জাতীয় দল মাতাচ্ছে পাহাড়ের যমজ বোন

এম কামাল উদ্দিন, রাঙামাটি

26

পাহাড়ের অজপাড়ায় জন্ম তাদের। নুন আনতে পান্তা ফুরায় পরিবারের। এমন পরিবারে গর্ভবর্তী স্ত্রীর জন্য ছিল না বিশেষ কোন ব্যবস্থাও। গর্ভাবস্থায় আপ্রুমা মগিনি বুঝতে পারলেন, তার গর্ভে বাচ্চা নড়াচড়া করছে না। মুহূর্তেই উৎকণ্ঠা বেড়ে গেল পরিবারটির ।
সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না তাদের। অবশেষে এক রবিবার সকালে ঘর আলো করে ফুটফুটে এক নবজাতক। তাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠার আগেই বিস্ময়করভাবে মিনিট দুয়ের ব্যবধানে আরেক নবজাতকের আগমন। দু’জনই কন্যাশিশু। মারমা পরিবারটিতে উৎসবের বদলে বাজল বেদনার সূর।
সেই যমজ দুইবোন আজ নারী জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় আনুচিং মারমা ও আনাই মারমা। জন্মের পর যে দুই মুখে খাবার তুলে দেওয়ার ভয় পেয়েছিলেন বাবা রিপ্রু মারমা আজ তারাই তাদের বাবার নির্ভরতার প্রতীক। গল্পটা শুনে নিই বাবার মুখ থেকে।
পরিবারের কেউ জানতাম না আমার স্ত্রীর গর্ভে দু’টি বাচ্চা আছে! প্রথম বাচ্চা জন্ম নেওয়ার পর ভালই লাগল। কিন্তু যমজ বাচ্চা দেখে অবাক হলাম, খারাপও লাগল। অভাবের সংসার কি দিয়ে কি করি? এখন ওদের নিয়ে আমি গর্ব করি।
যমজ বোন আনুচিং ও আনাই কয়েক বছর ধরেই খেলছে মহিলা জাতীয় দলে। একই সঙ্গে বয়সভিত্তিক দলেও নিয়মিত মূখ। গত বছর ঢাকায় এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাই পর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে বেশ উপার্জনও হয়েছিল তাদের যা অস্বচ্ছল পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। তাদের উপার্জনে নতুন বাড়ি হয়েছে। কেনা হয়েছে জমিও।
পার্বত্য চট্টগ্রাম খাগড়াছড়ির সাতভাইয়া পাড়ায় তাদের বসবাস। মা-বাবা এবং চার বোন ও তিন ভাই মিলে বড় একটি পরিবার তাদের। বাবা-মা দুজনেই কৃষক। ভাইয়েরা রাজমিস্ত্রি। এমন পরিবারে ফুটবলার যমজ বোনই এখন আশার প্রদীপ! তাদের জন্য পরিবারটিকে জেলায় সবাই চেনে।
এক গর্ভে একই সঙ্গে জড়াজড়ি করে তারা থেকেছেন দশমাস। পৃথিবীর আলো বাতাস দেখেছে দু মিনিট আগে-পরে। কিন্তু তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পুরোপুরিই ভিন্ন।
আনুচিং সবসময় ঘুরে বেড়াতে অভ্যস্ত। মুখে সবসময় হাসি লেগেই থাকে তার। আর আনাই বড্ড লাজুক। গা ঢাকা দিয়ে রাখতে পারলেই বাঁচে। বড় বোনকে পাশে রেখে ছোট বোন আনুচিং নিজেই বলে, ওর সঙ্গে আমার তো কোন মিলই নেই। এমনকি ও যে খাবার পছন্দ করে, তা আমার বেশি পছন্দ না। খেলার মাঠেও তাদের চরিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। ছোট আনুচিংয়ের কাজ গোল করা আর বড় আনাইয়ের কাজ গোল ঠেকানো। চলতি অর্নূধ্ব-১৫ সাফে আনুচিং প্রথম ম্যাচেই নেপালের বিপক্ষে করেছে জোড়াগোল। আর আনাই ডিফেন্ডার হিসেবে অতন্দ্রপ্রহরী।
তবে দুজনের ফুটবলার হওয়ার গল্পের শুরুটা ছিল একই সঙ্গে। তা হলো ২০১১ সালের বঙ্গমাতা ফুটবল। এরপর খাগড়াছড়ি জেলা দলের হয়ে খেলে ২০১৫ সালে অর্নূধ্ব-১৪ জাতীয় দলে জায়গা করে নেয়। তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব -১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে পাঁচটি গোলও আছে আনুচিংয়ের। এরপর থেকেই জাতীয় ও বয়সভিত্তিক দলের নিয়মিত মুখ তারা।
খেলা হলেই দু’বোনের ছবি ভেসে ওঠে টিভির পর্দায়, বড় বড় ছবি যায় স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায়। রিপ্রু ও আপ্রুমা মারমা গর্ব নিয়ে দেখেন, সমাজকে দেখান। আর আনমনে বলে ওঠেন, যাদের জন্ম দেখে ভয় পেয়েছিলাম আজ তারাই দেশের প্রদীপ।