জাতীয় সংসদ নির্বাচন

692

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা। প্রতি আসনে গড়ে তিন থেকে সাতজন করে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে একই পরিবারের কয়েক ভাই যেমন আছেন তেমনি আছেন পিতা-পুত্র ও চাচা-ভাতিজা। এক্ষেত্রে নিজ ঘরের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে দ্ব›দ্ব না থাকলেও উল্টো কৌশলী সমঝোতায় কয়েকটি আসনে বিভক্ত হয়েই মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন তাঁরা। অর্থবিত্ত, প্রভাব ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ইতিমধ্যে তাঁরা নির্বাচনী এলাকায় আলাদা বলয়ও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। চট্টগ্রামের পাঁচটি নির্বাচনী আসনে এমপি হওয়ার দৌড়ে আছেন পাঁচ পরিবারের কমপক্ষে ১০ জন। এরমধ্যে একজন ছাড়া বাকিরা সবাই আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া পূর্বদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কোথায় কারা মনোনয়ন চাইছেন সব বিষয়ে নেত্রীর কাছে তথ্য আছে। উনি বুঝেশুনেই দলের ভাবমূর্তি বাড়াতে সক্ষম এমন যোগ্য প্রার্থীদেরই মনোনয়ন দিবেন। এক্ষেত্রে কারো প্রভাব ও অর্থবিত্ত খুব একটা কাজে আসবে বলে আমি মনে করি না।’
জানা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জহুর আহমদ চৌধুরী। তাঁর সন্তানদের একজন মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীর বর্তমানে নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। অন্য দুই ছেলে শিল্পপতি হেলাল উদ্দিন চৌধুরী তুফান চট্টগ্রাম-১০ ও জসীম উদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম-৯ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী। একই পরিবারের দুই ভাই মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়ে হেলাল উদ্দিন চৌধুরী তুফান পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। আমাদের পরিবার ঐতিহ্যবাহী পরিবার। আমাদের ভাই-বোন সকলেই দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। আমাদের পরিবারের সবাই যোগ্য এবং মনোনয়ন চাওয়ার অধিকার রাখে। সেক্ষেত্রে আমরা দুই ভাই মনোনয়ন চাইছি। নেত্রী এখন চাইলে দুইজনকেই মনোনয়ন দিতে পারেন, আবার কাউকে নাও দিতে পারেন। আবার দেখা যাবে, একজনকে দিলেন,
অন্যজনকে দিলেন না। পুরোটাই নেত্রীর সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর। তবে আমরা মনোনয়ন পাই কিংবা না পাই দলের স্বার্থে জন্য যা যা করা দরকার তাই করবো।’
চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসন। এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইছেন বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থী। এরমধ্যে সদ্য পদত্যাগ করা প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিও আছেন। এ আসন থেকে তিনি ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কোতোয়ালী ও বোয়ালখালী আসন থেকে মনোনয়ন চাচ্ছেন নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ও সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। আবার নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে ও সানোয়ারা গ্রæপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে মনোনয়ন চাইছেন। একই আসন থেকে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের সাথে তাঁর ছোটভাই কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি ও ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামও মনোনয়নপ্রত্যাশী।
নানা কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত সাবেক সিটি মেয়র মনজুর আলম। আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ২০১০ সালে সিটি মেয়র হয়েছেন। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দীনের কাছে পরাজিত হন। পরে আবারো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মায়ের নামে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সমাজসেবায় মনোনিবেশ করেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে নিয়ে এ সংগঠনের হয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবেই চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-ডবলমুরিং) আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলেই প্রচার আছে। সেসময়ে চাচা বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে সীতাকুন্ডে বাজিমাত করেন মনজুর আলমের ভাতিজা দিদারুল আলম। এবারো তিনি সীতাকুন্ড থেকে মনোনয়ন চাইবেন। সে হিসেবে চাচা মনজুর আলমের সাথে ভাতিজা দিদারুল আলমও এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলম পূর্বদেশকে বলেন, এখনো নির্বাচন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। জনগণ চাইলে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তের বিষয় আছে। এখনো দলের সিদ্ধান্ত হয়নি। আমার ভাতিজাও সীতাকুন্ড থেকে চাইবেন। সে যেহেতু এখনো সাংসদ আছে তার মনোনয়ন চাওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে কোন দলের হয়ে নির্বাচন করবেন তা খোলাসা করেননি সাবেক মেয়র। তিনি বলেন, এরকম কিছু হলে আমি নিজেই আপনাদের ডেকে বলবো।
চট্টগ্রাম-১ মিরসরাই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইছেন তরুণ ব্যবসায়ী নেতা নিয়াজ মোর্শেদ এলিট। তাঁর বাবা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইউসুফও এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী। বাবা বিএনপি থেকে ও ছেলে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী, নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কৌতুহল আছে। তবে হেভিওয়েট প্রার্থী গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পরিবর্তে সেখানে আওয়ামী লীগ থেকে অন্যকারো মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু আছে তা নিয়েও সন্দিহান ভোটাররা।
তরুণ ব্যবসায়ী নেতা নিয়াজ মোর্শেদ এলিট পূর্বদেশকে বলেন, ‘মনোনয়ন চাইবো। পরিবেশ পরিস্থিতি যা করবে তাই হবে। নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিলে সবাইকে নিয়ে কাজ করবো। তৃণমূলে যে গ্রæপিং আছে তা নিরসন করে এলাকার উন্নয়ন করবো।’ বাবার মনোনয়ন প্রত্যাশার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ও আমার পরিবারের অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রের সবাই জানে। আমার কাজ আমি করছি, বাবার কাজ বাবা করছেন। আমি আমার বাবার বাইরে গিয়ে রাজনীতি করছি এটাই অনেক বড় বিষয়।’