চলে গেলেন হুলাইনের মুক্তিযোদ্ধা

চিকিৎসক পজিরউদ্দিন চৌধুরী

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

93

হুলাইনের সব আলো আগেই নিভে গিয়েছিলো। একা তিনিই শুধু টিমটিম করে জ্বলছিলেন হুলাইনের আকাশে। সেই নিঃসঙ্গ দীপটিও আজ নিভে গেল। সেই দীপ ডা. পজিরউদ্দিন চৌধুরী।
হুলাইন আমার গ্রাম। কমপক্ষে চার পাঁচশ’ বছরের ঐতিহ্যমন্ডিত এই গ্রাম। শাম মোড়ল, আজিজ খাঁ রোয়াজা-তদপেক্ষা কীর্তিমান তদীয় পুত্র মুসা খান, আকবর খান, পাহাড় খান-গা ছম ছম করা কী সব নাম ! এতসব খান কীভাবে এক দেড় মাইল ব্যাসার্ধের একটি গ্রামে এসে তাঁদের ভদ্রাসন পেতেছিলেন, আমি অনেক ভেবেও সে রহস্য ভেদ করতে পারিনি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এইসব ঐতিহাসিক পুরুষদের মধ্যে পারস্পরিক কোন সদ্ভাব ছিলো না। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন এবং চক্রশালার রাজাকে পরস্পরের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে উত্তেজিত করার চেষ্টা করেছিলেন ।
সেসব কথা বলার সুযোগ এখানে নেই। কারণ আমি ডা. পজিরউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে শোকগাথা লিখতে বসেছি।
অনেক কথাই মনে পড়ছে তাঁর সম্পর্কে। তিনি একজন মানবতাবাদী চিকিৎসক ছিলেন। হুলাইন, দক্ষিণ হুলাইন, এয়াকুবদÐী, নিমতল, লড়িহরা, পাইরোল, মনসা, মেহেরআটি, সাততথৈয়া, নলান্ধা, চরকানাই, পাঁচরিয়া, হাবিলাসদ্বীপ, মুকুটনাইট, করণখাইনÑএসব গ্রাম নিয়ে যে বিরাট ভৌগলিক সীমানা আমি চিহ্নিত করলাম-পুরো তল্লাটে এলএমএফ পাস করা ডাক্তার ছিলেন মাত্র দু’জন-ডাক্তার পজির উদ্দিন চৌধুরী ও দক্ষিণ হুলাইনের ডা. শামসুল আলম। তারা প্রথমে এলএমএফ-ই ছিলেন, কারণ তারা যখন চিকিৎসা শাস্ত্র পড়তে গিয়েছিলেন, তখন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হয়নি। ছিলো সবেধন নীলমনি চিটাগাং মেডিক্যাল স্কুল, রংমহল পাহাড়ের (জেনারেল হাসপাতালের পাহাড়) ওপর ছিলো যার অবস্থান। মেডিক্যাল স্কুল থেকে এলএমএফ ডিগ্রি দেয়া হতো। অবশ্য তাঁরা দুজনই পরে কনডেন্সড কোর্স করে এমবিবিএস হয়েছিলেন। যে পনেরটা গ্রামের নাম আমি উল্লেখ করেছি, সে গ্রামগুলোর জনসাধারণের কাছে এই দুই ডাক্তারই ছিলেন ভরসা। ফলে রোগীর কাছে ডাক্তার বাছ বিচারের কোন সুযোগ ছিলো না। আর ডাক্তারের কী চয়েস থাকতে পারে? দু’জনই ডাক্তার হিসেবে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলেন। ডাক্তার শামসুল আলম কিছু আগে চোখ বুজেছিলেন। ফলে ডাক্তার পজির একা হয়ে পড়েছিলেন। তিনিও এবার চলে গেলেন।
আমি আমার দাদাকেও ডা. পজিরের চিকিৎসা নিতে দেখেছি। আমার বাবা জেঠা তো তাঁর নিয়মিত রোগী ছিলেনই। ডা. শামসুও দু’একবার আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। শীত-গ্রীষ্ম, রোদ-বৃষ্টির পরোয়া না করে ডা. পজির আজীবন আর্ত, পীড়িত, রুগ্ন মানুষের সেবা করে গেছেন। তাঁর একটা ফি নিশ্চয়ই ছিলো। কিন্তু সেটা যে সব সময় সবার কাছ থেকে সমভাবে নিতে পারতেন, সে কথা বলার সাধ্য নেই। কারণ রোগীরা সব তাঁর পরিচিত, কারো কাছে যদি টাকা কম থাকে, তাকে বাঁধা ফির কথা বলে ফিরিয়ে দেবেন তেমন পাষাণ হৃদয় মানুষ ছিলেন না ডা. পজির। এমনকি কেউ যদি ফি দিতে একেবারেই অক্ষম হতো, তাকেও তিনি দেখে ব্যবস্থাপত্র দিতেন। সেজন্য ডা. সাহেবের খুব সুনাম হয়েছিলো। জনপ্রিয় ডাক্তার বলতে যা বোঝায় তিনি তাই ছিলেন।
