চট্টগ্রামে বইমেলা ও প্রসঙ্গ কথা

মো. লোকমানুল আলম

181

জ্ঞানপিপাসু মানুষের নিকট বই’র মূল্য কি পরিমাণ তা হিসাব করে মেলানো বড়ই কঠিন একটি কর্ম। বইয়ের প্রতি গভীর অনুরাগী ও জ্ঞানের সাধক পারস্যের কবি ওমর খৈয়াম বলেছিলেন-

Here with loaf of a bread
Beneath the bough,
A flask of wine
Verse & Thou
Beside my singing in the wilderness
An wilderness in paradise Enow

সৈয়দ মুজতবা আলী ওমর খৈয়ামের বক্তব্যকে এভাবে বিবৃত করেন-
‘রুটিমদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা যদি তেমনি বই হয়।’ বই সম্পর্কে দোকার্তে বলেন, ‘ভালো বই পড়া মানে গত শতাব্দীর সেরা মানুষদের সাথে কথা বলা’। বই পড়া আর বই নিয়ে জ্ঞানী গুণীজনেরা যা বলেছেন তা অন্যস্থানে লিখার আশা করছি। তবে, মানবজাতির সভ্যতার ইতিহাসে বইকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য বই মেলার যে অপরিসীম অবদান তা বলাই বাহুল্য।
বর্তমান বিশ্বের বর্তমান অবস্থান একইদিনে, এক মাস বা এক বছর বা এক যুগে এমনকি একটি শতাদ্বীব্যাপী চেষ্টা, গবেষণার ফল নয়। আদিম যুগ থেকে আজকের আধুনিক সভ্যতায় পৌঁছতে প্রতিটি মানুষকে অনেক বাধা বিপত্তির যেমন সম্মুখীন হতে হয়েছে তেমনি সমস্ত বাধা বিপত্তি এবং প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে আজকের অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। মানুষ নিজস্ব প্রয়োজনে আবিস্কার করেছে অনেক কিছুর। এক সময় জ্ঞানী গুণীজনের কথা নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য কৃষ্টি প্রভৃতি বিষয়গুলো তালপাতা, চামড়া, গাছের বাকলে অনেকটা খোদাই করে রাখতে চেষ্টা করত, অনেকেই আবার এগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করেছিল। বলাই বাহুল্য, এভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে বলেই আমরা সেকালের অনেক কিছুই সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছি।
কয়েক হাজার বছর আগে মিসরের নীল নদের তীরে জন্মানো নল খাগড়া জাতীয় একধরনের প্যাপিরাস নামক গাছের কাÐ থেকে প্রাচীন মিসরীয়রা একধরনের কাগজ উৎপাদন করত। বলা যায়, তখন থেকেই মানুষ এই কাগজেই লিপিবদ্ধ করে রাখত তাদের জীবনাচারসহ প্রভৃতি। তবে এসব বই আকারে মূদ্রিত হত না বললেই চলে। মূদ্রিত বইয়ের ইতিহাস খুব দীর্ঘ দিনের নয়। মধ্য যুগের প্রায় সমাপ্তি লগ্নে ১৪৪০-৫০ সালে জার্মনিতে যখন জোহানেস গুটেনবার্গ স্থানান্তরযোগ্য টাইপ বা অক্ষর উদ্ভাবন করলেন, তখন থেকেই শুরু হয় মুদ্রিত বইয়ের অস্তিত্ব। এর পূর্বে বই হিসেবে যা প্রচলিত ছিল তা হলো তালপাতা, চামড়া, কাপড় ও কাগজে লিখা পান্ডুলিপি। বই মেলার ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায় বই মূদ্রণের শুরু থেকেই বইকে পণ্য হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে মূদ্রণকারীরা তাদের পণ্য বাজারজাত করতে বইয়ের মেলা বা প্রদর্শনীর আয়োজন করতে থাকে। পণ্য হিসেবে বই বিকিকিনির এই আয়োজনকে আজকের দিনে চিহ্নিত করা হয়েছে বইমেলা হিসেবে। বই মেলা এখন পুরো বিশ্বের মানুষের নিকট জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক এবং জ্ঞানানুশীলনের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। ইউরোপ ও অন্যান্য দেশে বইমেলা প্রধানত বইয়ের বাণিজ্যিক মেলা হিসেবে সংশ্লিষ্টদের নিকট অত্যধিক পরিচিত। এই সব মেলায় লেখকদের সাথে প্রকাশকের বই প্রকাশের চুক্তি সম্পন্ন করার সুযোগ পান। অন্যান্য পণ্যের বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের মত বিভিন্ন প্রকাশকের এজেন্টরা ও মেলায় অংশগ্রহণ করে লেখক ও প্রকাশকের সাথে একটা মেলবন্ধন সৃষ্টি এবং বইয়ের বাজার তথা পাঠক সৃষ্টি ও বিস্তৃতি ঘটানোর সুযোগ পেত।
