জলাবদ্ধতার কবলে নগরী চট্টগ্রামবাসীর দুঃখ ঘুচাবে কবে?

18

বর্ষা মানেইতো বৃষ্টি। সুজলা সুফলা শষ্য শ্যামল এ বাংলার আরেক নাম ভাটির দেশ। বৃষ্টি না হলে বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যে দারুণ অপূর্ণতা থেকে যাবে। এ বৃষ্টি কৃষিপ্রধান দেশের জন্য অবশ্যই আশীর্বাদ। কিন্তু কৃষিভূমিহীন নগরবাসী যাদের নিবাস দালানে, চারদিকে ইটের অট্টালিকা, অফিস-আদালত, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও ইউনিভার্সিটি সেখানে থই থই পানি মানেই তো অভিশাপ। আর অভিশপ্ত নগরটির নাম সম্ভবত চট্টগ্রাম। প্রায় তিন দশকের অধিক সময় ধরে চট্টগ্রাম নগরবাসী পানিবন্দি জীবন থেকে মুক্তির আহাজারি করছে। মাঝে মাঝে ত্রাতারা হাজির হন মুক্তির পয়গাম নিয়ে, যখনি তাদের আসন পোক্ত হয় তখন ত্রাতারা হারিয়ে যায়, নগরবাসী আবারও বিলাপ কান্নায় মেতে উঠে। হায়রে নগরবাসী! হাজার কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগের পরও জলাবদ্ধতা থেকে এখনও মুক্তি না মেলা চট্টগ্রামবাসীর দুর্ভাগ্যই বলা যায়। গতকাল দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, একদিকে ভারি বৃষ্টিতে অব্যাহতভাবে চলছে জলজট তার উপর ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়িতে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে, বিমানবন্দর সড়ক থেকে শুরু করে নগরীর প্রতিটি অলিগলি তীব্র যানজটের সৃষ্টি করছে ওয়াসার এ উন্নয়ন তান্ডব। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জলজট, যানজট ও কাদায় নাকাল নগরবাসী। ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকায় নগরীর বেশিরভাগ এলাকা এখনো পানির নিচে। আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, বাদুরতলা, প্রবর্তক মোড়, দুই নম্বর গেট, অলঙ্কার, পাহাড়তলী, চকবাজার, মেহেদিবাগ, অক্সিজেন মোড়, মুরাদপুর, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, বহদ্দারহাট, পাঁচলাইশ, শুলকবহর, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, বাকলিয়া, হালিশহরসহ নগরীর বড় অংশজুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে মজার বিষয় ফ্লাইওভারের উপরেও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
টানা বর্ষণের কারণে নগরীর প্রধান বাণিজিক মার্কেটগুলো বিশেষকরে, খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, আছাদগঞ্জ, রিয়াজউদ্দিন বাজার পানিতে ডুবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। তার উপর বিষফোঁড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এবারের বর্ষায় সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হিসেবে দেখা দিয়েছে খোঁড়া রাস্তা আর গর্তে জমে থাকা পানি। ওয়াসার খোঁড়ে রাখা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো পানিতে ডুবে যাওয়ায় রিকশা-ট্যাক্সি উল্টে অহরহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন যাত্রীরা।
জানা যায়, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এই প্রকল্পের কোনো সুফল গত কয়েকদিনে দৃশ্যমান হয়নি। মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে নগরীর খালগুলো থেকে মাটি তোলার কাজ শেষ করা যায়নি। দখলদারদের উচ্ছেদ করার কার্যক্রম চলছে। আগামী বছর সুফল পাওয়া যাবে। সিডিএ’র কাজে তেমন কোনো সুফল আসেনি এ পর্যন্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন পরিকল্পিত নয় বলেই নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কাটা স্থান বর্ষার আগে ভরাট করে দিলে এই সমস্যা হত না। বর্ষায় কাজ বন্ধ রাখলেও তেমন একটা সমস্যা হত না। পূর্বদেশে প্রতিবেদনের পাশাপাশি এ সংক্রান্ত প্রকাশিত বিশেষ কলামে সাংবাদিক নাসির উদ্দিন চৌধুরীর মন্তব্য প্রনিধানযোগ্য। তার মতে, প্রতি বছর বর্ষা এলে জল জমে নাগরিক জীবন বিপর্যস্ত হওয়া, এটা তো সংবাৎসরিক চিত্র। ‘রাজা যায় রাজা আসে’, কিন্তু জলাবদ্ধতার কোন প্রতিকার হয় না। শুধু সরকারের পরিবর্তন হয়। নগরবাসীর ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। কেউ কথা রাখেনি। আমরা মনে করি, কথা রাখার প্রক্রিয়ার গলদ দূর করতে হবে। সিটি কর্পোরেশন যেহেতু জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংস্থা, যেহেতু এ সংস্থার মেয়র নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়ার কথা বলে ভোট নিয়েছেন সেহেতু তাকেই অর্থাৎ সিটি কর্পোরেশনকেই সুযোগ দিতে হবে জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দেয়ার। সেই হিসাবে আমরাও মনে করি, সরকার যখন চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বড় একটা তহবিলের জোগান দিচ্ছে, তখন সেটা সিটি কর্পোরেশনকেই তো দেয়া উচিত ছিলো। যেহেতু মানুষের কাছে তাদেরকেই জবাবদিহি করতে হয়, সেহেতু ফান্ডটা তারাই পাক। তারা যদি করতে না পারে, মানুষ তাদেরকে ধরবে।
সিটি কর্পোরেশনকে ক্ষমতাহীন নিধিরাম সর্দার না করে চসিকের ক্ষমতা আরো বাড়ানো দরকার। আর এর জন্য প্রয়োজন সিটি গভর্নমেন্ট-এর । তাহলে সিটি কর্পোরেশন নগর উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও দপ্তরকে নিয়ে বসে সমন্বিত উপায়ে জলাবদ্ধতা নিরসনসহ নগরীর সকল সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারে। আমরা আশা করি, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করতে নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে চসিককে আরো বেশি যুক্ত করতে পারলে নগরবাসী উপকৃত হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।