ডা. পজির সম্পর্কে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি বলবার, সেটি হলো তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমরা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম তরুণ বয়সে, কিন্তু তিনি আমাদের চেয়ে ঢের বেশি বয়স্ক মানুষ ছিলেন। তবুও যুদ্ধের দামামা যখন বেজে উঠেছিলো, তাঁর রক্তও টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছিলো। তিনিও তরুণের মতোই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তী সেনাপতি ক্যাপ্টেন করিম যখন পোপাদিয়া থেকে হুলাইনে ফিরে আসার পথে বেঙ্গুরায় দেলা মিয়ার বাড়ির সামনে গুলিবিদ্ধি হলেন, তখন তাঁকে কাঁধে করে আহমদ নবী ও অন্যরা হুলাইন নিয়ে এসেছিলেন। তারা প্রথমে এখলাস মিয়া চৌধুরীর পুত্র নেছার আহমদ চৌধুরীকে খুঁজেছিলেন, তাঁকে না পেয়ে গুলিবিদ্ধ ক্যাপ্টেন করিমকে তারা জালাল মিয়ার (অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন চৌধুরী) বাড়িতে নিয়ে যান। জালাল মিয়া ডা. পজিরের ভাই। আহত ক্যাপ্টেন করিমের দেহ থেকে গুলি বের করেন ডা. পজির। জালাল মিয়ার পুরো বাড়িটাই ছিলো আওয়ামী লীগের সমর্থক। জালাল মিয়া নিজে তো আওয়ামী লীগের নেতাই ছিলেন। তাঁর ভাই ডা, পজির, ভাইপো অ্যাডভোকেট আবু সৈয়দ, দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী, মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, ইমাম হোসেন চৌধুরী-ওরা প্রত্যেকেই ছিলেন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী। শহর থেকে দেলোয়ারের খালাতো ভাই শহরের বিশিষ্ট ছাত্রলীগ নেতা পাথরঘাটা নিবাসী শামসুল আলমও তখন হুলাইনে জালাল মিয়া ও ডা. পজিরের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় জালাল মিয়া, ডা. পজির ও আহমদ হোসেন ডিলারের মোয়াজ্জেম-ইমাম হোসেনের বাবা) বাড়িটা মুক্তিযুদ্ধের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিলো। ডা. পজিরই সমগ্র কিছু দেখাশোনা করতেন।
ডা. পজির আমাকে খুবই ¯েœহ করতেন। তাঁদের পরিবারের সঙ্গে আমার একটা বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। জালাল মিয়া আমার পিতার সহপাঠী, সেজন্য আমি তাঁকে খুব মান্য করতাম। সেই সুবাদে ডা. পজিরকেও আমি শ্রদ্ধা করতাম। তবে তিনি আমার সঙ্গে বন্ধুভাবে মিশতে চাইতেন। আমি তাঁর কত ছোট। আমি অসুস্থ শুনে তিনি আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন। আমিও তাঁর বার্ধক্যজনিত রোগের কথা শুনে তাঁকে দেখতে যাবো যাবো করে অনেকদিন থেকে চিন্তা করেও শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়ে উঠে নি। আর আজ তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনতে হলো।
পরিণত বয়সেই তিনি পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৭ বছর। তবুও মৃত্যুর কোন সান্ত¡না নেই। পরিবার, প্রিয়জনের কাছে মৃত্যু এক নিদারুণ ব্রজাঘাত।
আমি ডা. পজিরউদ্দিন চৌধুরীর শোকাভিভূত পরিবারের প্রতি আমার গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই। আল্লাহ যেন তাঁদেরকে এই শোক সইবার মত শক্তি দেন সেই প্রার্থনা করি। আমি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন এবং চির শান্তি দান করেন।
লেখক : সাংবাদিক