আজকের দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় অর্ধশতাধিক আন্তর্জার্তিক বইমেলা হয়। বই পড়া, বইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, বই কেনা অন্যদিকে সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী লেখক গবেষকদের গবেষণাপত্র ও চিন্তাশীল মানুষদের চিন্তাভাবনার ফসলগুলো বই আকারে প্রকাশ এবং প্রকাশিত বইয়ের পাঠক খুঁজতে গিয়ে অথবা মানুষের নান্দনিক চিন্তা চেতনা, মননশীলতায় শান দেয়ার লক্ষ্যে ইউরোপ আমেরিকার আদলে আমাদের দেশেও বইমেলার আয়োজন করা হচ্ছে সেই অনেকদিন আগে থেকেই। আমাদের দেশে বইমেলা নিয়ে আলোচনা করতে হলে প্রথমে যার কথা উল্লেখ করতে হবে তিনি হচ্ছেন প্রয়াত কথাসাহিত্যিক জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সরদার জয়েনউদ্দীন। সরদার জয়েনউদ্দীন একসময় বাংলা একাডেমিতে চাকরি করতেন। বাংলা একাডেমি থেকে ষাটের দশকের প্রথম দিকে তিনি গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে নিয়োগ পান। সেসময় তিনি জাতিসংঘের ইউনেস্কোর শিশু-কিশোর গ্রন্থমালা উন্নয়নে একটি প্রকল্পে কাজ করেছিলেন। কাজটি শেষ হওয়ার পর পরই তিনি তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি)’র নীচ তলায় একটি শিশু গ্রন্থ মেলার ব্যবস্থা করেন । মূলত: এটাই ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বই মেলা। এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৫ সালে। এরপরে তিনি ১৯৭০ সালে নারায়নগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে একটি গ্রন্থ মেলার আয়োজন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি যখন গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক, তখন ‘ইউনেস্কো’ ওই বছরকে ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ উপলক্ষে ১৯৭২ সালে ডিসেম্বর মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। সেই থেকেই বাংলা একাডেমিতে বইমেলার সূচনা। ফেব্রæয়ারি মাসে একুশের বইমেলার ইতিহাসটিও স্বাধীনতা পরবর্তীকালের। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা নবপ্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমান ‘মুক্তধারা’ প্রকাশনী) থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশী শরণার্থী লেখকদের লেখা নিয়ে কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গনে বটতলায় এক টুকরো চটের ওপর বই নিয়ে বিক্রীর জন্য বসেন। এই বইগুলো ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান। একই সাথে স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামী তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতি প্রকাশনীর কিছু বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন, বর্ণমিছিলের তাজুল ইসলামও ওভাবেই তাঁদের বই নিয়ে বসে যান। এভাবেই এই প্রকাশকরা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বইমেলার গোড়াপত্তন করেন। ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি মহান একুশে মেলা উপলক্ষে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ হ্রাসকৃত মূল্যে একাডেমি প্রকাশিত বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। পাশাপাশি মুক্তধারা, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স এবং এদের দেখাদেখি আরও দু’একটা প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির মাঠে নিজেদের বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে একটি বিশাল জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই মেলার উদ্বোধন করেন। ঐ সাহিত্য সম্মেলনকে সামনে রেখে ঢাকার বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান একাডেমির পূর্বদিকের দেয়াল বরাবর নিজেদের পছন্দমতো জায়গায় যে যার মতো করে কিছু স্টল নির্মাণ করে বই বিক্রির ব্যবস্থা করেন। শুধু মাঠের জায়গাটুকু দেওয়া ছাড়া বাংলা একাডেমির কোনো ভ‚মিকা ছিলো না। ১৯৭৫ সালে একাডেমি মাঠের কিছু জায়গা চুনের দাগ দিয়ে প্রকাশকদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়। প্রকাশকরা যে যার মতো স্টল তৈরি করে বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। এ অবস্থা চলতে থাকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত।
