জাতীয় নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং ব্যবহার : একটি পর্যালোচনা

কাজী রশিদ উদ্দিন

11

এমনিতেই দেশে সমস্যার অন্ত নেই। তারপরেও মানব-সৃষ্ট নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করা হচ্ছে। টেলিভিশনের জনপ্রিয় সঞ্চালক নবনীতা চৌধুরীর ভাষায় ‘সবকিছুরই নিয়ন্ত্রন রাজনীতি’-এর নতুন সংস্করণ হলো আগামী জাতীয় নির্বাচনে ১০০টি আসনে ভোট গ্রহণ হবে ইভিএম পদ্ধতিতে অর্থাৎ ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে টিপ দেওয়ার মাধ্যমে। এর জন্য খরচ হবে প্রায় ৪০০০ হাজার কোটি টাকা। অথচ নির্বাচনের আর এম ৩ থেকে ৪ মাস বাকি। রাজনৈতিক দলের কোন পক্ষ থেকেই ‘ইভিএম’ এর জন্য কোনও দাবি উঠেনি। দেশটি তো জনগণের, একজন রাজনৈতিক প্রধান নেতার মতে যে দেশের অধিকাংশ জনগণ এখনও টিপসইও দিতে পারেনা, তাদের জন্য মেশিনে টিপ দিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া সম্ভব কি? তাছাড়া এত কম সময়ের মধ্যে ভোটারদের মেশিনে ভোট দেওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়াও সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এই মেশিনে ভোট দেওয়ার পদ্ধতির বিরোধিতা করে আসছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার, জনাব মাহবুব তালুকদার এর বিরোধিতা করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে ইভিএম সিদ্ধান্ত নেয়ার সভা থেকে বেরিয়ে এসে এর কারণ ব্যাখ্যা করে সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন। হঠাৎ করে দেশের জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে এ সিদ্ধান্তের ফলে জনমনে নানান প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। আগামী সাধারণ নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং এ মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে এখন বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে। আমরা আবার বলছি নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু অনেক রাজনৈতিক দল যারা নির্বাচনের ‘স্টোক হোল্ডার’ তারা এর বিপক্ষে। নির্বাচন কমিশন দাবি করছে সারা পৃথিবীতে ইভিএম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, একথা সঠিক নয়।
গত ১০ বছরে পৃথিবীর যতগুলি দেশ ইভিএম গ্রহণ করেছে, তার চেয়ে বেশি দেশ ইভিএম বাতিল করেছে। বাতিল করেছে এমন দেশের তালিকায় আছে ইতালি, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, জার্মানি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি রাজ্য। সম্প্রতি ভারতেও বিরোধী দলগুলো ইভিএমের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী আমাদের নির্বাচন কমিশন যে ইভিএম ব্যবহার করতে চায়, তা সফ্্টওয়্যার এবং হার্ডওয়্যারের সমন্বয়ে গঠিত। ব্যালট ইউনিটে প্রার্থীদের নামও মার্কা সংবলিত ছবি এবং সুইচ থাকবে। কন্ট্রোল ইউনিটে চারটি অংশ থাকতে পারে প্রসেসর, স্মৃতি, ডিসপ্লে ও ব্যাটারি। ভোটার তার পছন্দের মার্কা সংশ্লিষ্ট সুইচে চাপ দিবেন এবং কন্ট্রোল ইউনিট প্রার্থী অনুযায়ী ভোট প্রসেস করে ভোটের হিসাব রাখবে। ভোট শেষে প্রার্থীদের এজেন্টদের উপস্থিতিতে কন্ট্রোল ইউনিট থেকে ভোটের ফলাফল জানা যাবে।
এখানে একটা সমস্যা আছে। ধরা যাক, একটি নির্বাচনে চারজন প্রার্থী ক, খ, গ ও ঘ ভোটের সংশ্লিষ্ট বাটনে চাপ দিবেন। একটি আদর্শ অবস্থায় কন্ট্রোল ইউনিটের প্রসেসর ব্যালট ইউনিট থেকে প্রেরিত সংকেত অর্থাৎ চারজন প্রার্থীর ভোট আলাদা আলাদাভাবে স্মৃতি ধরে রাখবে। চারজন প্রার্থীর ভোট আলাদা আলাদাভাবে প্রসেস করে তা স্মৃতিতে প্রেরণের জন্য কন্ট্রোল ইউনিটের মাইক্রো চিপকে প্রোগ্রাম করা হবে। মূল সমস্যাটা এখানেই। এই মাইক্রো চিপকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা সম্ভব যে একজন ভোটার ক, খ কিংবা গ যাকেই ভোট দিক না কেন, তা ক প্রার্থীর ভান্ডারে জমা পড়বে। মোটামুটিভাবে দক্ষ একজন প্রোগ্রামারের জন্য এটা করা খুব সহজ। আবার এমনও করা সম্ভব যে বিশেষ কিছুসংখ্যক ভোটের হিসাব ঠিকমতো রেখে পরে চিপ তার আচরণ বদলে ফেলবে। পুরোটা নির্ধারণ করছে সফ্্টওয়্যারের সোর্স কোডের ওপর।
