জলকথা

রোমেনা আফরোজ

18

মরা দুই বোন। রাবু আমার চেয়ে দুই বছরের বড়।
রাবু শুধু সুন্দরী নয় বুদ্ধিমতীও। ওর সৌন্দর্যের চর্চা সবখানে। সকলের মুখে। এমনকি আশেপাশের কয়েক গ্রামের মানুষও বড়দি’কে চিনে। সে কারণেই কিনা কে জানে ওকে খানিকটা অহংকারী মনে হয়। সচরাচর দিদির সাথে মিশতে একটু কষ্ট হয় আমার। বরাবরই ওর ছায়াকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। শুধু যে বড়দি’র কারণেই দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা নয়। এজন্য বোধহয় আমিও খানিকটা দায়ী। বড়দি’র পাশে দাঁড়ালে সবাই বলে, দুই বোনে কোন মিল নাই। আকাশ আর পাতাল ব্যবধান। এসব শুনলে খুব অভিমান হয়। অভিমান জমে জমে পাহাড়। পর্বত। আমি পর্বত ডিঙোতে পারি না। ছাদে যেয়ে উত্থাল-পাতাল কান্না করি। আকাশকে অভিযোগ দেই। অন্ধকারকে নালিশ জানাই। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে দেখছি, আমাদের বাড়ির মেয়েরা সন্ধ্যার পর ছাদে যায় না। অথচ সে সময়ের পৃথিবী অসম্ভব সুন্দর। রঙিন।
বড়দি’র সাথে জহির স্যারের তুমুল প্রেম চলছে। সবকিছু জেনেও আমি চুপচাপ। ভাবি, স্যারের সাথে পালিয়ে গেলে বেশ হয়। কালো বলে সবাই যে অপমান করে তা বড়দি’র প্রস্থানের সাথে সাথে দূর হয়ে যাবে বলেই বিশ্বাস করি। কিন্তু সেই স্বপ্নে মা বাধ সাধলেন। কী করে যেন সবকিছু জেনে গেলেন। তারপরেও কোন শব্দ নেই। বিষয়টা যে বাবাকে জানাননি সেটা ¯পষ্ট বোঝা যায়। কোন বিষয় বাবার গোচরে যাওয়া মানে হৈচৈ, অতঃপর পুরো পরিবারের মাথাব্যথা। আগেও লক্ষ্য করেছি, মায়ের কৌশলগুলো একেবারে অন্যরকম। বাবার মত নয়। আড়াল থেকে এমনভাবে কলকাঠি নাড়েন যে বোঝা যায়, দক্ষ খেলোয়ার।
কিছুদিন পর, কী এক অজুহাতে জহির স্যারের যাতায়াত বন্ধ। তখনি সন্দেহ হলো। কিন্তু প্রশ্ন করতে যাওয়ার দুঃসাহস নেই। সারাদিন মনটা খচখচ করে। স্যারের কথা ভেবে বিষণ্ণ। আসলে স্যারদের অবস্থা তেমন ভালো নয়। বলা যায়, টিউশনের টাকাটেই সংসার চলে। এখন কিভাবে সংসার চলবে তাই ভেবে মায়ের ওপর রাগ হয়। শুনেছি, উনার মা ভীষণ অসুস্থ। যখন তখন অবস্থা। বুঝি না, এতো কঠোর পদক্ষেপের কী প্রয়োজন ছিলো। একটু কড়া করে শাসন করে দিলেই তো সব চুকেবুকে যেতো।
বিকেলবেলা খেলতে যাবো। শুনতে পেলাম বড় চাচী মা’কে প্রশ্ন করছেন, কী রে ছোট, জহির যে আসে না। ছেলেটার কী অসুখ-বিসুখ করেছে নাকি!
-না দিদি। এরপর নীরবতা। আমি কান খাড়া করে আছি অজুহাত শোনার জন্য।
-তাহলে যে পড়াতে আসে না!
-ওর পড়ানো ভালো ঠেকছে না দিদি….