১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে মেলার সাতে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে মেলার সাথে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। এই সংস্থাটিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৮১ সালে আয়োজিত একুশে বইমেলার মেয়াদ কমিয়ে ২১দিনের পরিবর্তে ১৪দিন করা হয়। কিন্তু প্রকাশকদের দাবির মুখে ১৯৮২ সালে বইমেলার মেয়াদ ২১দিন করা হয়। মেলার উদ্যোক্তা ছিল বাংলা একাডেমি। সহযোগিতায় ছিলো জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি। ১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন করেন। কিন্তু স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষা ভবনের সামনে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে ট্রাক তুলে দিলে দুজন ছাত্র নিহত হয়। ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর সেই বছর আর বইমেলা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৮৪ সাল থেকে এই মেলার নতুন নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’।
তারই ধারাবাহিকতায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ১৯৭৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকার বাইরে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে জাতীয় গ্রন্থ মেলার আয়োজন করে। এই জাতীয় গ্রন্থ মেলার আয়োজন করা হয় চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুল মাঠে। ‘ঢাকার বাইরে কোন শহরে এই প্রথম এ ধরনের মেলা অনুষ্ঠিত হল’ (সাপ্তাহিক বিচিত্রা- ৩য় বর্ষ, ৪০ সংখ্যা, ৭ই মার্চ ১৯৭৫)। ১৯৭৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি এই সাতদিন চট্টগ্রামের বই প্রেমিকরা জড়ো হয়েছিলেন মিউনিসিপ্যাল স্কুল প্রাঙ্গণে। জাতীয় গ্রন্থমেলায় ভারত, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়াসহ দেশী-বিদেশী মিলিয়ে ৪৩টি বইয়ের স্টল বসেছিল। বিদেশী স্টলগুলোর মধ্যে ভারত ছাড়া অন্য কোন দেশ থেকেই বেসরকারী কোন প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহন করেনি। বাংলাদেশের স্টলগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের কয়েকটি প্রকাশনা ও পুস্তক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ ঢাকা থেকে কিছুসংখ্যক প্রকাশক স্টল খুলেছিল গ্রন্থমেলায়। সে বছরই জাতীয় গ্রন্থমেলা বা জাতীয় গ্রন্থ প্রদর্শনী’র স্লোগান গান ছিল ‘বই হোক নিত্যসঙ্গী’। সাতদিনব্যাপী এ মেলা বা প্রদর্শনীর মূল মঞ্চে প্রতিদিন নিয়মিতভাবে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ কবিতা পাঠ, ছড়া, গান, নাট্যানুষ্ঠান, চলচিত্র প্রদর্শন ও কবি গানের আসর বসেছিল। প্রদর্শনী উপলক্ষে চট্টগ্রামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ঢাকা ও রাজশাহীর প্রথম সারির কবি-সাহিত্যিকসহ পশ্চিমবঙ্গের গৌরিকিশোর ঘোষও বেশ কয়েকদিন চট্টগ্রামে অবস্থান করেছিলেন। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে চট্টগ্রামে আয়োজিত সাতদিনব্যাপী জাতীয় গ্রন্থ প্রদর্শনীতে কবিতা পাঠ, ছড়া গান প্রভৃতি অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের তরুণ কবিদের মূল্যায়নের ঘাটতি নিয়ে যেমন সেই সময় কথা উঠেছিল তেমনি প্রদর্শনী আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাব ছিল। ফলে মেলার ৩য় দিন থেকে মেলা প্রাঙ্গণে কিছু উচ্ছৃঙ্খল আচরণও লক্ষ করা গিয়েছিল। মেলার ৪র্থ দিনে গ্রন্থমেলা আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান ও তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবুল ফজলকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের শান্ত করতে হয়েছে বলেও জানা যায়(সূত্র: প্রাগুক্ত)।
