চালকের আসনে শিশু-কিশোর

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে আতংকের নাম ‘লেগুনা’

এ কে আজাদ, লোহাগাড়া

13

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, পৃথিবীর প্রধান স্বাস্থ্যকর স্থান এবং বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে সড়ক পথে যাওয়া-আসার একমাত্র মাধ্যম এটি। কক্সবাজার দেশের সর্বদক্ষিণের সীমান্ত জেলা, পর্যটন নগরী ও টেকনাফ স্থল বন্দরের কারণে দেশের অন্য মহাসড়কের তুলনায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল অনেক বেশী। এছাড়া পর্যটন মৌসুমে তো অতিরিক্ত যানবাহন চলাচলের বাড়তি চাপতো আছেই। এসবের মধ্যেও এ ব্যস্ত মহাসড়কে বেশ দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে বিপদজ্জনক ও প্রাণঘাতী যান লেগুনা। এসব লেগুনা উপজেলা শহর থেকে সরাসরি জেলা শহর পর্যন্ত চলাচল না করলেও স্থানীয়ভাবে কর্ণফুলী ব্রিজ থেকে কক্সবাজার শহর পর্যন্ত বেশ কয়েকটি রুটে ভাগ হয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতৃবৃন্দের ছত্রচ্ছায়ায় নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। আবার এসব রুটভিত্তিক বিভিন্ন সমিতি কিংবা শ্রমিক সংগঠনের নামে ওয়াবিলের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা তুলে পকেট ভারী করছেন এসব কথিত সংগঠনের নেতারা। উত্তোলনকৃত চাঁদার নির্দিষ্ট অংকের টাকার ভাগ প্রতি মাসে যাচ্ছে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা, শ্রমিক সংগঠনের নেতা ও পুলিশের পকেটেও। ফলে কোনো ধরণের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে চালকের আসনে বসেই অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোররাই এসব প্রাণঘাতী লেগুনা চালাচ্ছে নির্বিঘ্নে। আর এতে বাড়ছে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
এদিকে, সা¤প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া ও চকরিয়ায় লেগুনার সাথে মুখোমুখি দু’টি বড় ধরণের সংঘর্ষে লেগুনার ২০ যাত্রী নিহত এবং ১০ যাত্রী আহতের ঘটনায় এ মহাসড়কের যাত্রী সাধারণ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে।
গত ২১ মার্চ রাতে লোহাগাড়ার জাঙ্গিয়াস্থ চুনতি ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা একটি লবণবোঝাই ট্রাকের সাথে যাত্রীবাহী লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই চালক-হেলপারসহ ১৪ জন নিহত হয়। এতে লেগুনার আরো ৩ যাত্রী আহত হয়। অর্থাৎ এ দুর্ঘটনায় লেগুনার চালক-হেলপারসহ ১৭ যাত্রীর সবাই হতাহতের শিকার হন।
এছাড়া গত ২২ জুলাই চকরিয়ার হারবাং বুড়ির দোকান এলাকায় কাভার্ডভ্যানের সাথে যাত্রীবাহী লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটনাস্থলে লেগুনার চালক-হেলপারসহ ৬ জন নিহত এবং ৭ জন আহত হয়। এ দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় লেগুনার ২০ যাত্রী নিহত এবং ১০ জন আহতের ঘটনায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে লেগুনা এখন এক আতংকের নামে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কর্ণফুলী ব্রীজ থেকে রামু পর্যন্ত এলাকাভিত্তিক ১০টি রুটে প্রতিদিন ৭-৮শ’ লেগুনা চলাচল করছে। তৎমধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও চকরিয়ার অংশে সবচেয়ে বেশি চলাচল করছে লেগুনা। লোহাগাড়া উপজেলার বটতলী মোটর স্টেশন থেকে চকরিয়া এবং বটতলী মোটর স্টেশন থেকে সাতকানিয়ার কেরানীহাট পর্যন্ত নামে-বেনামে দেড় শতাধিক যাত্রীবাহী লেগুনা চলাচল করছে। এসব লেগুনার অধিকাংশই ফিটনেস ও বৈধ কাগজপত্রবিহীন। নেই কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স। আবার অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোরের হাতেই লেগুনার স্টেয়ারিং। এছাড়াও চালকের সহকারী হিসেবে লেগুনার পেছনে অনেকটা বাঁদুড় ঝুলিয়ে কাজ করছে কোমলমতি শিশুরা।
এসব লেগুনার কারণে মহাসড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। আর এতে অকালে প্রাণহানির ঘটনা বেড়েই চলছে। স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব লেগুনা নির্বিঘ্নে চলাচল করলেও রহস্যজনক কারণে প্রশাসনের এ নিরবতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) লোহাগাড়া উপজেলা কমিটির আহবায়ক মোজাহিদ হোসাইন সাগর বলেন, লোহাগাড়া থেকে চকরিয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের এ অংশে অসংখ্য বাঁক ও গতিময় সড়ক হওয়াতে লেগুনার মতো ছোট গাড়িগুলো বার বার দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এছাড়াও এসব লেগুনার অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোর চালক ও শিশু হেলপারের কারণে দুর্ঘটনা আরো ব্যাপকহারে বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াছিন আরাফাত বলেন, কোরবানির ঈদের আগেই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে কোনো লেগুনা চলতে পারবে না। এখন ২/১টি চললেও তা চুরি করে চালাচ্ছে। লেগুনার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স ।
অন্যদিকে, মহাসড়কগুলোতে লেগুনা চলাচল বন্ধ করলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে বলে জানান স্থানীয়রা।