জীবন্ত কিংবদন্তি মুকুটহীন ছড়া সম্রাট সুকুমার বড়ুয়া

সুজন সাজু

17

ছড়া মানেই হাসি খুশি,ছড়া মানেই আনন্দ। ছড়া মানে কৃত্রিমতা নয়,ছড়া মানে বাস্তবতার প্রতিফলন। ছড়া বাংলা সাহিত্যের আদি প্রাণ স্বরূপ। এক সময় ছড়াকে শিশু মনোরঞ্জনের মাধ্যম হিসেবে গন্য করা হলেও সময়ের পরিক্রমায় ছড়া আজ ঘাত প্রতিঘাতের, প্রতিবাদের স্লোগানের এক অনন্য কন্ঠস্বর। ছড়া অনেকেই লিখেছেন, অনেকেই লিখছেন। কিন্তু যিনি শুধু ছড়া লিখে জনপ্রিয়তার স্বর্ণ শিখরে পৌঁছেছেন তিনি হচ্ছেন সুকুমার বড়ুয়া। বিষয় বৈচিত্র্য,উপস্থাপনার ভঙ্গিমা, শব্দচয়ন,ব্যঙ্গ বিদ্রুপাত্মক,ছন্দ কুশলতা ও অন্তমিল ব্যবহারে অপূর্ব সমন্বয়ের সামঞ্জ্যতা তার ছড়াকে দিয়েছে স্বতন্ত্রের আলাদা বৈশিষ্ট্য। যার ছড়া পড়েই বিমুখ পাঠকও ছড়া পাঠে বাধ্য ছাত্রে পরিনত হয়েছে। ছড়ার প্রতি পাঠককে ঝুকে পড়ার সঞ্জীবনী দিতে যার জুড়ি মেলা ভার। তার অসংখ্য ছড়া ছোট বড় অনেকের হৃদয়ে দেদীপ্যমান। তার একটি প্রতিবাদের ছড়া, যেটি রচনা করেছিলেন দেশ ভাগের আগে আয়ুব শাসনের দুঃশাসনের প্রতি ইঙ্গিত করে ঊণসত্তর সালে। যখন সারা দেশ জুড়ে বৈরী পরিস্থিতি ঠিক সেই সময়ের ঘটনা প্রবাহকে রূপ দিলেন ছন্দের কারিশমায়। চিচিং ফাঁক হে চিচিং ফাঁক,বন ময়ুরের পুচ্ছ পরে, নাচ ছিলো সব শকুন কাক। দমকা ঝড়ে হঠাৎ করে, ঘঠিয়ে দিলো ঘোর বিপাক, চিচিং ফাঁক হে চিচিং ফাঁক। গোলাগুলির মহান দশক, রোগীর ঘরে বাড়ল মশক, তোমার পাতে কোরমা পোলাও, আমরা না পাই কচুর শাক,চিচিং ফাঁক হে চিচিং ফাঁক। হাসতে মানা কাঁদতে মানা, হানার উপর চলছে হানা, স্বাধীন দেমের আজব রীতি,মুখ থেকেও রুদ্ধ বাক্, চিচিং ফাঁক হে চিচিং ফাঁক।এমনি করে আজব আজব দেশে, মানুষ গুলো যাতায় পেষে, হঠাৎ করে জ্বললো আগুন, পালায় শকুন কাকের ঝাঁক,চিচিং ফাঁক হে চিচিং ফাঁক। আমরা বাঙালীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় দারিদ্রের কষাঘাতে বিপর্যস্ত কে সুনিপুন ভাবে তার ছন্দের যোজনায় তুলে ধরেছেন একটি কালজয়ী ছড়ায়। অসময়ে মেহমান,ঘরে ঢুকে বসে যান,বোঝালাম ঝামেলার যতগুলো দিক আছে, তিনি হেসে বললেন ঠিক আছে ঠিক আছে। রেশনের পচা চাল, টলটলৈ বাসি ডাল,থালাটাও ভাঙ্গাচোরা, বাটিটাও লিক আছে, খেতে বসে জানালেন, ঠিক আছে ঠিক আছে। মেঘ দেখে মেহমান, চাইলেন ছাতাখান, দেখালাম ছাতাটার শুধু কটা শিক আছে, তবু তিনি বললেন ঠিক আছে ঠিক আছে। ষাটের দশকে লেখা যেই ছড়াটি বাস্তবতার নিরিখে এখনো প্রাসঙ্গিক, বুদ্ধিজীবির বুদ্ধি গায়েব মানি লোকের মান, সত্যবাদীর জিহবা গায়েব নির্বিবাদীর কান। কর্মবীরের শক্তি মগায়েব চিন্তাবিদেও ব্রেন, খাদ্যবাহী নৌকা গায়েব যাত্রীবাহী ট্রেন। বীর জনতার মিছিল গায়েব করতে যাবে কে সে, তারাই আগে গায়েব হবে বিদ্রোহী এই দেশে। তার আরেকটি ছড়া, শিয়াল নাকি লোভ করে না পরের কোন জিনিসটার, কী পরিচয় দিল আহা কী সততা কী নিষ্ঠার! তাই সে হল বনের মাঝে এডুকেশন মিনিস্টার। কী অসাধারণ অন্ত্যমিল। এমন মুন্সিয়ানা ছন্দের দোলনা সুকুমার বড়–য়ার হাতেই সম্ভব। বর্তমান অনেক নেতাই সাধারণ জনগণের সম্মূখে নিজেকে উজার করে দেওয়ার ফাঁকা বুলি ছোড়ে, বাস্তবে নিজের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়। সেটাকে চট্টগ্রামের ভাষায় ছন্দে রূপ দিলেন চমৎকার ভাবে, লাল মিয়া তো বিরাট নেতা, রাস্তা ঘাডে ফাল মারে, দিনত বড় ভালা মানুষ ,রাইত দুপুরে জাল মারে, গরিবরলাই কাঁদি কাঁদি, টেঁয়া পইসার টাল মারে। ছড়া সাহিত্যের কিংবদন্তি সুকুমার বড়ুয়া বাংলা একাডেমী পুরুস্কার, শিশু একাডেমী পুরুস্কার সহ অসংখ্য পুরুস্কারে ভূষিত হয়েছেন। পেয়েছেন অগনিত প্রতিষ্টানের সংবর্ধনা আর মানুষের ভালোবাসা। এই নিরহংকারী মানুষটি জন্ম নিয়েছেন চট্টগ্রামের রাউজান থানার মধ্যেম বিনাজুড়ি গ্রামে ১৯৩৮ সালের ৫ই জানুয়ারী। শৈশবে আর্থিক অনটনের মাঝেও অদম্য সুকুমার দমে যাননি একটুও। স্বশিক্ষিত সুকুমার বড়–য়া শুধু ছড়া লিখেই আজকের ছড়া সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট।
জন্মদিনের এইদিনে জানাই অসীম শ্রদ্ধা ও প্রাণঢালা ভালোবাসা। জয়তু সুকুমার বড়ুয়া।