বস্তুতপক্ষে ১৯৭৫ সালেই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে চট্টগ্রামে প্রথম বারের মত ‘বই মেলা’ বা গ্রন্থ মেলার যাত্রা শুরু হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, প্রায় চৌদ্দ বছর পর ১৯৮৮ সালেও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র চট্টগ্রামে বইমেলার আয়োজন করে। পরে দীর্ঘ ২৫ বছর পর ২০১৩ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র চট্টগ্রামের এম.এ. আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন সিজেকেএস জিমনেশিয়ামেও বইমেলার আয়োজন করে। ঢাকার শীর্ষস্থানীয় ষাটটি প্রকাশনা সংস্থাসহ প্রায় ৮০টি সংস্থা এ মেলায় অংশগ্রহণ করে। শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থার কলেবর ও সব কিছু মিলেয়ে এটি চট্টগ্রামে সর্ববৃহৎ বইমেলা হিসেবে স্বীকৃত।
১৯৭৫ সালে মহান শহীদ দিবস একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে মিউনিসিপ্যাল স্কুল প্রাঙ্গণে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী বই মেলায় লেখক, প্রকাশক, পাঠকদের সমাগম দেখে চট্টগ্রামের তরুণ কবি লেখক বিশেষ করে যারা লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনার সাথে সম্পৃক্ত ছিল তারাই পরবর্তী বছর থেকে শহীদ দিবসকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার কেন্দ্রিক স্বল্পপরিসরে বই মেলার আয়োজন করে। নিয়মিতভাবে না হলেও অনিয়মিতভাবে কয়েকবছর ধরে এই সকল তরুণ কবি ও প্রকাশকরা মিলে বই মেলার আয়োজন করেন। মহান একুশকে ঘিরে দৈনিক পূর্বকোণ’র প্রাক্তন বার্তা সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিরুদ্দিন চৌধুরী এবং অরুন চন্দ্র বণিক, জহির কাজি, আবুল কাশেম চিশতি, যদু গোপাল বৈষ্ণব, শিল্পী সুজিত ভট্টাচার্য, সুজিত দাশ অপু, সুজিত চৌধুরী মিন্টু, নজরুল ইসলাম মোস্তাফিজ, শওকত আলী সেলিম, সুভাষ দত্ত, সুভাষ দাশগুপ্ত, শিল্পী আবুল হাশেম, প্রফুল্ল সিনহা, কবি অরুণ দাশগুপ্ত, প্রদীপ দেওয়ানজী, আহমেদ ইকবাল হায়দার সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও উদ্যোগে ‘চট্টল ইয়থ কয়ার’র ব্যানারে ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত একুশে মেলা পরিষদের ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন মুসলিম হল মাঠে নিয়মিতভাবে ‘একুশের বইমেলা’র আয়োজন করে। ১৯৯৯ সালে মহান শহীদ দিবস কে ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিলে ঐ বছর ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপন পরিষদ গঠন করে পূর্বেকার আয়োজক ও উদ্যোক্তারা মাসব্যাপী বইমেলার আয়োজন করে।
উল্লেখ্য যে, ১৯৯০ সাল থেকে আয়োজিত বই মেলা আয়োজক কমিটিতে অধ্যাপক ড. অনুপম সেন এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ প্রয়াত আবদুল্লাহ আল-হারুন সভাপতি এবং সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা নাসিরুদ্দিন চৌধুরী সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
প্রসঙ্গত: চট্টগ্রামের বইপ্রেমিকদের বইয়ের প্রতি অনুরাগ এবং বই পড়ার অভ্যাস আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার কথা ভেবে মেহেদিবাগস্থ বাংলা একাডেমি’র পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র (প্রায় পঁচিশ/ছাব্বিশ বছর পূর্বে গুছিয়ে ফেলা হয়) শহীদ দিবস অথবা সুবিধাজনক সময়ে হ্রাসকৃত মূল্যে বই বিক্রী ও পুস্তক প্রদর্শনীর আয়োজন করতো। ২০০০ সালে বিশিষ্ট ছড়াকার কবি সাংবাদিক শিশুসাহিত্যে ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত জনাব রাশেদ রউফ এর ‘শৈলী’ প্রকাশনার একক