ছাত্রলীগ নীতি-আদর্শ ও সততার প্রতীক হয়ে অতীত গৌরবে ফিরে আসুক

মো. আবদুর রহিম

34

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?
মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন
‘মানুষ হতেই হবে’ এ যার পণ।
ছাত্রলীগেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি। শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির পতাকা হাতে নিয়ে পণ ছিল জুলুম, শোষণ, নির্যাতন, বৈষম্য, বর্ণবাদ, সন্ত্রাসবাদ, দখলবাদ ও জুলুমবাদ থেকে একদিন মুক্তি পাব। সেই ধারণা বুকে নিয়ে জীবনের জন্য রাজনীতির মাঠে আসি। তাই এই প্রবন্ধটি লিখার শুরুতে কুসুম কুমারী দাশের কবিতার কয়টি লাইন দিয়ে শুরু করলাম। বাঙালি জাতির আরাধ্য সন্তান, আমাদের জাতির পিতার বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান আমার রাজনীতির আদর্শ। তারই হাতেগড়া ছাত্রলীগ। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে বঙ্গবন্ধু মুজিব তার চিন্তাচেতনা থেকে প্রথমে ছাত্রলীগ ও ১৯৪৯ সনের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ছাত্রলীগ পাক স্বৈরচার আইয়ুব মোনেম, ইয়াহিয়া তাড়াতে যে আন্দোলন করেছে তা ছিল দুনিয়া কাঁপানো। যার রাজনৈতিক নাম ছিল ১৯৬৯ এবং গণঅভ্যুত্থান। সকাল নেই, বিকেল নেই, রাত-ভোর নেই, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থাকত মিছিলের দখলে। সেদিন ডাকসুর ভিপি ছিল তোফায়েল আহমেদ। যার পরিচয় ছিল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক। জাতির পিতার ৬ দফা এবং তখনকার প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে গঠিত কেন্দ্রিয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা অর্থাৎ ৬+১১ দফা ভিত্তিক আন্দোলনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি এবং এই ধারাবাহিকতা স্বাধিকার, অধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন এবং শেষ পর্যায়ে জাতির পিতার নির্দেশে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তোফায়েল আহমদ ছাড়াও সেদিনের ছাত্র নেতাদের মধ্যে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, আ স ম আবদুর রব, নুরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, রাশেদ খান মেনন, মতিয়া চৌধুরী, হাসানুল হক ইনু, হায়দার আকবর খান রনো, মাহবুব উল্লাহ, সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক, শাহজাহান সিরাজ, সামসুদ্দোহা, আবদুর রউফ খালেদ, মোহাম্মদ আলী, মালেকা বেগম, রাফিয়া আক্তার ডলি, দীপা দত্ত, মমতাজ বেগম, শেখ হাসিনা ও আয়েশা খানম সহ আরো অনেকে। সেই দিনের ছাত্র নেতারা ছিল সাহসে, বিশ^াসে, লক্ষ্যে একবারেই অবিচল। তাদের সাহসি নেতৃত্ব যারা দেখেছে তারা জানে তারা কতখানি সাহসী ও দৃঢ়চেতা ছাত্রনেতা ছিলেন। প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ থেকেও এক বছরের অগ্রজ ছাত্রলীগ। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামের নেতৃত্ব দানকারী দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া গৌরব ও ঐতিহ্যের এ ছাত্র সংগঠনটি গত ৪ জানুয়ারি গৌরব, ঐতিহ্য ও সংগ্রাহের ৭২ বছরের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে ছাত্রলীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও পুনর্মিলনী উদ্বোধন করেন। তিনি ছাত্রলীগের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে নীতি নির্ধারণী বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আদর্শ ছাড়া, নীতি ছাড়া, সততা ছাড়া কখনও কোনো নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারেন। সেই নেতৃত্ব দেশকে কিছু দিতে পারে না। ছাত্রলীগ নেতাদের আদর্শের রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহŸান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘ছাত্রলীগ সংগঠনকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, একটা নীতি নিয়ে, আদর্শ নিয়ে সংগঠন গড়তে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে তাদের আচার-আচরণ, তাদের কথা-বার্তা, তাদের রাজনীতি সবকিছু সেই ভাবেই করা উচিত। যেন এই সংগঠনটা একটা মর্যাদাপূর্ণ সংগঠন হয় এবং দেশ ও জাতির কাছে যেন তাদের একাটা আস্থা-বিশ^াস অর্জন করে চলতে পারে। ছাত্রলীগকে সেইভাবে চালাতে হবে। এই সংগঠনটির মধ্য দিয়ে আগামী দিনের নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, ‘জাতির যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে ছাত্রলীগ সব সময় বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছে। যখন আমার বাবা (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) জেলে থাকতেন তখন ছাত্রলীগ সব সময় যোগাযোগ রাখত আমার মায়ের সাথে এবং তিনি নির্দেশনা দিতেন। সেই নির্দেশনা মোতাবেকই কিন্তু ছাত্রলীগ কাজ করত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ছাত্রলীগের কিছু নেতা এবং সেই সাথে ছাত্র ইউনিয়ন সহ অন্যান্য সংগঠন মিলে প্রথমে প্রতিবাদ করেছিল। জাতির পিতাকে সপরিবারের এবং জাতীয় নেতাদের জেলখানায় হত্যার পর রাষ্ট্রীয় দখলদার জিয়াউর রহমান মেধাবী ছাত্রদের হাতে অস্ত্র, তাদের হাতে অর্থ তুলে দিয়ে তাদেরকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহা করেছে। ছাত্রদের লাঠিয়াল বাহিনী বানিয়েছে। যারাই অবৈধ পন্থায় ক্ষমতায় এসেছে তাদের সবাই বিশেষ করে আইউব, ইয়াহিয়া, জিয়া, এরশাদ ও খালেদা তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অবৈধভাবে দখলকৃত ক্ষমতাকে বৈধ করার হাতিয়ার ছিল কতিপয় ছাত্রনামধারী সংগঠন। জননেত্রী শেখ হাসিনা ৪ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ছাত্র সমাবেশে বলেন, যারা আগামী দিনে বাংলাদেশকে পরিচালনা করবে, তাদের যদি বিপথে পরিচালনা করা হয়, তাদের যদি রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করবার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় তাহলে তারা কখনোই সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারে না, পারবে না।
ছাত্রলীগ ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ১৯৭৫’র মার্শাল বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন এর নেতৃত্বে ছিল ছাত্রলীগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধী রাজাকার আলবদর ও আল শামসদের বিচারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন ছিল দেশ কাঁপানো আন্দোলন। জয় বাংলা স্লোগানের পাশাপাশি কাদের মোল্লা, নিজামী, মুজাহিদী, গোলাম আযম, সাকা চৌধুরীর বিচারের দাবিতে বাংলার ছাত্রসমাজ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস খুঁজে পেয়েছিল।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রলীগের এক সমাবেশে বলেছিলেন, ‘তোমাদের কলম হোকÑশোষণ মুক্তির প্রথম হাতিয়ার এ মূলমন্ত্রে ছাত্রলীগ এ দেশের ছাত্র সমাজকে গড়ে তুলবেন এ প্রত্যাশাই আমাদের। তবে এদেশের ছাত্র সমাজের নিকট বার্তা হলো আপনি স্বাধীনতার পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে, ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে, শান্তির পক্ষে, প্রগতির পক্ষে ও শিক্ষার পক্ষে তাহলে বেছে নিন বাংলাদেশের ছাত্রলীগ।
লেখক: সংগঠক, প্রাবন্ধিক