জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে জনগণকেও সচেতন হতে হবে

4

গতকাল দৈনিক পূর্বদেশে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের আলোকে বিবিসির প্রকাশিত সংবাদ উদ্ধৃতি করে উল্লেখ করা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পৃথিবী এখন জরুরি অবস্থার মুখোমুখি । বিশ্বের ১৫৩টি দেশের প্রায় ১১ হাজার বিজ্ঞানী এ প্রতিবেদনটিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন বলেও সংবাদে উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রের ৪০ বছরের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে করা ওই গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট চিহ্নিত করতে বিশ্বব্যাপী সরকারগুলো ব্যর্থ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় আমূল ও টেকসই পরিবর্তন ছাড়া বিশ্ব ‘অবর্ণনীয় দুর্ভোগের’ পথেই এগিয়ে যাচ্ছে বলেও এতে সতর্ক করা হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, নৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই তারা এই ভয়াবহ হুমকির মাত্রা নিয়ে সতর্ক করছেন। সূত্র জানায় বিগত চল্লিশ বছরের জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়েই এ গবেষণাটি সম্পন্ন করা হয়।
আমরা মনে করি, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তন বিষয়টি সমগ্র বিশ্বে একটি স্বীকৃত সত্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক একটি জাতীয় পত্রিকায় এ সংক্রান্ত একটি প্রবন্ধে বলেছেন, ‘বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে বৈশ্বিক তাপমাত্রার যে রেখাচিত্র আমরা দেখতে পাই, সে অনুযায়ী গত ১০০-১৫০ বছরে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে এক ভিগ্নির কাছাকাছি। এখন ভয় হচ্ছে এই তাপমাত্রা এক ডিগ্রি থেকে বেড়ে চার-পাঁচ ডিগ্রিতে চলে যেতে পারে, যদি না বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া না হয়। আর এই ভয়ের কারণ হচ্ছে এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আবহাওয়া আনপ্রেডিক্টেবল হয়ে যাবে,অনিশ্চয়তা বাড়বে’। এই লক্ষ্যে ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে তাপমাত্রা কোন অবস্থাতেই দুই ডিগ্রির বেশি বাড়তে দেওয়া যাবে না। ২০১৭ সালে উত্তর আমেরিকাতে প্রচÐ শীত লক্ষ্য করা গেছে। এসময় আমরা দেখেছি আমাদের দেশে চৈত্র মাসের বৃষ্টি আষাঢ় মাসের মত রূপ ধারণ করেছে। একই সাথে আমরা অক্টোবর নভেম্বর মাসে বৃষ্টি হতে দেখেছি। ফলাফল হাওর অঞ্চলে প্রচÐ বন্যা। বন্যার কারণ সরকারী হিসেবে বাঁধ টপকে পানি ঢুকেছে। হঠাৎ করে এ ধরনের অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টির কারণে পার্বত্যাঞ্চলে ভূমি ধস হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় বাড়ছে, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে, বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়ছে, নদী ভাঙনের মাত্রা বাড়ছে। জলবায়ুর এ পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদনে এবং জীবিকার ওপরে। জীবিকার ওপর প্রভাব পড়লে এবং খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে মানুষ দেশান্তরিত হবে।
সংকট মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা এখনই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারে উচ্চহারে কার্বন ফি নির্ধারণ, জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে কাজ করা কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকি দেওয়া বন্ধ, তেল ও গ্যাসের স্থানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারবৃদ্ধি, মিথেন, হাইড্রোফ্লুরোকার্বনের ব্যবহার কমিয়ে আনা, জমির বিনাশ ঠেকানো, বন, তৃণভূমি ও ম্যানগ্রোভ বন যেগুলো বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে তার পরিমাণ বাড়ানো, মানুষের খাদ্যভ্যাস বদলে ফেলা- বিশেষ করে মাংসে আসক্তি কমানো, খাদ্য অপচয় কমানো, কার্বন নিঃসৃত জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধি থেকে সরে আসা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। আমরা বিজ্ঞানী ও গবেষকদের এ পরামর্শগুলো যথার্থ যৌক্তিক বলে মনে করি।
জলবায়ু নিয়ে আমাদের আতঙ্ক যেমন আছে তেমনটি আশাবাদের অনেক বিষয়ও রয়েছে। আমরা জানি, ১১ বছর আগে ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতায় আসে তখন এই বিষয়ে ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট জেঞ্জ স্ট্র্যাটেজিক এন্ড একশন প্লান ২০০৯’ নামে যে দলিল অনুমোদন করে, ওই সময়ে পৃথিবীর কোন দেশে ওই পরিমাণ প্রস্তুতি ছিল না। বাংলাদেশ ২০০৯ এ বলতে পেরেছে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের কি করা উচিৎ বিশ্বের কি করা উচিৎ। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, এরপর প্রায় ৮-১০ বছর পার হয়ে গেল এ ব্যাপারে বাংলাদেশের খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। বিশ্বে বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবেলা করার জন্যে অর্থায়নের কথা বলা হচ্ছে, বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর জন্যে গ্রিন হাউস গ্যাস উৎপাদন বন্ধের জন্যে প্রস্তাব রাখা হচ্ছে এবং উন্নয়শীল দেশগুলোকে তাদের এডাপটেশন বা অভিযোজন প্রশমনের জন্যে প্রচুর অর্থায়নের কথা বলা হচ্ছে এবং তার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এ ফান্ডের অংশিদারও বটে। এখন সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে এ তহবিল থেকে অর্থ ছাড়করণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে দায়িত্বটা কার ? উত্তর হচ্ছে সকলের। সরকারের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের পাশাপাশি জনগণেরও । সরকার সব আয়োজন করার পর জনগণ সাড়া না দিলে এ দুর্যোগ থেকে উত্তরণ মোটেই সম্ভব নয়। আমরা আশা করি, সরকার এবং দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় কাজ করবে।