চসিকের ২৬১ কোটি টাকার এলইডি বাতি প্রকল্প

চিঠি চালাচালিতে প্রকল্পের অর্ধেক মেয়াদ পার

ওয়াসিম আহমেদ

121

আরও একবছর অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভার চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) ২৬১ কোটি টাকার এলইডি বাতি প্রকল্প। দুইমাসের মাথায় প্রশাসনিক অনুমোদনও (জিও) মিলেছে। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। কেননা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে ভারত সরকারের ঋণ সহায়তায়। আর তাতেই চিঠি চালাচালিতে পার হয়েছে প্রকল্প মেয়াদের অর্ধেকের বেশি সময়। তবে চলতি মাসের ২৮ তারিখ দুই দেশের প্রতিনিধিদের যৌথ সভায় জানা যাবে কখন টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। এমনটাই জানিয়েছেন প্রকল্পটির সংশ্লিষ্টরা। এদিকে ২০২১ সালের জুনে শেষ হবে প্রকল্পটির মেয়াদ।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, ‘মর্ডানাইজেশন অব সিটি স্ট্রিট লাইট সিস্টেম অ্যাট ডিফারেন্ট এরিয়া আন্ডার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৬০ কোটি ৮৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে এলওসির (লাইন অব ক্রেডিট) আওতায় ৮২ দশমিক ২০ শতাংশ অর্থের যোগান দেবে ভারত। ঋণ হিসেবে দেয়া এ অর্থের পরিমাণ ২১৪ কোটি ৪৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা। অবশিষ্ট ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ বা ৪৬ কোটি ৪৩ লাখ ৫ হাজার টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। ভারতীয় ঋণ সহায়তার অর্থ ছাড় না হওয়ায় প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে না। বিষয়টি নিশ্চিত করে চসিকের প্রধান নির্বাহী কাজী মোজাম্মেল হক জানান, এই মাসের ২৮ তারিখ একটি অনলাইন মিটিং রয়েছে। সেখানে এলওসির সব প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হবে। তখন জানতে পারবো কখন ঋণ সহায়তা পেতে যাচ্ছি। তখন টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা। উল্লেখ্য, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর ৬০ শতাংশের অধিক সড়কে এলইডি বাতি বসবে। এছাড়াও প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০ কিলোমিটার সড়কে বসবে আধুনিক এই বাতি।
জানা গেছে, গত বছরের ৯ জুলাই একনেক সভায় এই প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শেষ হলে সিটি কর্পোরেশনের বিদ্যুৎ বিল কমে আসবে প্রায় অর্ধেকে। এছাড়াও বাতি নিয়ন্ত্রণের ৫শ সুইচের বদলে হবে মাত্র ৪টি কেন্দ্রিয় সার্ভার স্টেশন এবং সাশ্রয় হবে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা। সিটি কর্পোরেশন সূত্র আরও জানিয়েছে, নগরীতে মোট ১ হাজার ৪৩ কিলোমিটার সড়কে বাতি রয়েছে। তারমধ্যে সোডিয়াম বাতি রয়েছে ৮শ ৯০ কিলোমিটার এবং এলইডি বাতি রয়েছে ১৫৩ কিলোমিটার। এদিকে অনুমোদিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ৪৬৭ কিলোমিটার সড়কে সোডিয়াম বাতির বদলে বসানো হবে এলইডি বাতি। তবে ওই সরানো সোডিয়াম বাতিগুলো নগরীর অবশিষ্ট সড়ক ও নতুন আবাসিকে সংযোজন করা হবে। ফলে নগরীর সবকটি সড়কে বসবে বাতি। এমনটাই মনে করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সূত্রে জানা গেছে, ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকার সড়ক আলোকায়ন ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন কাজ’ শীর্ষক এ প্রকল্পের আওতায় ৪০, ৬০, ৯০, ১০০ ও ২৫০ ওয়াটের ২০ হাজার ৬০০টি এলইডি বাতি এবং ২০ হাজার ২৬৭টি জিআই পোল বসানো হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের গৃহীত এ প্রকল্পের আওতায় ৪১ ওয়ার্ডের প্রতিটিতে ১০ কিলোমিটার এলইডি লাইট লাগানো হবে। অন্যদিকে নগরীর আলোকায়নে প্রায় ৫১ হাজার ৫৭৩টি সোডিয়াম বাতি রয়েছে। বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির ও সামাজিক সংগঠন কার্যালয়ের ১ হাজার ৫৩৪টি সুইচিং পয়েন্ট থেকে এই বাতিগুলো ‘অন-অফ’ করা হত। এ কাজে প্রত্যেক পয়েন্টে নিয়োজিত আছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একজন করে মোট ১ হাজার ৫৩৪ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন ও পুরোহিত। তাঁদের প্রত্যেককে ২ হাজার ৫শ টাকা করে সম্মানি প্রদান করে আসছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এমন সুইচ কমে আসবে প্রায় ৫০০টি। ফলে সিটি কর্পোরেশনের সাশ্রয় হবে সাড়ে ১২ লাখ টাকা। জানা গেছে, স্মার্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে বাতিগুলোর সুইচ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। যার জন্য স্থাপন করা হবে ৪টি কেন্দ্রিয় সার্ভার স্টেশন। যেখান থেকে সহজেই ‘অন-অফ’ ও কমানো-বাড়ানো যাবে। এছাড়াও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত সকল ধরনের ব্যবস্থাপনা খরচ বহন করবে বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
জানা গেছে, বর্তমানে ৪০ওয়াট টিউব বাতি (ফ্লুরোসেন্ট ল্যাম্প), ৬৫ ওয়াট এনার্জি বাতি (সিএফএল), ১৫০ওয়াট হাইপ্রেসার সোডিয়াম, ৪০০ওয়াট মেটাল হ্যালাইড বাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলোতে বেশি পরিমাণে বিদ্যুৎ অপচয় হয় এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডও বৃদ্ধি করে। যা শহরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রফিক এবং পথচারীদের জন্য কার্যকর ও টেকসই সড়ক বাতির আলোক সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে। রাত্রিকালীন শহরের সৌন্দর্য, ব্যবসায়িক সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে কম কার্বন নির্গমন এবং শক্তি শোষণ সম্পর্কিত পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ট্রাফিক ও পথচারীর জন্য স্মার্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সড়ক বাতির আলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।