ব্যালটের মাধ্যমে যখন ভোট গ্রহণ করা হয়, তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ব্যালট বাক্সটিকে প্রার্থীদের এজেন্টদের সামনে উন্মুক্ত করে দেখান। ইলেক্ট্রনিক মেশিনের ক্ষেত্রে তিনি আসলে কী দেখাবেন? ভোটিং মেশিনের কন্ট্রোল ইউনিটের চিপ কীভাবে প্রোগ্রাম করা আছে, সেটা দেখাবেন কি? সেটা দেখাতে পারলেও আদৌ বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেখাতে পারবেন কি? এই সফটওয়্যারের সোর্স কোড দেখাবেন কি? দেখালেও তা বুঝবে কে? একটি ইভিএমের সার্কিট বোর্ডের স্থাপত্যেও দেখা জরুরি। কন্ট্রোল ইউনিটের সার্কিট বোর্ডে একটি ইনফ্রারেড রিসিভার সার্কিট এমনভাবে জুড়ে দেওয়া সম্ভব যে, বাইরে থেকে মোবাইল ফোনের ব্লু-টুথ সংযোগের মাধ্যমে ভোটের সর্বশেষ অবস্থা জানা যাবে এবং তা পরিবর্তনও করা যাবে।
২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত আমাদের নির্বাচন কমিশন ‘ইভিএম’ সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় জানিয়েছে। প্রতিটি ইভিএম স্বতন্ত্র এবং কেউ একসঙ্গে এগুলোতে ব্যবহৃত সফ্্টওয়্যার পরিবর্তন করতে পারবে না। এই ইভিএমগুলোর কোনো কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে না। ইভিএমগুলোতে সফ্্টওয়্যার ইনস্টল করার সময় সব রাজনৈতিক দলের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা সেখানে উপস্থিত থাকবেন। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আমরা একমত। কেউ একসঙ্গে সবগুলো ইভিএমে ব্যবহৃত সফটওয়্যার পরিবর্তন করতে পারবে না। তবে সেটা করার দরকারও নেই। বাংলাদেশের শতকরা ১০ ভাগ ইভিএমকে টেম্বার করলেই নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেওয়া সম্ভব। আর যেহেতু ইভিএমগুলোর স্বতন্ত্র এবং কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ থাকবে না। সেহেতু ইভিএম ইভিএম শুধু ভোট গণনার সময় কমিয়ে আনবে। সার্বিকভাবে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার সময় কমিয়ে আনবে না।
ইভিএমের আরেকটি কারিগরি অসুবিধা হলো এই যে, ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে একজন ভোটার তার পছন্দ মতো বাট ঠিকই পুশ করবেন কিন্তু দেখতে পারবেন না ভোটটা তার পছন্দের প্রার্থী পেলেন কিনা। জার্মানির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইয়োকিম ভিসনা এবং তার পুত্র উলরিখ ভিসনা এই অসচ্ছলতার কারণেই জার্মানির সাংবিধানিক আদালতে ইভিএম বাতিলের আবেদন করেন। ২০০৯ সালের ৩ মার্চ আদালত নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। সাংবিধানিক আদালতের বিচারক বলেন, ইভিএম অস্বচ্ছ এবং ইভিএম দিয়ে কীভাবে ভোট গ্রহণ ও গণনা করা হয়, তা একজন সাধারণ ভোটারের বোঝার কোনো ক্ষমতা নেই। তাছাড়া, ইভিএমে ভোট দেওয়ার পরে স্পর্শ করার মতো কোনো দালিলিক প্রমাণ থাকে না। তাই পরবর্র্তীকালে ফলাফল নিরীক্ষণ করার কোনো সুযোগ নেই। ইভিএমের সফ্্টওয়্যার কিংবা হার্ডওয়্যার ভোটে কোনো প্রতারণা কিংবা ভুল করছে কিনা, তা পরবর্তীকালে যাচাই করার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টা দপ্তরের হিসাবের গন্ডগোল দূর করার জন্য হিসাবরক্ষণ বিভাগকে অবলোপন করার মতোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ কাউন্টিতে ভোটাররা ভোট দেন ব্যালট পেপারে। সে ব্যালট পেপার ইলেক্ট্রনিক কাউন্টিং মেশিন দিয়ে গণনা করা হয়। এতে একটি সুবিধা হলো, যেহেতু ব্যালট পেপারের অস্তিত্ব আছে, সেহেতু গণনায় ভুল হলে নতুন করে গণনা করা যায়। আমাদের আলোচিত পদ্ধতিটিকে বলা হয় ডিআরই(ডিরেক্টলি রেকর্ডিং ইলেক্ট্রনিক) সিস্টেম।
