গলা কেটে পৈশাচিক শিশু হত্যা

চাই নরপশুদের শাস্তি

48

চট্টগ্রাম নগরী এখন খুন-খারাবির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে বললে কী নত্তুক্তি হবে? এমনটি প্রশ্নের উত্তরে নগরবাসী হ্যাঁ সূচক জবাব দেয়ার বিকল্প আর উত্তর পাবে না বলে বোধ হয়। সর্বশেষ গতকাল নগরীর বাকলিয়া থানা এলাকায় সকালে নিজ ঘরে ১২ বছর বয়সী শিশু ইলহাম বিনতে নাসিরকে গলা কেটে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, যা এক কথায় মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানিয়েছে। কোন্ নরপিশাচ রক্ত খেকোরা এ নিষ্পাপ শিশুটিকে পশুর ন্যায় গলা কেটে জবেহ করে হত্যা করল, কেনই বা হত্যা করল- তা নিয়ে নানা কথা চাওর হলেও বাস্তবে গত কয়েক মাসে নগরীতে যে হত্যাকান্ড গুলো ঘটেছে- তার কোনটির সুষ্ঠু বিচার না হওয়ার পরিণতিই নিষ্পাপ শিশুকেও রেহাই দিচ্ছে না। ইলহামের হত্যাকান্ডের মোটিভ নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গভীর অনুসন্ধান চালাচ্ছে। হয়ত অনুসন্ধানে প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করাও সম্ভব হবে। কিন্তু খুনিদের আদৌ আইনের আওতায় আনা হবে কিনা, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কিনা-তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অতীতের হত্যাকান্ডগুলোর বিচারহীনতার ধারাবাহিকতায়- এমনটি সন্দেহ অমূলক নয়। এরপরও ৬ষ্ঠ শ্রেণির নিষ্পাপ স্কুলছাত্রী ইলহামের খুনিরা যেই হোক তাদের বিচার নিশ্চিত করা হোক- এমনটি দাবি আমাদের। জানা যায়, ইলহামের বাবা সৌদি আরব প্রবাসী। একই সাথে তার তিন চাচাও প্রবাসে থাকেন। মা নাসরিন আক্তার তার ছোট্ট তিন মেয়েকে নিয়ে নিজস্ব ভবনে থাকেন। ইলহামের মা নাসরিন সকালে মেঝ মেয়েকে স্কুলে দিয়ে বাসায় ফিরে আসলে বড় মেয়ের রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান। এরমধ্যে ঘরের আলমিরাতে সংরক্ষিত স্বর্ণ অলঙ্কার চুরি হওয়া ও কাপড়-চোপড়ের এলামেলো অবস্থা পড়ে থাকা ইত্যাদি ডাকাতি কিংবা চুরির ঘটনা বলে সন্দেহ করা হলেও প্রকৃত ঘটনা কী তা পুলিশি তদন্তে বের হয়ে আসবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
আমরা লক্ষ্য করছি যে, এ বছরের শুরু থেকে চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। স্কুলের অফিসকক্ষে গভর্নিং বডির সভা চলাকালে প্রকাশ্যে সবার সামনে নিজ দলের কর্মীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন যুবলীগ নেতা ফরিদ, সহপাঠীর হাতে জামালখানে প্রকাশ্যে খুন হন আদনান, পবিত্র শবে বরাতের রাতে পতেঙ্গা সৈকতে খুন হয় তাসফিয়া, জিম খেলা নিয়ে পবিত্র রমজান মাসে খুন হয় আরাফাত, খেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন, তরী নামের নয় মাসের শিশু হত্যা, ঈদের দিন গাড়ির হর্ণ বাজানোকে কেন্দ্র করে পিতার সামনে খুন হয় অনিক, সর্বশেষ বাকলিয়ার ঘটনার দিনই আতুরার ডিপোয় মাদক ও নারী নিয়ে কথা কাটাকাটির জের ধরে ছুরিকাঘাতে খুন হয় সাইদুল ইসলাম অনিক। বড় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিষয় হচ্ছে এসব হত্যাকান্ডের প্রকৃত হোতাদের অধিকাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরে। জানা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তির আশ্রয়ে অপরাধীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। অনেকে বড় ভাইদের সহযোগিতায় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে নিজেদের রক্ষা করছে।
নগর পুলিশ সূত্রে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নগরীতে এ বছরের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে ৫ টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৪ টি, মার্চে ৫ টি, এপ্রিলে ৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এরপর মে এবং জুন মাসে আরো ৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যদিও প্রকাশ্যে বলছে না বাস্তবে চট্টগ্রামে অধিকাংশ সংঘর্ষ ও খুনের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। রাজনৈতিক আধিপত্য, প্রতিহিংসার জন্য বাড়ছে সংঘর্ষ, খুন। কিছু রাজনীতিবিদ নিজের আধিপত্য প্রভাব বিস্তারের জন্য ক্যাডার বাহিনী ও কিশোরদের অস্ত্র, টাকা দিয়ে নিজের দল ভারী করছেন। তাদের দিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড সংঘটিত করা হচ্ছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী কিছু সংখ্যক পেশাদার অপরাধী সুযোগ বুঝে দিনেদুপুরে বাসাবাড়িতে হানা দিয়ে স্বর্ণ অলঙ্কার চুরি করে বেড়াচ্ছে। এসময় ঘরের কেউ দেখে ফেললে তাকে হত্যা করা হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা আমাদের দারুণভাবে উদ্বিগ্ন করে। বাকলিয়ার ঘটনাকে পুলিশ এ ধরনের কেস হিসাবেও ধারণা করছে। যদি তাই হয় তাহলে নাগরিক হিসাবে আমাদের নিরাপত্তা দেবে কে? আমরা মনে করি সংশ্লিষ্ট থানা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে।