ছোটরাও দুষ্টু ভীষণ

মোহাম্মদ অংকন

17

শ্রেণিতে রফিক স্যার পড়ানো শুরু করে দিয়েছেন। বর্ষার এই ঝুমঝুম বৃষ্টির মধ্যেও স্যার শ্রেণিতে হাজির হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের না এসে উপায় নেই। তবে এখনও এসে পৌঁছাতে পারেনি মিশু ও মনি। বাহিরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। সেই সঙ্গে তুমুল ঝড়। কৃষ্ণপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরনো টিনের চালা বাতাসের তোড়ে ঝনঝন করছে। মরচে ধরা ছিদ্রযুক্ত টিন দিয়ে টুপটুপ বৃষ্টি পড়ছে। মাঝে মাঝে ঘর অন্ধকার হয়ে আসছে। বটগাছের ডালপালা দেওয়ালে দেওয়ালে আঘাত হানছে। আহ্ ভয়ঙ্কর! এর মধ্যেও রফিক স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে চলেছেন। একের পর এক অংক কষে চলেছেন। তিনি যেন নাছোরবান্দা। পড়াতেই হবে। স্যারটা খুব কড়া মেজাজের। প্রাকৃতিক দূর্যোগ তো দূরের কথা নিজে অসুস্থ হলেও ক্লাস নেওয়া বন্ধ রাখেন না কখনো।
এরই মধ্যে বৃষ্টিতে ভিজে মিশু ও মনি হাজির হয়ে গেল। ‘স্যার, ভিতরে আসতে পারি?’
ওদের কথায় স্যার তো বড্ড রেগে গেলেন। ‘অ্যাঁ, বলিস কি? এখন ক্লাসে! তোরা, বৃষ্টি আসার আগে আসতে পারিস না?’
মিশুর লম্বা চুল বেয়ে বৃষ্টির পানি টুপটুপ করে পড়ে। ঠান্ডায় দু’জনই কাঁপছে। মিশু উত্তর করে, ‘স্যার, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বৃষ্টি ছিল না। রাস্তায় বৃষ্টি পেয়েছে।
রফিক স্যারতো এক্কেবারে নাছোরবান্দা। তিনি যেটা সঠিক মনে করেন সেটাই সঠিক। সব বুঝেও যেন বুঝছেন না কিছু। চোখ রাঙিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি কি বৃষ্টি শুরুর আগে আসিনি? যত্তসব!’
ভয়ে ভয়ে মনি বলে, ‘স্যার, আজ আমাদের শ্রেণিতে ঢুকতে দিন। এই বলছি, আর হবে না এমনটি।’
স্যার ওদের কোনো কথাই শোনেন না। বরং রেগে যান। ‘তোরা আজ বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকবি। যতক্ষণ বৃষ্টি পড়বে, ঠিক ততক্ষণ।’
বর্ষার শুরুতে এই বৃষ্টিতে ভিজে কাক হওয়া মিশু ও মনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকল। শরীর ভেজা, ঠান্ডায় কাঁপছে থরথর। ওদের কী দোষ বল তো? বর্ষাকালে এমন বৃষ্টির কবলে সবাইকেই কমবেশি পড়তে হয়। অনেক শিক্ষকও আসতে পারেননি। তাই বলে স্যার ওদের এমন অন্যায় শাস্তি দিবে? শ্রেণির সবার মনে একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে স্যারের বদমেজাজী স্বভাবের কারণে কেউই কিছু বলতে পারছে না। কিছু বললেই তাকেও কান ধরে বেঞ্চের উপর নীল ডাউন হতে হবে। ও বাবা, এসবের মধ্যে কেউ নেই!
প্রায় ত্রিশ মিনিট পর বৃষ্টি পড়া থেমে যায়। স্যার ক্লাসটা শেষ করে অফিস রুমে চলে যায়। মিশু ও মনি শ্রেণিতে ঢোকে। ওদের কাছে ছুটে আসে শ্রেণির সবচেয়ে দুষ্টু ছাত্র লোটো ও তার সাঙ্গপাঙ্গ। ‘ইস্, অযথাই স্যারটা না তোদের শাস্তিটা দিল! স্যার প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিস্থিতিও বুঝতে চান না। যত্তসব রাগ দেখানো। তোরা ভাবিস না, এই শাস্তির প্রতিশোধ আমি নেব। নইলে আমি না লোটো না।’
