বান্দরবানের পাহাড়গুলোতে উৎসবের আমেজ

জুমের পাকাধান ঘরে তোলায় ব্যস্ত চাষীরা

মো. শাফায়েত হোসেন, বান্দরবান

5

বান্দরবানের পাহাড়ে পাহাড়ে চলছে জুমের পাকা ধান কাটার উৎসব। জেলার ৭টি উপজেলায় বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়গুলোতে চলতি মৌসুমে রোপিত জুমের পাহাড়ে পেকেছে ধান। খাবার উপযোগী হয়ে পড়েছে মারফাসহ হরেক রকম কৃষিপণ্য। এসব কৃষিপণ্য জুমক্ষেত থেকে আহরণ করে ক্ষেত-খামার এবং ঘরে তুলতে শুরু করেছেন চাষীরা। চলতিবছর জেলায় ৮ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুম ধান চাষ হয়েছে। এর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২৪৫৩ মেট্রিক টন। আর গত বছর জুম চাষ করা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৫৮ হেক্টর জমিতে। সে হিসেবে এ বছর পাহাড়ে ৪৩৭ হেক্টর জমিতে জুম চাষ বেড়েছে।
এদিকে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী পাহাড়িদের আদিপেশা জুমচাষ জেলার রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদম উপজেলায় বসবাসকারী পাহাড়ি পরিবারগুলোর প্রায় সকলেই জুমচাষ করে থাকেন। প্রতিবছর এপ্রিল মাসের শেষের দিকে শুরু হয় জুমে ধান লাগানোর প্রক্রিয়া। প্রায় ৩-৪ মাস পরির্চযার পর সেপ্টেম্বর মাসের শেষদিক থেকে পাহাড়ে জুমের ধান কাটা শুরু করে। আর শেষ হয় অক্টোবর মাসে। তাই জুমের ফসল ঘরে তুলতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছে জুমিয়া পরিবারগুলো। শিশুকিশোরসহ পরিবারের কেউই বসে নেই ঘরে। পরিবারের সবাই জুমের ধান কাটতে নেমে পড়েছেন পাহাড়ে। তবে এবছর আবহাওয়া অনুকূল থাকায় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় জুমচাষে বেশি ফলন পেতে শুরু করেছে। জুমের ফসলের মধ্যে মারফা, ভূট্টা, তিল, তুলা, মরিচ কাকনচাল, বিনি চাল ও ধান অন্যতম।
চাষীরা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়িরা প্রতিবছর জেলার বিভিন্ন স্থানে শত শত একর পাহাড়ে জুমচাষ করেন। জুমিয়ারা পাহাড়ে ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, মরিচ, যব, সরিষা, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন রকমের সবজির চাষ করে থাকেন। তবে একই পাহাড়ে একাধিকবার জুমচাষ করা যায় না বলে জুমিয়ারা প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন পাহাড়ে এ চাষ করে থাকেন। জেলায় বসবাসরত মার্মা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমী, লুসাই, পাংখো, বম, চাকসহ ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই জুমচাষের উপর নির্ভরশীল। জেলা শহরে বসবাসরত কিছু শিক্ষিত পরিবার ছাড়া দুর্গম এলাকায় বসবাসরত পাহাড়িরা আজও জুমচাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। তবে ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্টীর মধ্যে একমাত্র ¤্রাে সম্প্রদায় আদিকাল থেকে এখনো পর্যন্ত জুম চাষের মাধ্যমেই সারা বছরের জীবিকা নির্বাহ করে। জুমিয়া পরিবারগুলো প্রতিবছর মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে জুম চাষের জন্য পাহাড়ে আগুন দেয়। আর মে-জুন মাসের দিকে আগুনে পোড়ানো পাহাড়ে জুমচাষ শুরু করে। জুমের পাকা ধানসহ অন্যান্য উৎপন্ন ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন পাহাড়িরা। ফসল ঘরে তোলার আনন্দে পাহাড়ি পল্লীগুলোতে চলছে নবান্ন উৎসবও। গোত্র ভেদে পাহাড়িরা উৎপাদিত ফসল দেবতাকে উৎসর্গের মাধ্যমে এই নবান্ন উৎসব উদযাপন করে থাকেন।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতিবছর ৮ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে জুম ধানের চাষ হয়েছে। এর লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ১২৪৫৩ মেট্রিক টন। এর মধ্যে নিড়িখা, উফশি, পিডি, ককরো, বিনি, গেলং, কানভূই জাতের ধান। আর গত বছর জুম চাষ করা হয়েছিল ৮৪৫৮ হেক্টর জমিতে।সে হিসেবে এবছর পাহাড়ে ৪৩৭ হেক্টর জমিতে জুম চাষ বেড়েছে।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক ড. একে এম নাজমুল হক বলেন, বান্দরবান জেলায় প্রতিবছর জুমচায় হয় জুমে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। বিভিন্ন জাতের ধানের ফলন বাড়ানোর লক্ষ্যে কৃষি গবেষণা এবং কৃষি অধিদপ্তর কাজ করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিবছর জুম চাষ করা হলে তাদের আর্থ সামজিক উন্নয়ন সহ আর্থিক স্বচ্ছলতা আসবে এবং সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।