-কী বলিস! ও তো আমার বড় ভাইয়ের ছেলেটাকে পড়ায়। আর জানিস তো মোহন স্কুলের ফাস্ট বয়।
-বাদ দাও দিদি। যা গেছে তা গেছে।
আমাদের বাড়িতে স্যারের বিষয়ে আর কোন আলাপ হলো না। এমনকি বড়দির মধ্যেও কোন প্রতিক্রিয়া নেই। যেন মানুষটার জন্য মন পুড়ছে না তার। কিন্তু জানি দিদির মধ্যে তোলপাড় হয়। আমার মধ্যেও অল্পস্বল্প।
সবকিছু আগের নিয়মেই চলছে। পূর্বের মতো দিদির ছায়া ডিঙিয়ে স্কুলে যাচ্ছি। একই স্কুল আমাদের। একই পথ। অথচ বড়দি বের হওয়ার দশ কি পনেরো মিনিট পর বাড়ি থেকে বের হই আমি। মা প্রায় ধমক দেন। এজন্য প্রতিদিন একটা না একটা ছুতো বের করতে হয়। প্রায়দিন বলি, মা আমার অংক বইটা পাচ্ছি না। টেবিলের ওপর থেকে কে সরালো। সে নিয়ে মমতার মায়ের সাথে তুলকালাম কান্ড, তোমাকে না বলেছি আমার জিনিসপত্র ছোঁবে না। মাঝেমধ্যে ভাবি, স্কুলে যাবার আরেকটা পথ থাকলে বেশ হতো। যে পথে দিদি চলাচল করে সেই পথের গাছপালাকে কেমন জানি পরপর লাগে।
দু‘দিন পর।
বিকেলের দিকে মা’কে দেখলাম হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে যাচ্ছেন। তার চলনে-বলনে একটা ব্যগ্র আর উত্তেজনাভাব। সাধারণত মা কিংবা বয়স্করা দোতালায় যান না। তারা একতলার বাসিন্দা। বড়দের মধ্যে শুধু ছোট চাচাই আমাদের সাথে থাকেন? সম্ভবত নজর রাখার জন্য এই ব্যবস্থা। মায়ের গমন পথের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন খটকা লাগে। দাদির ঘর থেকে শুনতে পাই, মা দিদিকে বলছেন, কাল থেকে তুই আর স্কুলে যাবি না। ঔটুকুই। আর কোন শব্দ নেই। শাসন নয়। এমনকি অপরপক্ষও প্রতিবাদহীন। কথাটা বলে মা হনহন করে নিচে নেমে গেলেন। এমন সিদ্ধান্তের কারণ ঠিক বুঝতে পারলাম না। দিদির বন্দিদশা আঁচ করতে পেরে মনটা বিষণè হয়ে গেলো। সন্ধ্যাবেলা কোথা থেকে যেন নাইম দৌড়ে এল। চোখ-মুখ দেখেই বোঝা যায় কিছু একটা ঘটেছে।
-কী রে গোয়েন্দা। কোন গোপন খবর আছে নাকি?
-কাল রাবুদি’কে দেখতে আসবে……
-কী? বিস্ময়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম। কিছুটা সংযত হয়ে বললাম, কে বলল?