উদ্যোগে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে বইমেলার আয়োজন করে। মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে ঢাকায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে যেহেতু পহেলা ফেব্রæয়ারি থেকে প্রায় মাসব্যাপী বইমেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। সেহেতু, চট্টগ্রামের বইপ্রেমি বিশিষ্টজনেরা জনাব রাশেদ রউফের অনুপ্রেরণা আর উৎসাহে চট্টগ্রাম একাডেমির উদ্যোগে ২০০১সাল থেকে স্বাধীনতার মাস মার্চ এ ‘স্বাধীনতার বইমেলা’ নাম দিয়ে বইমেলার আয়োজন করে। চট্টগ্রাম একাডেমি বইমেলায় পাঠক সমাগম ও পাঠকদের চাহিদার কথা ভেবে মেলার পরিসর বৃদ্ধির সুবিধার্থে কখনো জে.এম.সেন হল, কখনো এনায়েতবাজার মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে ‘স্বাধীনতার বইমেলা’র আয়োজন করেছিল। চট্টগ্রাম একাডেমি বিগত ১০বছর যাবৎ চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের প্রিয় সাংস্কৃতিক অঙ্গন ডিসি হিলে মার্চ মাসজুড়ে ‘স্বাধীনতার বইমেলা’ আয়োজন করে আসছে।
প্রয়াত রাজনীতিবিদ বীরমুক্তিযোদ্ধা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র চট্টলবীর এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র নির্বাচিত হওয়ার কয়েক বছর পর ১৯৯৫ সাল থেকে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে লালদিঘি মাঠে প্রথমদিকে পক্ষকালব্যাপী ও পরে মাসব্যাপী একুশের বইমেলার আয়োজন করেন। পরবর্তীতে ২০১২ সালে সাবেক মেয়র আলহাজ মনজুর আলমের আগ্রহে চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সহযোগিতায় একুশের বই মেলা মুসলিম ইনস্টিটিউট হল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রকাশনা শিল্পের সাথে জড়িত সৃজনশীল প্রকাশকরা ২০০৮ সালে ‘চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা করে এবং ঐ বছরই ঢাকার বাংলা একাডেমির একুশের বইমেলার আঙ্গিকে চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশকদের সংগঠন বইমেলার আয়োজনে এগিয়ে আসে। ২০০৯ ও ২০১১ সালে ফেব্রæয়ারি মাসে চট্টগ্রামের লেখক, সাংবাদিক ও পাঠকদের সম্পৃক্ত করে চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট হল প্রাঙ্গণে ‘চট্টগ্রাম সৃজনশীল বইমেলা’র আয়োজন করে।
চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ ২০১৩ সাল থেকে মুসলিম হল প্রাঙ্গনে ফেব্রæয়ারি মাসে সিটি কর্পোরেশন আয়োজিত একুশের বইমেলা এবং ২০১২ সালের মার্চ মাসে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম বইমেলা’ এবং ২০১৪ এ জেলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধু বই মেলায় অংশগ্রহণ করে।
পুরো দেশের মানুষ যেভাবে অপেক্ষা করে এবং মুখিয়ে থাকে ফেব্রæয়ারি মাসের একুশের বইমেলা এবং নতুন নতুন লেখকদের নতুন বইয়ের জন্য। ঠিক তেমনিভাবে বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বর্তমান ও নতুন প্রজন্মের জ্ঞানপিপাসু মানুষগুলো কবে স্বাধীনতার বইমেলা শুরু হবে নিজেদের পছন্দসই বই কিনতে পারবে সেই অপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকে।
রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা, আয়তন এবং গুরুত্বের দিক দিয়ে চট্টগ্রামের অবস্থান সমপর্যায়ের না হলেও চট্টগ্রামের জ্ঞানপিপাসু ও বইপ্রেমিক মানুষদের কথা ভেবে সৃজনশীল প্রকাশক, সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম একাডেমি এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে বইমেলার আয়োজন করে থাকে। কিন্তু চট্টগ্রামে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বইমেলা আয়োজনের কারণে চট্টগ্রামের বাইরের সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশকেরা বইমেলায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। বইমেলা বেশি হউক, নতুন-পুরাতন বইয়ের প্রচারে