চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে নিরাপত্তা পরিস্থিতি

26

করোনা অতিমারির প্রাদুর্ভাবে মাঝপথে স্থগিত হয়ে যাওয়া সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের নতুন দিনক্ষণ ঘোষণার পর সাধারণ ভোটারদেরকে ভোটকেন্দ্রমুখী করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন অংশীজনদের অনেকেই। কিন্তু ভোটের মাঠে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর পর দৃশ্যপটও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রচারণা শুরুর পরদিন থেকেই বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। ভোটগ্রহণের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনী সহিংসতাও রক্তক্ষয়ী রূপ নিচ্ছে। এতে করে এবারের সিটি নির্বাচনে বাকি সবকিছুকে ছাপিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা পরিস্থিতিই চ্যালেঞ্জের তালিকার শীর্ষে উঠে আসছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
নির্বাচনী পর্যবেক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের অনেকেই এখন শঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, সংঘাত-সহিংসতা দমনে এখনই কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশ-পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারলে বেশিরভাগ ভোটারই ভোটকেন্দ্রে না যাওয়াকেই তুলনামূলকভাবে উত্তম পন্থা হিসেবে বেছে নিতে পারেন। তবে, নির্বাচন কমিশনসহ আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা যে কোনও মূল্যে সুষ্ঠূ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সবরকম পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে গত ১২ জানুয়ারি রাত আটটার দিকে নগরীর মোগলটুলীর মগপুকুর পাড় এলাকায় পাঠানটুলী ওয়ার্ডে আওয়ামীলীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুর এবং একই পদে দলীয় সমর্থন না পেয়ে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়া আব্দুল কাদেরের সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে আজগর আলী বাবুল (৫৫) নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাহবুব নামে আরেকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত আজগর আলী বাবুল আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুরের অনুসারী। গতকাল বুধবার নিহত বাবুলের ছেলে সেজান মাহমুদ সেতু বাদি হয়ে ডবলমুরিং থানায় মামলা করেন। মামলায় বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল কাদেরসহ মোট ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৩০/৪০ জনকে আসামি করা হয়। এ ঘটনার পরপরই রাত ১২ টার দিকে পুলিশ ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে আব্দুল কাদেরসহ ২৬ জনকে আটক করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সংঘাত এড়াতে ওয়ার্ডের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও স্থানীয় বাসিন্দারা শঙ্কামুক্ত হতে পারছেন না। এর আগে গত ৮ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পরদিনই দক্ষিন পাহাড়তলী ওয়ার্ডের নন্দিরহাট এবং চকবাজার এলাকায় প্রার্থীতা নিয়ে দ্ব›দ্ব ও বিভক্তির জেরে সরকারি দলের অনুসারী বিবদমান কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় পর্যায়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সহিংসতায় একজন গুরুতর আহত হয়। জালালাবাদ ওয়ার্ডেও এরইমধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অপরদিকে, নগরীর দক্ষিণ হালিশহর, পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ডে বিএনপির মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত মাইক ভাঙচুর, প্রচারকাজে বাধা, পোস্টার ছিড়ে ফেলা ও ভয়-ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ করা হয়েছে। তারও আগে মাঝপথে স্থগিত হয়ে যাওয়া সিটি নির্বাচনকে ঘিরে বিদায়ী বছরের ১৯ মার্চ দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে তানভির জহির নামে একজন নিহত হয়েছিলেন। সেসময় পাহাড়তলী সরাইপাড়া ওয়ার্ডেও সংঘর্ষের ঘটনায় থানায় মামলা হয়। এসব সংঘাতের ঘটনা সাধারণ ভোটারসহ নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও শঙ্কার পারদকে উর্ধ্বমূখী করছে।
সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর মোগলটুলীর হত্যাকান্ডের ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেয়া হচ্ছে না দাবি করে পূর্বদেশকে বলেন, পুলিশ এখন নির্বাচনমুখী। নির্বাচনের আগে ও পরে কোথাও যাতে সহিংসতার ঘটনা না ঘটে, সে ব্যাপারে পুলিশ সজাগ ও তৎপর রয়েছে। এরইমধ্যে মোগলটুলীতে হত্যাকান্ডের ঘটনায় ডবলমুরিং থানায় হওয়া মামলাটি তদন্তের জন্য ডিবিতে স্থান্তর করা হয়েছে। ঘটনার পরপর আটত ২৬ জনের মধ্যে ১১ জনকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের নির্দেশে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জন এজাহারভুক্ত এবং বাকি পাঁচজন সন্ধিগ্ধ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাই-বাছাই শেষে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় আটককৃত বাকি ১৫ জনকে মুচলেকা নিয়ে থানা থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজনের চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী আসন্ন সিটি নির্বাচনে তৃণমূল পর্যায়ে বিরোধ বা সংঘাত বেড়ে যাওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। পূর্বদেশকে তিনি বলেন, এবার মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নের পাশাপাশি কাউন্সিলর পদেও প্রথমবারের মত দল সমর্থিত প্রার্থী দেয়া হয়েছে। কাউন্সিলর পদে সমর্থন না পেয়ে একই দলের অনেকে আবার ‘স্বতন্ত্র পরিচয়ে’ প্রার্থী হয়েছেন। দলীয় মনোনয়নে মেয়র পদপ্রার্থীরা দলীয় প্রতীক ব্যবহার করতে পারলেও দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের সেই সুযোগ নেই। এটা এক ধরণের ফাঁকি। নিকট অতীতে আমরা ঢাকা সিটি নির্বাচনের ফলাফলে দল সমর্থিত অনেক কাউন্সিলর প্রার্থীকে পরাজিত হতে দেখেছি। আর চট্টগ্রামে সর্বশেষ পশ্চিম বাকলিয়া ও গোসাইলডাঙায় অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনের অভিজ্ঞতা মোটেও ইতিবাচক ও সুখকর নয়। সংঘাত-সহিংসতার ঘটনাগুলো সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিতে প্রধান অন্তরায়। এগুলো দমন করা না হলে সাধারণ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহী হবেন না।