-বাবা আর চাচা মিলে আলোচনা করছেন।
এতক্ষণে বিষয়টা ¯পষ্ট হলো। তাতে সব রাগ গিয়ে পড়লো মায়ের ওপর। যদিও আমার বিষণèতা কিংবা মন খারাপের কারণ নেই। অথচ মনোগৃহে মেঘ জমেছে। দিদির ঘরে উঁকি দেয়ার লোভ হলো। কিন্তু ওদিকে না তাকিয়ে হাঁটছি। ঘটনার সত্যতার জন্য বেশিদূর যেতে হলো না। রান্নাঘর থেকে চাচীর গলার আওয়াজ পেলাম, কীরে মেয়েটাকে এখনি বিয়ে দিয়ে দিবি! আর একটু লেখাপড়া করতে দিলে হয় না। আমাদের বকুলকেও তো এসএসসি’র পরে বিয়ে দিলাম।
রাতে, খাবারের টেবিলে বড়দি অনুপস্থিত। বিকেলের পর থেকে কোথাও তার ছায়া দেখতে পাইনি। ওপরের দিকে তাকাতে দেখলাম, ঘরটা অন্ধকার। সবাই কথা বলছে তবুও কেমন থমথমে পরিবেশ। আজ আমার আনন্দের দিন। অনেকদিন পর সবার সাথে খেতে বসেছি। ওদিকে পরম শত্রু চলে যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু কেন যেন তুমুল ঝড়। কান্নার সংকেতধ্বনি। একটা চাপা কষ্ট নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।
তখনো সকাল হয়নি। হঠাৎ ঘুম ছুটে গেলো। দু’চোখ মেলে বুঝতে চাইছি, ঠিক কী কারণে জেগে উঠলাম। কোন শব্দ হলো নাকি বিড়ালটা কিছু ফেলেছে। এদিক-সেদিক তাকিয়েও কিছু আন্দাজ করতে পারছি না। আবার ঘুমাতে যাবো তখনি শুনতে পেলাম হৈচৈ। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে এর-ওর কথাবার্তা শুনে বুঝে নিলাম, দিদিকে পাওয়া যাচ্ছে না। চাচারা তড়িঘড়ি করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন। মায়ের মুখ কালো, বিষণ্ণ। তার মতো আমারও সন্দেহ হচ্ছে, দিদি বুঝি জহির স্যারের সাথে পালিয়ে গেছে। এমন সময় রজত কাকু দৌড়ে এসে খবর দিলেন, তোমরা সবাই পুকুরপাড়ে চল। একটা লাশ মনে হয় দেখা যাইতেছে।
শুধু জল নয় বড়দি অন্ধকারকেও সমানভাবে ভয় পেতো। বাবা কত শতবার বলেছেন সাঁতার শিখতে। কিন্তু কাজ হয়নি। এমনিতে তার নির্দেশকে অমান্য করার দুঃসাহস কোনদিন দেখায়নি। আর সন্ধ্যার পর ওকে দেখেনি চৌকাঠ পার হতে। সেই মানুষটা অতটা অন্ধকার পার হয়ে কী করে পুকুরপাড়ে গেলো সেটা একটা রহস্য। চিন্তারও বিষয়। কিন্তু সেসব নিয়ে কেউ কোন কথা বললো না। যেন কবর দিতে পারলেই মুক্তি। বড়দি’র মৃত্যুর পরদিন থেকে আমি নিয়ম করে পুকুরপাড়ে যাই। সকাল বিকাল। অনেকক্ষণ বসে থাকি। বোঝার চেষ্টা করি, সেদিন রাতে কী ঘটেছিল। কেনই বা অমন সিদ্ধান্ত। এসব ভেবে স্কুলের সময় পার হয়ে যায়। কখনো মধ্যাহ্ন। এক বিকেলে জহির স্যার এসে ঘুরে গেলেন। কারও সাথে দেখা হয়নি। সন্ধ্যার দিকে শুনতে পেলাম মা রজত কাকুকে চুপিচুপি বলছেন, ঐ ছেলেটাকে আর বাড়িতে ঢুকতে দেবেন না। দরজা থেকে বিদায় করে দেবেন।
অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস মুক্ত হলো।
প্রায় দশ কি বারোদিন পড়ালেখার চাপে পুকুরপাড় যেতে পারিনি। একটু অবসর পেতে সেদিকে হাঁটছি। দূর থেকে অবাক হয়ে দেখলাম, জলে লাল শাপলা ফুটে আছে। অথচ এ পুকুরে কোনদিন লাল ফুল দেখিনি। যে জায়গায় রাবুদি’র শরীরটা উপুড় হয়ে ছিলো ঠিক সেই জায়গায় একটা লাল শাপলা বুঝি পুকুরের জল মাপছে।