জনগণের ট্যাক্স এবং শিক্ষিত নাগরিকের দায়বদ্ধতা

10

ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্

করোনা পরিস্থিতিতে মানুষ যখন ঘরবন্দী, সরকার যখন তার সর্বোচ্চ চেষ্টায় এই ভাইরাস থেকে মানুষকে রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে; দেশ ও মানুষের এই সংকটের সময়ে কিছু উচ্চশিক্ষিত মানুষ নিজেদের নাগরিক দায়িত্ব ভুলে প্রলাপ বকছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু মানুষ নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে এমন সব কথাবার্তা বলছে; এতে তাদের আসল রূপ বা প্রকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। মানুষের সংকটের সময়, দেশের দুর্যোগের সময় শিক্ষিত মানুষের এমন সব আচরণ আমাদের বিবেকবোধের জায়গায় আঘাত করে। করোনা পরিস্থিতির পর এমনিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন বেশ সরগরম। সেদিন ফেসবুকে এক নারী চিকিৎসক (সঙ্গত কারণে নাম বলতে চাইছি না) লিখলেন, ‘জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ডাক্তার হইনি, হয়েছি নিজের বাপের কষ্টের টাকায়। তাই আমি বাসায় বসে থাকতেই পারি। কারণ আমার দায়িত্ব আগে আমার পরিবারকে সেইফ রাখা।’ তার এ স্ট্যাটাস পড়ে খুবই বিস্মিত হয়েছি। একজন শিক্ষিত নাগরিক হওয়া সত্তে¡ও করোনাজনিত পরিস্থিতিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দেশের একজন ডাক্তারের মুখে এ ধরনের দায়সারা মন্তব্যে হতে পারে তা ভাবতেই কষ্ট লাগে। এর আগেও একই কিংবা প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছেন আরো কয়েকজন ডাক্তার। উদাহরণস্বরূপ- ‘ডাক্তার হচ্ছে জনগণের ট্যাক্স-এর টাকায়’- এ ধারণার বিপক্ষে অবস্থান নেন ডা. রাজীব দে সরকার নামে একজন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘এমনকি যারা কষ্ট করে টাকা খরচ করে বেসরকারি মেডিকেলে পড়ছে, তাদেরও শুনতে হয় এই ট্যাক্স-এর টাকার কথা। তারা বলে, ডাক্তার তৈরির জন্য জনগণের ট্যাক্সের অনেকটাই ব্যয় হচ্ছে। এই কথাগুলো ঠিক না।’ তিনি আরো বলেন, ‘ডাক্তার তৈরিতে জনগণ যে টাকা লগ্নি করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিদান জনগণ সরাসরি মেডিকেল কলেজগুলো থেকে পাচ্ছে।’ চিকিৎসা ও সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেসব জনগণ ওখানে চিকিৎসা পায় তার ঔষধ, খাবার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাসপাতালের যাবতীয় খরচ (বেড শিট, মশারি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি), হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন সব কিন্তু জনগণের জন্যেই। ছাত্রদের পেছনে খুব সামান্যই ব্যয় হয়। বরাদ্দের সিংহভাগ টাকাতো জনগণই খরচ করে।’ তিনি মনে করেন, ‘বাস্তবে সরকার/জনগণ মাত্র কয়েক কোটি টাকা এইসব মেডিকেল কলেজে খরচ করে আর বিনিময়ে শত শত কোটি টাকার সেবা পায়। তাহলে বুঝলেন কি ‘জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ডাক্তার হচ্ছে’ কথাটা মোটেও ঠিক না। বরং জনগণকে কোটি কোটি টাকার সেবা দানের মাধ্যমে এক এক জন ডাক্তার তৈরি হচ্ছে।’ দেশের শিক্ষিত নাগরিকদের এ ধরনের যাচ্ছেতাই, মনগড়া ও দায়সারা মন্তব্যের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের প্রতি একজন নাগরিকের দায়বদ্ধতা কী এবং কেন-এ ব্যাপারে আমি সংক্ষেপে আলোকপাত করবো। আশা করি, উল্লিখিত শিক্ষিত নাগরিকগণ কোনো গভীর চিন্তাভাবনা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়াই যে মন্তব্য করেছেন, আমার আলোচনায় তার যথাযথ জবাব পাওয়া যাবে। প্রথমেই আসি একটি রাষ্ট্রের নাগরিক প্রসঙ্গে। নাগরিক তো সেই ব্যক্তি যে রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যশীল, রাষ্ট্রের কল্যাণ কামনাকারী, রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগকারী এবং রাষ্ট্রের প্রতি বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকারী। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, তাই বাংলাদেশি। এখন দেখতে হবে নাগরিক হিসেবে যে বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের থাকা উচিত সেগুলো আমাদের আছে কিনা। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে আমরা স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রে বসবাস করছি। আবার এতেও সন্দেহ নেই যে, আমরা রাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছি। এখন সুযোগ-সুবিধাগুলোর দিকে একটু আলোকপাত করা যাক।