মিশু শান্ত স্বভাবের। তাই বলে, ‘না রে লোটো, এসব নিয়ে ঝামেলা পাকাস না। তখন বিপদ হবে সবার।’
লোটো সহসা বলে, ‘আমার আবার বিপদ হবে! হাহাহা! তোদেরও বিপদ কিচ্ছুটি হবে না। তোরা শুধু আমার পাশে থাকবি। দেখবি কী ঘটে! বেচারার কী হালটাই না হয়! আমার অনেক দিনের ইচ্ছে। এবার একটা চান্স এসেছে।’
পরের দিনের ঘটনা। লোটো সবাইকে আগে থেকেই সব বলে রাখে। লোটো আজ যা করবে সব বদমেজাজি রফিক স্যারকে শায়েস্তা করতে। তাই শ্রেণির সবাই যেন একদম চুপিস্বর। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। কেউ কিছু বলছে না। সবাই বই খুলে পড়ছে। যা করার সব করবে আজ লোটো ও তার সাঙ্গপাঙ্গ।
লোটো ছোট হলে কী হবে, ওর দুষ্টু বুদ্ধির কোনো অভাব নেই। কোথা থেকে এসব দুষ্টু দুষ্টু বুদ্ধি পায়, তা কেউ ভাবতেই পারে না। তাই স্যারকে কিভাবে শায়েস্তা করা যায়, সে পাকা প্ল্যান বাড়ি থেকে করেই এনেছে।
রফিক স্যারের ক্লাসটা সবার আগে শুরু হয়। এটাইতো লোটোর বিরাট সুযোগ। ক্লাসের প্রবেশমুখে লোটো একবালতি পানি ঢেলে দেয়। শুধু কী পানিরে ভাই? পানিতে মেশানো রয়েছে ‘সিন্তেটিক তৈলাক্ত তেল’। এটি পানির রংয়ের সাথে মিশে গিয়ে মনে হয় শুধু পানি রয়েছে। কিন্তু অনেক পিচ্ছিল হয় এটি। এতে পা রাখতেই যে কেউ ছিটকে পড়বে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। আর লোটো দরজার সামনে এমনভাবে পানি ও তেল ঢেলে দিয়েছে যে ও পথ ছাড়া রুমে ঢোকার কোনো উপায় নেই। এবার শুধু স্যারের চিৎপটান হওয়ার পালা। সবার হাসির পালা।
ঘড়িতে দশটা বাজতেই রফিক স্যার ক্লাসে চলে আসেন। তবে ঢুকতেই লোটোর ফাঁদে পড়ে যায় তিনি। রুমের প্রবেশ মুখে ডান পা রাখতেই স্যার ছিটকে পড়েন রুমে। এক গড়ানি, দুই গড়ানি, তিন গড়ানি খেয়ে প্যান্ট-শার্ট মেখে ভুতুরে হয়ে ওঠেন। সবাই ধরাধরি করে টেনে তোলে। কেউ হাজিরার খাতা তোলে, কেউ চক-ডাস্টার। লোটো ও তার সাঙ্গপাঙ্গ স্যারকে ধরে। স্যার কোমড়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘এখানে পানি আসলো কি করে?’
কেউ কোনো কথা বলার সাহস রাখে না। এবার দুষ্টু লোটোর উত্তর দেওয়ার পালা। ‘স্যার, কালকে বৃষ্টির সময় মিশু ও মনি ওখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তাই পানি জমেছিল। এখনও শুকায় নি।’
স্যার তো মোটামুটি রেগেই গেলেন এটা শুনে। ‘ওই হতচ্ছরা, বৃষ্টি হল কালকে, আজ পানি থাকে কি করে? আর বৃষ্টির পানি এত পিচ্ছিল হয় কি করে? বৃষ্টির পানিতে কি পিচ্ছিলকারক পদার্থ মেশানো ছিল? তোরা কিছু করেছিস কি? সত্যি করে বল, নইলে..।’
বুকে সাহস নিয়ে লোটো উত্তর করে, ‘স্যার রাগবেন না। এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ ছিল। সব কিছু আমার প্ল্যান। কারও কোনো দোষ নেই।’
রফিক স্যার এবার বুঝতে পারেন পুরো বিষয়টা। গতকাল মিশু ও মনিকে শাস্তি দেওয়া তার সত্যি ভুল হয়েছিল। তাই তা শিকার করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না এ মুহুর্তে। একটা অট্টহাসি দিয়ে স্যার বলে ওঠেন, ‘তোরা ছোট হলেও দুষ্টু ভীষণ! তোদের সাথে আমি পারলাম না।’