পদ্ধতিগতভাবেই এটি কম নিরাপদ। একজন শিক্ষানবিশ প্রোগ্রামারও এর জন্য এমনভাবে কোড লিখতে পারবেন। যাতে একজন ভোটার ভোট দেওয়ার পর ডিসপ্লেতে দেখা যাবে একরকম, মেমোরি মডিউলে লেখা হবে আরেক রকম এবং ফলাফল তৈরি করবে আরেক রকমভাবে। ঝুকিটা অনেক বেশি, সে তুলনায় প্রাপ্তিটা হবে অতিনগণ্য। যেহেতু পেপার ট্রেইল নেই, কারচুপির অভিযোগ উঠলে তা প্রমাণ করা কার্যত অসম্ভব। নেদারল্যান্ডস ইলেক্ট্রনিক ভোটিং বাতিল করেছে কারচুপির কারণে নয় বরং এই মেশিন টেম্পারিং করা যাবে না এ ধরনের কোন নিশ্চয়তা ছিল না বলে।
নির্বাচন কমিশন বলেছে, ইভিএম নির্বাচনী ব্যয় কমিয়ে আনবে। কীভাবে কমিয়ে আনবে, কতটুকু কমিয়ে আনবে সে সংশ্লিষ্ট সঠিক কোনো তথ্য-উপাত্ত আমাদের জানা নেই। আমরা এও শুনেছি যে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন পরিবেশবান্ধব। একটি নির্বাচন কতটুকু পরিবেশবান্ধব। তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচন কতটুকু স্বচ্ছ হবে। নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য ব্যয়সংকোচন কিংবা পরিবেশ রক্ষা নয় জনগণের অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশকে নিরপেক্ষ ও সঠিকভাবে সংখ্যার মাধ্যমে প্রকাশ করা। আর যারা মনে করেন, ইভিএম খুব অল্প সময়ে নির্বাচনের ফলাফল দিতে পারে, তাদের জেনে রাখা ভালো জাতীয় নির্বাচনের দ্রুত ফলাফল আমাদের কখনোই কোনো জোরালো দাবির মধ্যে ছিল না। ইভিএম জালভোট দেওয়া বন্ধ করতে পারবে না এবং জোর করে ভোট দেওয়াও বন্ধ করতে পারবে না। ভোটকেন্দ্র থেকে ব্যালট পেপারও ব্যালটবাক্স ছিনতাই আমাদের দেশে সাধারণ ঘটনা একটি কেন্দ্র থেকে এক-দু’টি ব্যালট বাক্স ছিনতাই হলে শুধু ছিনতাই হয়ে যাওয়া বাক্সের ভোট গণনায় আসবে না। কিন্তু যদি ইভিএমই ছিনতাই হয়ে যায় ? নির্বাচন নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ চরমে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। এ রকম একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার সন্দেহ-অবিশ্বাস আরও বাড়াবে। নির্বাচন আরো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বৈধ-অবৈধ লীলাখেলা ও হঠাৎ তোড়জোর তৎপরতা থেকে এটুকু সুষ্ঠু বিষয়টি নিয়ে নানা আশঙ্কা প্রকাশের সমূহ কারণ রয়েছে। এমনিতে আগামী নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে এখন পর্যন্ত জাতি একটি সর্বসম্মত উপায় উদ্ভাবন করতে পারে নি। সে কারণে গোটা জাতি আগামী নির্বাচন সবার অংশগ্রহণমূলক করা নিয়ে রয়েছে নানা শঙ্কা। অপর দিকে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশন আরেকটি বিতর্ক বা সমস্যার জন্ম দিতে যাচ্ছে কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ? এমন প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক, এমন পরিস্থিতিতে ইভিএম ব্যবহারের চিন্তা থেকে সরে এসে দেশবাসীর চাওয়া-পাওয়ার একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের চিন্তায় মনোনিবেশ করবে। এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।
শেষ কথা হলো ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করতে হলে এর সাথে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আগামী সংসদ নির্বাচন আজ থেকে যে সময়ের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত হবে সে সময়ের মধ্যে ইভিএমে ভোটগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষিত করে তোলা কিছুতেই সম্ভব নয়। সুতরাং জনমত যাচাই ছাড়া কেন এবং কী উদ্দেশ্যে জনগণ প্রদত্ত করের অযৌক্তিক অর্থ ব্যয়ে ইভিএমের মাধ্যমে এই ভোটগ্রহণের উদ্যোগ তা আমরা বুঝতে পারি না।
(বি. দ্র. ) এই লেখাটি লিখতে গিয়ে একজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের (ইভিএম) সাহায্য নিয়েছি।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট