহগ্রধারার তুলনায় এখানে ভ্রমণপিপাসুদের বেশ ভিড় ছিল। এরপর আবার কষ্ট করে আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে চলে যাই বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতে।
বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত : চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে বাঁশবাড়ি বাজারের পাশে অবস্থিত এই সমুদ্র সৈকত। এই সৈকতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আপনি আধা কিলোমিটার সমুদ্রের ভেতরে পর্যন্ত একটি লোহার তৈরি ব্রিজের মধ্যে দিয়ে হেঁটে আসতে পারবেন। দুপুর ২টার দিকে আমরা সেখানে গিয়ে কোনো ব্রিজের দেখা পাইনি। সমুদ্রের জোয়ারের পানি চলে এসেছিল বাঁশবাড়িয়া বেড়িবাঁধ পর্যন্ত। সৈকতে ডাবের পানি পান করে গলা ভিজিয়ে নিই।
বাঁশবাড়িয়া থেকে দুপুরে আমাদের ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। সেখানে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, এখান থেকে স্পিডবোটে করে দ্রুত সন্দ্বীপে যাওয়া যায়। জনপ্রতি ভাড়া ২৫০ টাকা। আসা-যাওয়ায় একেকজনের পড়বে ৫০০ টাকা করে। আমরা অতিরিক্ত ৫০০ টাকা দিয়ে উঠে পড়ি স্পিডবোটে। নিরাপত্তার জন্য সবাই পরে নিই লাইফজ্যাকেট।
সন্দ্বীপ : বঙ্গোসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেল দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে চলছিল আমাদের স্পিডবোট। পাড়ি দিচ্ছিল বড় বড় ঢেউ। জীবনের সেরা অ্যাডভেঞ্চার ছিল সেটি। চ্যানেল পাড়ি দিয়ে দেওয়ার ৩০ মিনিট পর আমাদের স্পিডবোট ঢুকে পড়ে সরু ক্যানেলে। স্পিডবোট একে বেকে অতিক্রম করছিল সেই ক্যানেল। দুই পাশে ছিল উপকূলীয় বনাঞ্চল। মনে হচ্ছিল সুন্দরবন চলে এসেছি। সন্দ্বীপ স্পিডবোট ঘাটে নেমে আমরা ঘোরাঘুরি করার জন্য আধা ঘণ্টার মতো সময় পাই। আশপাশে গল্প করতে করতে সেই সময় চলে যায়। এরপর আবার স্পিডবোটে করে বাঁশবাড়িয়ার উদ্দেশে রওনা দেই। ফেরার পথটা ছিল আরো অ্যাডভেঞ্চার। মাঝেমধ্যে সমুদ্রের ঢেউগুলো বৃষ্টির মতো আমাদের ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
বাঁশবাড়িয়া সৈকতে ফিরে দেখি জোয়ার শেষ। দেখা যাচ্ছিল পুরো সৈকত ও লোহার ব্রিজ। সৈকতে কিছুটা সময় কাটানোর পর ক্ষুধায় পেট চো চো করতে থাকে। গাড়ি নিয়ে চলে যাই মীরসরাই উপজেলার ছোট কমলদহ এলাকার বিখ্যাত ড্রাইভার হোটেলে। এই হোটেলের বিখ্যাত গরুর মাংস ও চানার ডাল দিয়ে পেটভরে ভাত খেয়ে ফেলি।
.খাওয়া শেষে সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেই। পথে কুমিল্লার নূরজাহান হোটেলে রসমালাই দিয়ে পরোটা খাই। গভীর রাতে পৌঁছাই বাসায়। ফ্রেস হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্ন দেখি আবারও যাব মীরসরাই ও সীতাকুন্ডে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাকি ঝরনাগুলো দেখতে।