শৈশব থেকে যে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে আমরা বড়ো হই, যদি আমরা আমাদের প্রদেয় বেতন এবং প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করি, তাহলে দেখতে পাবো, একজন শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্রের ব্যয় অনেক বেশি, ক্ষেত্রবিশেষে তা শিক্ষার্থী প্রতি প্রতি বছর ১৩০০০ থেকে ২৬০০০ পর্যন্ত হতে পারে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক, স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপ্রদত্ত আর্থিক সুবিধাপ্রাপ্ত হয়েই একজন শিক্ষার্থী তার লেখাপড়া সম্পন্ন করে। আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ-সুবিধাটা পাচ্ছে সর্বোচ্চ ১ কোটি মানুষ অথচ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ১৬ কোটি মানুষের কর থেকেই তারা এই আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে। অনুরূপভাবে প্রতিটি সেক্টরেই মানুষ কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রকর্তৃক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকে। এক্ষেত্রে কেউ যদি বলে, ‘জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ডাক্তার হইনি, হয়েছি নিজের বাপের কষ্টের টাকায়। তাই আমি বাসায় বসে থাকতেই পারি’ তারা আসলেই নাগরিক কিনা-তাদের ভেবে দেখা উচিত।
প্রশ্ন করতে পারেন, গরিব কী করে ট্যাক্স দেয়? আমার প্রশ্ন: তাকে কি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভ্যাট দিতে হয়না? এটা কি ট্যাক্স নয়? ভ্যাট-এর বিশ্লেষণই হলো ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স যার অর্থ মূল্য সংযোজন কর। প্রশ্ন এটাও করতে পারেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা পায় কি? হ্যাঁ, ওরা এবং ওদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবশ্যই বিভিন্ন স্তর ও ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা পায়। হতে পারে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সরকার থেকে ওরা আর্থিক সুবিধা তুলনামূলকভাবে কম পায় কিন্তু বাহ্যিক সুযোগ-সুবিধার বিচারে ওরা মোটেও পিছিয়ে নেই, যেমন-বিভিন্ন সরকারি প্রশিক্ষণ, সরকার কর্তৃক পরিদর্শন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিংবা ইউজিসি কর্তৃক গৃহীত ও বাস্তবায়িত বিভিন্ন কর্মসূচি, সহযোগিতা ও পদক্ষেপ ইত্যাদি। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ব্যতীত কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো ও সফলতা অর্জন আসলে কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। আপনার প্রশ্ন থাকতেই পারে-নাগরিককে কেন কর দিতে হয় বা নাগরিক কর প্রদান না করলে কী হবে? এটা স্বভাবগত সত্য যে, একজন নাগরিক রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার ভোগ করে। এই সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার ভোগ করার পাশাপাশি তাকে রাষ্ট্রের প্রতি কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্যও পালন করতে হয়। দেশের শাসন কাজ পরিচালনা ও উন্নয়নমূলক কাজ করার জন্যে অর্থের প্রয়োজন হয় । নাগরিকের উপর কর আরোপ করেই রাষ্ট্র এই অর্থ সংগ্রহ করে। তাই রাষ্ট্রীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্যে নাগরিককে কর প্রদান করতে হয়। একজন গরিব বা অশিক্ষিত নাগরিক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করলে যতোটুকু না ধর্তব্য অপরাধ হয়, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি অপরাধ, ধৃষ্টতা ও অকৃতজ্ঞতা হয় যদি একজন শিক্ষিত নাগরিক মিথ্যে ও খোঁড়া অজুহাত দাঁড় করিয়ে কর্মস্থলে যেতে অস্বীকৃতি জানায়।
