ছিনতাই চক্রের টার্গেটে আর্থিক লেনদেন

42

প্রতিবছর ঈদের কেনাকাটা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেতন-বোনাস প্রদান থেকে শুরু করে নাগরিকরা যাতে নির্বিঘ্নে ও নিরাপদ পরিবেশে ঈদ উদ্যাপন করতে পারেন সেটা বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ ঘটা করে নগরজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বিশেষ করে, চুরি-ছিনতাই ও জালনোটের বিস্তার ঠেকানোই থাকে পুলিশের মূল লক্ষ্য। আর রমজানে ছিনতাই চক্রের টার্গেটে থাকে মোটা অংকের আর্থিক লেনদেন। প্রস্তুতি নিয়ে ওঁৎ পেতে থাকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মার্কেটের আশেপাশে। পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকে মওকা পেলেই তা কাজে লাগায় ছিনতাইকারীরা। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
পুলিশের নেয়া বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরেও ছিনতাই চক্র যে হাত গুটিয়ে বসে থাকে না এবং চলতি রমজানেও নেই, তার নমুনা দেখা গেল গত ৪ জুন প্রকাশ্য দিবালোকে। ওইদিন বেলা সোয়া ১১টার দিকে ব্যস্ততম প্রবর্তক মোড়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এফএমসি গ্রুপ অব কম্পানির হিসাব নির্বাহী কেএস সরওয়ার মেহেদীকে মারধর করে এক লাখ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় বেসরকারি ওই প্রতিষ্ঠানের উপ মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) উত্তম ঘোষ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পাঁচলাইশ থানায় এফএমসি গ্রুপের দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, এফএমসি গ্রুপ অব কম্পানির হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা সরোয়ার হাসান মেহেদী ঘটনার দিন প্রতিষ্ঠানের বকেয়া বিলের জন্য মাঝিরঘাটের নাহার বিল্ডিং এলাকায় বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাজ কর্পোরেশনে যান। প্রতিষ্ঠানটি তাদের এক কর্মচারীর মাধ্যমে আগ্রাবাদ সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে নগদ চার লাখ ২০ হাজার টাকা তুলে মেহেদীকে দেন। চারটি পৃথক বান্ডিলে চার লাখ টাকা একটি কাগজের প্যাকেটে ভরে হাতে আর ২০ হাজার টাকা প্যান্টের পকেটে নিয়ে মেহেদী আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড় থেকে বাসে জিইসি মোড়ে এসে নামেন। তারপর হেঁটে গোলপাহাড় মোড় হয়ে এলাকার কর্মস্থলে যাবার সময় ব্যস্ততম প্রবর্তক মোড়ে একটি তৈরি পোশাকের দোকানের সামনে পৌঁছলে হঠাৎ করেই অজ্ঞাতপরিচয় ৪/৫ জন যুবক তাকে ঘিরে ধরে মারধর শুরু করে।
মেহেদী তাদের সাথে ধস্তাধস্তি ও চিৎকার জুড়ে দেয়। ভারি কোন বস্তু দিয়ে মেহেদীর মাথায় আঘাত করে যুবকদের একজন। ধস্তাধস্তি চেঁচামেচির এক পর্যায়ে ওই যুবকরা প্যাকেট থেকে রাস্তায় পড়ে যাওয়া এক লাখ টাকার একটি বান্ডিল ও পকেটে থাকা ২০ হাজার টাকা নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে পালিয়ে যায়। এরপর মেহেদী বাকি তিন লাখ টাকা ও মাথায় রক্তাক্ত জখম নিয়ে কর্মস্থলে পৌঁছেন। সেখান থেকে তাকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়।
এ বিষয়ে পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ওয়ালী উদ্দিন আকবর পূর্বদেশকে বলেন, ঘটনার খবর ও মামলা দায়েরের পর থেকেই আমাদের একাধিক টিম সন্দেহভাজন ছিনতাইকারীদের ধরতে ও লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধারে মাঠে নেমেছে। শীঘ্রই আমরা এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে সক্ষম হব বলে আশা করছি।’
