চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ছাত্রলীগের দু’গ্রূপে ফের সংঘর্ষ

ছাত্র উপদেষ্টার পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে অবরোধের ডাক

চবি প্রতিনিধি

216

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ছাত্রলীগের একাংশের দুই নেতার ওপর হামলার পর অবরোধের ডাক দিয়েছে একাংশের নেতাকর্মীরা। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় হাটহাজারীর এগারো মাইল এলাকায় হামলার পর এ অবরোধের ডাক দেওয়া হয়।
এ হামলার মদদদাতা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী পরামর্শ ও নির্দেশনা কেন্দ্রের (ছাত্র উপদেষ্টা) পরিচালক অধ্যাপক সিরাজ উদ দৌলাহর পদত্যাগ, দুই নেতার ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারের দাবিতে সন্ধ্যায় অবরোধের ডাক দেয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের অনুসারী একাংশের নেতাকর্মীরা।
আহতরা হলেন, শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন সুমন ও ছাত্রলীগ কর্মী আব্দুল্লাহ আল নাহিয়ান রাফি। সুমন বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও রাফি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। হামলার পর তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুর হলের টেলিভিশন কক্ষে সভা করাকে কেন্দ্র করে সংঘাতে জড়ায় ছাত্রলীগের দুটি পক্ষ। গত তিনদিনে একাধিক বার সংঘর্ষে অন্তত সাত নেতাকর্মী আহত হন। পরে গত শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার আবাসিক হলে তল্লাশি অভিযান চালিয়ে দেশিয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
বিবাদমান পক্ষ দুটি হল- শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের অনুসারী বগি ভিত্তিক উপগ্রæপ ‘চুজ ফ্রেন্ডস উইথ কেয়ার (সিএফসি)’ ও শাখা ছাত্রলীগের সাবেক উপ-দপ্তর সম্পাদক মিজানুর রহমান বিপুলের অনুসারী ‘ভার্সিটি এক্সপ্রেস (ভিএক্স)’। এর মধ্যে রুবেল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী এবং বিপুল নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবসে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের এই দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে প্রতিপক্ষের ছোড়া গুলিতে নিহত হয়েছিলেন সিএফসি কর্মী ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তাপস সরকার।
সূত্র জানায়, সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে হাটহাজারীর এগারো মাইল এলাকায় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের অনুসারী সিএফসি গ্রূপের নেতা নাসির উদ্দিন সুমন ও আব্দুল্লাহ আল নাহিয়ান রাফির ওপর হামলা চালায় প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীরা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সিএফসি গ্রূপের নেতাকর্মীরা শাহ আমানত হল থেকে ও ভিএক্স গ্রূপের নেতাকর্মীরা সোহরাওয়ার্দী হল থেকে বের হয়ে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় লিপ্ত হয়। এসময় পুলিশ এসে কয়েক রাউন্ড কাদানি গ্যাস নিক্ষেপ ও জলকামান ব্যবহার করে উভয় পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে জিরো পয়েন্টে থাকা পুলিশের পাঁচটি গাড়ি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের গাড়িসহ ছয়টি যানবাহন ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ভাংচুর চালায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। এসময় ঘটনাস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ও পুলিশ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে ছাত্রলীগের এই দুই নেতার ওপর হামলার ঘটনার মদদদাতা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী পরামর্শ ও নির্দেশনা কেন্দ্রের (ছাত্র উপদেষ্টা) পরিচালক অধ্যাপক সিরাজ উদ দৌলাহ’র পদত্যাগ, হামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারের দাবিতে অবরোধের ডাক দেয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের অনুসারী একাংশের নেতাকর্মীরা। অবরোধের সমর্থনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আমানত হলের সামনে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন ছাত্রলীগের একাংশের নেতাকর্মীরা। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক সিরাজ উদ দৌলাহর বিরুদ্ধেও শ্লোগান দেওয়া হয়।
সিএফসি উপ-গ্রূপের নেতা ও শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি আল-আমিন রিমন বলেন, আমাদের দুই ভাইকে মারধরের ঘটনায় ভিএক্সের মিজানুর রহমান বিপুল ও প্রদীপ চক্রবর্তী দুর্জয় জড়িত। তাদের গ্রেপ্তার ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এবং ঘটনায় প্রত্যক্ষ মদদদাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক সিরাজ উদ দৌল্লাহর পদ্যত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে।
ভিএক্সের উপ-গ্রূপের নেতা ও শাখা ছাত্রলীগের সাবেক উপ-দপ্তর সম্পাদক মিজানুর রহমান বিপুল বলেন, ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের ব্যর্থতার কারণে এ ঘটনা ঘটেছিল। রুবেলকে বহিষ্কার ও আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে আলটিমেটাম দিয়েছিলাম। কিন্তু কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মশিউদ্দৌলা রেজা বলেন, শাখা ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ চার রাউন্ড টিয়ারশেল ও জলকামান ব্যবহার করে। বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশের ছয়টি গাড়ি ভাঙচুর ও মারধরের ঘটনায় জড়িত গ্রেপ্তার করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট এলাকায় পুলিশ ও প্রক্টরের গাড়ি ভাংচুরের সময় ১৫ মিনিটে তিন দফা বিদ্যুৎ বন্ধ করে রাখে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর। ঠিক তখনই হামলা চালানো হয়। ভাংচুরের সময় বিদ্যুৎ চলে এলে মুখোশধারী হামলাকারীরা ‘বিদ্যুৎ কেন চলে আসছে’ বলে চিৎকার করে ওঠে। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ও পুলিশ উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আবু সাঈদ বলেন, শহীদ আব্দুর রব হলের পাশে একটি সুপারিশ গাছ বিদ্যুতের খুঁটিতে পড়ে আগুন ধরে যায়? তাই বিদ্যুৎ বন্ধ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে ছাত্রলীগের একাংশের অবরোধের ডাকার পর নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় রুটের শাটল ট্রেন চলাচল বন্ধ রেখেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত মাস্টার তন্ময় চৌধুরী।