কথা আসতে পারে-বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবী থাকতে বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে ডাক্তারদেরকে নিয়ে কেন এতো সমালোচনা? ডাক্তারগণ এমন এক পেশায় নিয়োজিত যার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে আছে মানব সেবা আর বর্তমান বিশ্বে এর গুরুত্ব এখন সর্বাধিক। জনগণের সেবার জন্যেই ডাক্তার, তাই কোনো মহামারির পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে স্বাভাবিকভাবেই সুস্থতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে ডাক্তাররাই হবেন জনগণের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু। এক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে যখন কেউ কেউ ভিন্ন ও অপ্রত্যাশিত সুরে কথা বলেন কিংবা অনাকাক্সিক্ষত আচরণ করেন, তখনই ওঠে সমালোচনার ঝড়। প্রত্যাশা যেখানে যতো বেশি, সমালোচনা সেখানে ততো বেশি। আশা করি, সম্মানিত ডাক্তারগণ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে তাঁদেরকে নিয়ে কেনো এতো সমালোচনার ঝড় বইছে।
এখন আমি একজন নাগরিকের করণীয় বা দায়বদ্ধতা বিশ্লেষণ করার সুবিধার্থে পুনরায় পৌরনীতি বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে প্রদত্ত নাগরিকের সংজ্ঞায় ফিরে যাচ্ছি। উপরোক্ত সংজ্ঞায় উল্লিখিত নাগরিকের বৈশিষ্ট্যগুলো যথাক্রমে সাজালে আমরা পাই-১. রাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাস, ২. রাষ্ট্র থেকে সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার ভোগ, ৩. রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন, ৪. রাষ্ট্রের কল্যাণ কামনা এবং ৫. রাষ্ট্রের প্রতি বিভিন্ন দায়িত্ব পালন। এবার বিশ্লেষণ করে দেখি এদেশের প্রতিটি নাগরিক যথার্থ নাগরিক কিনা। যে শিক্ষিত নাগরিক দেশের ১৬ কোটি মানুষের টাকায় লেখাপড়া সম্পন্ন করার পর বলে সে নিজের বা তার বাবার টাকাতেই লেখাপড়া করেছে, তাই কর্মস্থলে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া কিংবা রাষ্ট্রের আহŸানে সাড়া দেওয়া বা না দেওয়া তার ইচ্ছার ব্যাপার, সে প্রথমত রাষ্ট্রের প্রতি অকৃতজ্ঞ, দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যহীন, তৃতীয়ত সে রাষ্ট্রের কল্যাণকামী নয় এবং চতুর্থত সে রাষ্ট্রের প্রতি যথাযথ দায়িত্বপালনকারী নয়। রাষ্ট্রের বৃহত্তর প্রয়োজনে সাড়া দেওয়া তার রাষ্ট্রীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। অন্যথায় রাষ্ট্রের সুনাগরিক হওয়াতো দূরের কথা, তাকে রাষ্ট্রের নাগরিকও বলা যাবে না। এখন প্রযুক্তির যুগ। অনলাইনে সার্চ দিয়েও আপনি নাগরিক হিসেবে আপনার সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য এবং দায়িত্ব ও কর্তব্য যাচাই করে নিতে পারেন। আশা করি, এ ব্যাপারে আর বেশি কিছু বলার দরকার নেই। পরিশেষে বলবো, রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া এতো সহজ নয়। রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়াও চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। আয়েশী জীবনে লেখাপড়া শেষ করে নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব ও রাষ্ট্রপ্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে কোনো ধনীর দুলালের যেনতেন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই। দেশের অধিকাংশ মানুষ এখন সচেতন, প্রæফ কাটার জন্য অনেকেই প্রস্তুত, তিনি কয়জনকে এড়িয়ে যাবেন? তাই আসুন, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের করণীয় ও দায়বদ্ধতা সম্পর্কে আমরা সচেতন হই এবং যে কোনো কঠিন সময়ে রাষ্ট্রের বৃহত্তর প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াই। তবেই এদেশে বিরাজ করবে সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিবেশ এবং সবাই মিলেমিশে সুখে-শান্তিতে জীবন কাটাতে পারবো।
লেখক: অধ্যক্ষ ও শিক্ষা গবেষক