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে নগরীতে ছিনতাইপ্রবণ ৯৪ টি পয়েন্টকে চিহ্নিত করে এসব এলাকায় পুলিশি টহল ও নজরদারি বাড়িয়ে রমজান ও ঈদের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ হয়েছে। সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের জন্য একশ’ পাঁচটি টিম গঠন করা হয়। ওই একশ’ ৫টি টিমে দায়িত্ব পালনের জন্য সিএমপির নিয়মিত পুলিশ ফোর্সের পাশাপাশি অতিরিক্ত এক হাজার নয়জন পুলিশ সদস্য অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
এদের মধ্যে সহকারী কমিশনার (এসি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন সাতজন, পরিদর্শক ৩৪ জন, উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) রয়েছেন একশ’ জন, কনস্টেবল ৪২ জন, স্পেশাল আর্মড ফোর্স (এপিবিএন) একশ’ ৮৫ জন, পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিএন্ডএম) বিভাগের একশ’ ৮৮ জন, নগর গোয়েন্দা বিভাগের ৩০ জন, থানা ও ফাঁড়ির একশ’ ২২ জন, বন্দর পুলিশ লাইন থেকে ৩৩ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। একইসঙ্গে স্ট্যান্ডবাই ডিউটিতে থাকছেন ৮ জন উপ-পরিদর্শক, স্পেশাল আর্মড ফোর্সের ৬০ সদস্য, পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক’শ সদস্য, ৪০ জন মহিলা পুলিশ এবং এপিবিএন’র ৬০ সদস্যসহ মোট দুইশ ৬৮ জন সদস্য। টিমের সদস্যরা নাগরিকদের চলাচলের পথে ছিনতাইপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত স্পট, বিভিন্ন শপিং মল এবং বাণিজ্যিক এলাকাকে টার্গেট করে ডিউটি করছেন।
পুলিশের সর্বশেষ তৈরি করা তালিকায় টাইগারপাস মোড়, জামালখান মোড়, খাস্তগীর স্কুলের সামনের অংশ, ডিসিহিল-বৌদ্ধমন্দির মোড়, গণি বেকারির পশ্চিম পাশ এলাকা, চট্টগ্রাম কলেজের পূর্ব গেট (প্যারেড কর্ণার) মাদারবাড়ি, বরিশাল কলোনির সামনে, নালাপাড়া মোড়, মাঝিরঘাট, চন্দনপুরা, বহদ্দারহাট মোড়, নজির আহমদ চৌধুরী রোড, লালখান বাজার মোড়, নন্দকানন কাটা পাহাড় এলাকা, বাদামতলী মোড়, বড়পুল, বারিক বিল্ডিং মোড়, মনছুরাবাদ ঈদগাঁ মোড়, টিএন্ডটি কলোনি মোড়, সার্সন রোড, বাদশা মিয়া চৌধুরী সড়ক, কাজীর দেউরি, লাভলেন, মাস্টারপুল, সিরাজদ্দৌল্লাহ রোডের সাব-এরিয়া, খাতুনগঞ্জ পোস্ট অফিস গলি, বক্সিরহাট, আন্দরকিল্লা, নিউ মার্কেট মোড়, বটতলী রেলস্টশন, কদমতলী মোড়, চৌমুহনী, মহসিন কলেজ এলাকা, সিটি কলেজ মোড়, শুভপুর বাস স্টেশন, হাওয়াই হোটেল গলি মুখ, আগ্রাবাদ সোনালী ব্যাংক মোড়, বনানী কমপ্লেক্সের সামনে, ঢেবারগলি, উপহার সিনেমার সামনে, জিইসির মোড়, সিনেমা প্যালেস, আশরাফ আলী রোড, ফিশারিঘাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, আছদগঞ্জ, এমইএস কলেজ মোড়, প্রবর্তক মোড়, আসকার দীঘির পূর্বপাড়, রহমতগঞ্জ, চাক্তাই-রাজাখালী, আমবাগান, ষোলশহর দুই নম্বর গেট, বলুয়ারদীঘির পশ্চিম পাড়, মিয়াখান নগর, ইকবাল রোড, পাহাড়তলী বাজার, পানির কল, পোর্ট কানেকটিং রোড, ফকিরহাট ৩ নম্বর জেটি গেট, সল্টগোলা রেলক্রসিং, কর্নেল হাট, কাঠগড়, পতেঙ্গা সিবিচ, ফিরোজশাহ কলোনি রাস্তার মোড়, শেরশাহ শহীদ মিনার, রৌফাবাদ কলোনি, হামজারবাগ মোড়, মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে, গোল পাহাড়ের মোড়, ধনিয়ালাপাড়া, বাকলিয়া বগারবিল, ঝাউতলা, চাঁদনী সিনেমা হল, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার মোড়, ট্যানারি মোড়, বড়–য়াপাড়া গলির মুখ, ওসমানিয়া গøাস ফ্যাক্টরি মোড়, এফআইডিসি রোড, কেডিএস ফ্যাক্টরি গেট, আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনে, আমিন জুটমিল ও বিবিরহাট মোড় এলাকার অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থানগুলো সবচেয়ে ছিনতাইপ্রবণ স্পট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।