ব্যাপকতা লাভ করুক এটা সকলেরই কাম্য। নতুন নতুন লেখকদের হালনাগাদ কবিতা, গল্প,উপন্যাস তথ্যভিত্তিক গবেষণা গ্রন্থ, প্রবন্ধ সংকলন, ইতিহাস দর্শন, অর্থনীতি ধর্মসহ প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক বইয়ের খবর মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষে প্রথমত: রাজধানী ঢাকার পরে চট্টগ্রামের গুরুত্ব ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে চট্টগ্রামে বর্তমানে যেভাবে বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে যে সমস্ত মননশীল জ্ঞানপিপাসু ব্যক্তিবর্গ বা প্রতিষ্ঠান একুশকে ঘিরে অথবা স্বাধীনতার মাসকে ঘিরে বইমেলার আয়োজন করে থাকে তা না করে বৃহত্তর পরিসরে বইমেলা আয়োজন করা যেতে পারে। মার্চ মাস যেহেতু আমাদের স্বাধীনতার মাস এই স্বাধীনতার মাসে, স্বাধীনতার বিষয় আসয়, মার্চের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ করে এবং উত্তাল মার্চের অগ্নিঝরা দিনের চিন্তা-চেতনার বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে নতুন প্রজন্মের মাঝে সঞ্চারিত করা এবং তাদেরকে স্বাধীনতা, মুক্তি প্রভৃতি সম্পর্কে সজাগ করার মানসে বাঙালির স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করে কেন্দ্রীয়ভাবে সম্মিলিত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় বাংলা একাডেমির একুশের বইমেলার পর মাসব্যাপী একটা মেলা আয়োজন করা যেতে পারে। এই বই মেলার নাম হতে পারে ‘স্বাধীনতার বইমেলা’। এই আয়োজনের সাথে চট্টগ্রাম একাডেমি, সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশক,মুক্তবুদ্ধি চর্চার সাথে জড়িত লেখক, সাংবাদিক, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের সম্পৃক্ত করা গেলে বইমেলায় চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশকরা যেমনি সাড়া দিতে আগ্রহী হয়ে উঠবে, পাশাপাশি চট্টগ্রামের বাইরের বিশেষত ঢাকার পুস্তক প্রকাশকদের বইমেলায় অংশগ্রহণে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যেতে পারে। মাসব্যাপী আয়োজিত বইমেলায় চট্টগ্রামসহ পুরো বাংলার বিভিন্ন জেলার লোকজ সংস্কৃতি, কৃষ্টিকে তুলে ধরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রকাশিত পুস্তক সম্পর্কিত আলোচনা, সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি দর্শন, ধর্ম ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা সভারও আয়োজন থাকতে পারে।
ব্যাপকভাবে বইমেলার আয়োজন সম্ভব হলে চট্টগ্রামের খ্যাতিমান ও উঠতি লেখকদের সাথে সারাদেশের খ্যাতিসম্পন্ন এবং তরুণদের চিন্তা-ভাবনার আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম তথা বিভাগীয় শহরগুলোতে ঝিমিয়ে পড়া প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাণ ফিরে পাবে। তারাও প্রকাশনার অন্যান্য কাজের সাথে গবেষক, তরুণ লেখক, কবির সৃজনশীল লেখাগুলো উৎসাহ নিয়ে অধিকহারে পুস্তককারে ছাপাতে এগিয়ে আসবে। বৃহত্তর পরিসরে মেলার আয়োজন করা সম্ভব হলে নবীন-প্রবীণ লেখকদের অভিজ্ঞতা, চিন্তা-ভাবনার ভাব বিনিময়ের একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে। বই সম্পর্কে প্রখ্যাত দার্শনিক রে ব্রাডবেরী’র একটা উদ্ধৃতি দিয়ে বই পড়া এবং বইমেলার গুরুত্ব এবং সমাজে তার প্রভাব কি ধরনের হতে পারে নিবন্ধের সমাপ্তি টানব। তিনি বলেন, ‘একটি সংস্কৃতিতে ধ্বংস করতে তোমার বই পোড়ানো লাগবে না। স্রেফ মানুষকে বই পড়া বন্ধ করতে পারলেই হলো।’
আমরা চাই সারাদেশের প্রতিটি বিভাগীয়, জেলাশহর, উপজেলা আর ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিবছর নিয়মিত বই মেলার আয়োজন হোক। বই মেলার আয়োজন যতই বাড়বে মানুষ ততই আলোকিত হওয়ার সুযোগ পাবে। বইয়ের আলোয় প্রতিটি মানুষ নিজেকে, নিজের, পরিবারের সদস্যদের তথা সমাজ, এমনকি পুরো বিশ্বটাকে বদলে দিতে পারে।
লেখক : প্রাবন্ধিক