আমার বাড়ি আমার খামার

চলচ্চিত্র-আপ্যায়নে ব্যয় হবে ২.৬৩ কোটি টাকা

14

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রগতি না থাকায় ‘আমার বাড়ি, আমার খামার’ প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হচ্ছে। শর্ত সাপেক্ষে চতুর্থ সংশোধনীর সুপারিশ লাভ করেছে সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারে থাকা ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পটি।
পরিকল্পনা কমিশন থেকে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জুনের মধ্যে আবশ্যিকভাবেই প্রকল্পটি সমাপ্ত করতে হবে। এ লক্ষ্যে এক বছর মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে।
সার্বিকভাবে প্রকল্পে ব্যয় কমলেও প্রকল্পের আওতায় অডিও ভিডিও/চলচ্চিত্র নির্মাণ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা। আপ্যায়ন খাতে খরচ হবে ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এই দুই খাতে মোট ব্যয় হবে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। চতুর্থ সংশোধনী প্রস্তাবে সার্বিকভাবে ব্যয় কমলেও এই দুই খাতে বাড়ছে ৭৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।
দারিদ্র্য বিমোচনে ২০০৯ সালে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ নামে শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০১৪ সালের জুন মাসে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ থমকে ছিল।
এ পর্যন্ত এ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৭১ দশমিক ১৭ শতাংশ। তার ওপর করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে গত এপ্রিল থেকে কাজ একপ্রকার বন্ধ ছিল। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করছে পরিকল্পনা কমিশন।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
ব্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রকল্পটির সংশোধনী প্রস্তাব একনেকে উপস্থাপনের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আমি স্বাক্ষর করলেও ভেতরে এত কিছু তো খুটিনাটি আমরার পক্ষে সম্ভব হয় না। তবে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সদস্যের সঙ্গে আমি কথা বলব।’
সূত্র জানায়, প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাবে অডিও ভিডিও/চলচ্চিত্র নির্মাণ খাতে থোক থেকে বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৫৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা। কিন্তু এবার চতুর্থ সংশোধনী প্রস্তাবে এ খাতে ৪৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ছাড়া আপ্যায়ন খরচ আগে ছিল ১৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। সেখান থেকে ৩০ লাখ টাকা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা।
প্রকল্পটির প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে গত ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। ওই সভায় পরিকল্পনা কমিশন থেকে বলা হয়েছে, একটি সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে সে অনুযায়ী প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনের মধ্যে আবশ্যিকভাবে সমাপ্তর লক্ষ্যে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো যেতে পারে।
অনুমোদিত তৃতীয় সংশোধিত ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) সংস্থানকৃত ৪টি জিপগাড়ির মধ্যে দুটি বাদ দিতে হবে। সেই অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় হ্রাস করতে হবে।
নতুন প্রস্তাবিত ৮টি ভ্রাম্যমাণ গাড়ি সৃজন ও পরিচালনা ব্যয় চতুর্থ সংশোধণীর ডিপিপি থেকে বাদ দিতে হবে। এ ছাড়া প্রদর্শনী খামার বা মডেল খামার ভিলেজ, বায়োগ্যাস প্লান্ট, সোলার প্যানেল, পল্লী পাঠশালা বা ই-লার্নিং সেন্টার সংশোধিত ডিপিপি থেকে বাদ দিতে হবে। তবে এ সব সুপারিশ মেনে ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়েছে বলে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে বলা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটি কোভিড শুরু হওয়ার আগেই পিইসি সভায় হয় এবং প্রক্রিয়াকরণ শেষ করা হয়েছে। ফলে সে সময় কোভিড পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমার বাড়ি আমরার খামার প্রকল্পে অডিও ভিডিও বা চলচ্চিত্র কেন নির্মাণ করতে হবে তা আপাতদৃষ্টিতে অস্পষ্ট। হয়ত প্রয়োজন থাকতেও পারে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের প্রশ্ন তোলা উচিৎ ছিল। তা ছাড়া করোনার মতো পরিস্থিতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পেই টাকা দেওয়াটা কঠিন হয়ে পড়বে। সেখানে চলচ্চিত্র ও আপ্যায়ন খাতের এসব ব্যয় একেবারেই বাদ দেওয়া উচিত ছিল। কেননা প্রকল্পের কার্যক্রমের সংজ্ঞা দেখেও বোঝার উপায় নেই এসব খাত কি কাজে লাগবে।’
একনেকের জন্য প্রকল্প সার-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির আগের নাম ছিল একটি বাড়ি একটি খামার। বর্তমানে নাম পরিবর্তন করে আমার বাড়ি আমার খামার দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করছে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, জেলা প্রশাসন ও অধীনস্থ উপজেলা দফতরসমূহ, সমবায় অধিদফতর, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বগুড়া এবং বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্য বিমোচন ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, গোপালগঞ্জ।
পল্লী এলাকায় বসবাসকারি দরিদ্র মানুষদের সংগঠিত করে ক্ষুদ্র সঞ্চয় মডেলে তাদের মধ্যে সঞ্চয় প্রবণতা তৈরি ও স্থায়ী ঘূর্ণায়মান তহবিল গঠনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য দশব্যাপী বাস্তবায়নের জন্য ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়’। প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ২০ হাজার গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গঠনের মাধ্যমে ৫৪ লাখ দরিদ্র পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করাই ছিল প্রধান কার্যক্রমগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া গ্রাম সমিতির সদস্যদেও উদ্বুদ্ধ করে মাসে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা হওয়ার পর পর ২৪ মাস পর্যন্ত সঞ্চয় আদায় করে সমিতির নামে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখা। সঞ্চয়ের বিপরীতে সমপরিমাণ অর্থ সমিতির মিউচুয়াল তহবিল গঠনের উদ্দেশ্যে প্রকল্প থেকে কল্যাণ অনুদান হিসেবে সমিতির ব্যাংক হিসেবে প্রদান অব্যাহত রাখা। গ্রাম উন্নয়ন সমিতির ঘূর্ণায়ন ঋত তহবিল সৃষ্টির জন্য কল্যাণ অনুদানের অতিরিক্ত সমিতি প্রতি তিন লাখ টাকা (বছরে দেড় লাখ করে ২ বছর) ঘূর্ণায়মান তহবিল হিসেবে প্রদান করা। মোট চার লাখ ৭৪ হাজার ৩২০ জন সদস্যকে ২-৪৫ দিন ব্যাপী দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করাই হচ্ছে প্রকল্পটির কাজ।
প্রকল্পটির অগ্রগতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, শুরু থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। যা অনুমোদিত তৃতীয় সংশোধনীত মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৭১ দশমিক ১৭ শতাংশ। প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
প্রকল্পটির সংশোধনী প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) জাকির হোসেন আকন্দ একনেকের জন্য তৈরি প্রকল্প সার-সংক্ষেপে বলেন, ‘আলোচ্য প্রকল্পটি দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে গৃহীত সর্ববৃহৎ প্রকল্প। এটি দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
প্রল্পল্পের চতুর্থ সংশোধিত প্রস্তাব হওয়ায় সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনের বিদ্যমান পরিপত্র (অক্টোবর-২০১৬) অনুযায়ী এই প্রস্তাবটি একনেক কর্তৃক অনুমোদন যোগ্য। তাই এ সব বিচেনায় এটি একনেকে অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।’